শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দেশে গবেষণার সুযোগ বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি আসন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি রয়েছে কিনা তা যাচাই করা অপরিহার্য। পিএইচডি কেবল ‘ডক্টর’ উপাধি অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা। তাই এই ধারণাকে বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষকে কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গত ১৭ আগস্ট ‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬’ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর বিষয়ে মত দেন। এরপর ২২ আগস্ট তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। গবেষণা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু পিএইচডি সাধারণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির মতো নয়। গবেষককে প্রশ্ন নির্ধারণ থেকে শুরু করে তথ্য বিশ্লেষণ, নৈতিকতা মেনে চলা এবং ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দীর্ঘ সময় ও অধ্যবসায় ব্যয় করতে হয়। বারবার ব্যর্থতা, পরিকল্পনা পরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়কের কঠোর মন্তব্য এই যাত্রার স্বাভাবিক অংশ। শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সামনে গবেষণার নতুন অবদান প্রমাণ করতে হয়।

এই পথ সহজ নয়; বরং আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ, ব্যক্তিগত ও পেশাগত ভারসাম্যহীনতা ও জটিলতার কারণে অনেকেই মাঝপথে থেমে যান। এমনকি ‘জ্ঞানতাপস’ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে তাঁর পিএইচডি শেষ করতে পারেননি। তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড জে লাস্কি। ১৯৫০ সালে লাস্কির মৃত্যুর পর থিসিস মূল্যায়নের জন্য সমকক্ষ কেউ না থাকায় তিনি ডিগ্রি সম্পন্ন না করেই ঢাকায় ফিরে আসেন। ডিগ্রি না থাকলেও জ্ঞান ও চিন্তার গভীরতায় তিনি অনন্য ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, পিএইচডি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ডিগ্রিই একমাত্র পরিচয় নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিএইচডি সংক্রান্ত জালিয়াতি ও অসদাচরণের অভিযোগও গভীর উদ্বেগের। বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণা ও অভিসন্দর্ভে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ সংবাদে এসেছে, যার ফলে চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের এক শিক্ষকের পিএইচডি অভিসন্দর্ভে ব্যাপক চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “উচ্চশিক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে পিএইচডি জালিয়াতি হচ্ছে, এটা বন্ধ করা উচিত” (হাইকোর্ট, বিবিসি বাংলা, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। আদালতের এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, গবেষণার মান রক্ষায় কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়; কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো ডিগ্রির বাণিজ্যিকীকরণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের ফি। দুর্বল তদারকিতে পিএইচডি চালু হলে ভর্তি ও আয় বাড়ানোর চাপে ডিগ্রির মানের সঙ্গে আপস হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক বা সামরিক কর্মকর্তারা পিএইচডি করতে পারেন, কিন্তু পদ বা অর্থের টানে গবেষণার সময়, তদারকি বা অভিসন্দর্ভ পরীক্ষার শর্ত শিথিল হওয়া যাবে না। ইউজিসির ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ১০০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫টিতে গবেষণা খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না (১৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে এক টাকাও বরাদ্দ নেই, দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)। যেখানে নিয়মিত গবেষণা পরিবেশ নেই, সেখানে কেবল নীতিমালা দিয়ে মান নিশ্চিত করা কঠিন। ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক মানোন্নয়নে এখন পর্যন্ত তেমন সফলতা পাননি; পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর পর তারা কতটা কার্যকর তদারকি করতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে।

নিম্নমানের পিএইচডি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এতে গবেষকদের ডিগ্রির মূল্য হ্রাস, শিক্ষক নিয়োগে বিভ্রান্তি এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই অনুমতি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক না দিয়ে বিভাগভিত্তিক হওয়া উচিত। প্রথম পর্যায়ে সীমিতসংখ্যক গবেষণাসক্ষম বিভাগে পরীক্ষামূলক অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়কের যোগ্যতা, গবেষণা বাজেট, অবকাঠামো, নৈতিকতা প্রশিক্ষণ এবং চৌর্যবৃত্তি শনাক্তকরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। অভিসন্দর্ভ মূল্যায়নে অন্তত দুজন স্বাধীন বহিরাগত পরীক্ষক রাখা এবং জাতীয় ডিজিটাল সংগ্রহশালায় কাজ সংরক্ষণ করলে স্বচ্ছতা বাড়বে। নির্দিষ্ট সময় পর স্বাধীন মূল্যায়ন ও মান বজায় না রাখলে ভর্তি বন্ধের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে থাকতে হবে। পিএইচডির মান শুধু প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না; পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা ও নতুন জ্ঞান যোগ করেছে কিনা তা বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের প্রকৃত প্রয়োজন প্রকৃত গবেষক তৈরি করা, ‘ডক্টর’ উপাধিধারীর সংখ্যা বাড়ানো নয়। গবেষণায় সক্ষম প্রতিষ্ঠান বা বিভাগকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু শিক্ষক সক্ষমতা, অর্থায়ন, নৈতিকতা ও স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত না করে ব্যাপকভাবে এ কর্মসূচি চালু হলে অনিয়ম ও নিম্নমানের গবেষণা বাড়তে পারে। তখন লাভের চেয়ে ক্ষতির ঝুঁকিই বেশি হবে।

ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। মতামত লেখকের নিজস্ব।