আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নামার পর। তবে অভিষেকের এক মিনিটের মধ্যেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কনুই দিয়ে আঘাত করার অভিযোগে লাল কার্ড দেখা তার ক্যারিয়ারের প্রথম অধ্যায় ছিল। ঠিক সেইভাবেই ২১ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রা শেষ হলো ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে খেলা দিয়ে। এই সময়ে তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের পাশাপাশি বিশ্বকাপের নানা অমোঘ কীর্তি গড়েছেন।

জাতীয় দলের হয়ে মেসি মোট ২০৭ ম্যাচে মাঠে নেমেছেন, যা আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দেশটির আর কোনো ফুটবলার দুই শ ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন শুধু পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গোল করার ক্ষেত্রেও তিনি দেশটির রেকর্ড ভাঙেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনি ১২৫টি গোল করেছেন। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার (৫৪ গোল)। আগের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি গোল করে জাতীয় দলকে বিদায় জানান তিনি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর চেয়ে বেশি গোল আছে শুধু রোনালদোর।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির উপস্থিতিও অনন্য। ২০০৬ সালের জার্মানি আসর দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর বিশ্বকাপ যাত্রা চলতে থাকে ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬ আসর পর্যন্ত। ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নামার কীর্তিতে তাঁর সঙ্গী ক্রিশ্টিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকো গোলকিপার গিয়ের্মো ওচোয়া। কিন্তু ম্যাচ সংখ্যায় তিনি একা। ছয়টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি খেলেছেন ৩৪ ম্যাচ, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা রোনালদোর ম্যাচ ২৭টি। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের রেকর্ডটিকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মাঠে থাকা অবস্থায় আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে জিতেছে ২৩ ম্যাচ, যা কোনো ফুটবলারের জন্য সর্বোচ্চ জয়ের রেকর্ড। গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত অসংখ্য জয়ে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন তিনি। গোলে সহায়তা বা অ্যাসিস্টের ক্ষেত্রেও তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে শীর্ষে। ছয়টি আসরে তার গোলে সহায়তা ১২টি, যা সর্বোচ্চ। আক্রমণ পরিচালনা, সুযোগ তৈরি ও শেষ পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাবের প্রমাণ এই সংখ্যা।

বিশ্বকাপের তিনটি ফাইনালে—২০১৪ সালে জার্মানি, ২০২২ সালে ফ্রান্স এবং ২০২৬ সালে স্পেনের বিপক্ষে—আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে ছিলেন মেসি। বিশ্বকাপের তিনটি ফাইনালে শুরু করা ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার তিনি। ২০২৬ সালের ফাইনালে ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে মাঠে নেমে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড ফুটবলারও হয়েছেন মেসি। পেনাল্টিতেও তাঁর দুই বিপরীত রেকর্ড রয়েছে। বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সাত গোল করেছেন মেসি, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে তিনটি পেনাল্টি ব্যর্থ করে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও তাঁর। বিশ্বকাপে তিনি করেছেন ২১ গোল। এটি কোনো রেকর্ড নয়, তবে সর্বকালের তালিকায় তাকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে। ২২ গোল নিয়ে তার সামনে শুধু ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০২৬ বিশ্বকাপের একপর্যায়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেও উঠেছিলেন মেসি। পরে তাকে ছাড়িয়ে যান এমবাপ্পে।

জাতীয় দলের হয়ে মেসির দীর্ঘ শিরোপা-অপেক্ষা শেষ হয় ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে। এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জেতেন তিনি। আর্জেন্টিনার মূল দলের হয়ে তার শিরোপা চারটি। এর বাইরে ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ও ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের স্বর্ণপদকও জিতেছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি আবার কেউ পরবেন, গোল করবেন এবং নতুন ইতিহাসও লিখবেন। তবে ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, ছয় বিশ্বকাপ, ৩৪ বিশ্বকাপ ম্যাচ এবং তিনটি ফাইনালে খেলার মতো কীর্তিগুলো মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে দিয়েছে অনন্য উচ্চতা। সংখ্যাগুলো শুধু তাঁর দীর্ঘ পথচলার হিসাব নয়, আর্জেন্টিনার হয়ে একটি যুগেরও দলিল।