বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন একটি বার্তায় ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা নিজের প্রত্যাহারের কথা জানান। এরপরই পুনরায় আলোচনার শীর্ষে এসেছে তাঁর বর্ণাঢ্য ফুটবল জীবনের স্মরণীয় সব মুহূর্ত।

ক্লাব জীবনের শুরুতেই মেসি ছিলেন চমকপ্রদ। ২০০৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এল ক্লাসিকোয় প্রথম হ্যাটট্রিক করেন তিনি। ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া সেই ম্যাচে বার্সেলোনার তিনটি গোলই তাঁর ব্যাগে জমা হয়। এক মাস পর কোপা দেল রে’র সেমিফাইনালে গেতাফের বিপক্ষে প্রায় পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করার সময় ইতিহাসের পাতায় দিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের বিখ্যাত গোলটির সাথে তুলনা করা হয়। ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে মাথায় গোল করে ইউরোপের শীর্ষ মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেন মেসি। এটিই ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে তাঁর প্রথম গোল এবং মেসি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ হিসেবে আলোচিত প্রথম ম্যাচ।

বার্সেলোনার হয়ে মেসির গোলদৌর অব্যাহত থাকে। ২০১০ সালে আর্সেনালের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে এক ম্যাচে চার গোল করেন তিনি। দুই বছর পর বায়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে পাঁচ গোল করে আরেক অনন্য কীর্তি গড়েন। ২০১২ সালে গ্রানাদার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বার্সেলোনার সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ভাঙেন। ক্লাবটির হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭২। একই বছর ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোল করে বিশ্ব ফুটবলে অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন মেসি। বার্সেলোনার হয়ে ৭৯ এবং আর্জেন্টিনার হয়ে ১২ গোল করে তিনি গিনেস বুক অব রেকর্ডসে স্থান করে নেন। ২০১৪ সালে সেভিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন। পরে স্পেনের শীর্ষ লিগে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭৪। ২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ইনজুরি সময়ে গোল করে বার্সেলোনাকে ৩-২ ব্যবধানে জয় এনে দেন। এটি ছিল বার্সেলোনার হয়ে তাঁর ৫০০তম গোল। গোলের পর জার্সি খুলে দর্শকদের সামনে নিজের নাম দেখানোর উদ্‌যাপনটিও ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় ছবি হয়ে থাকে।

২০২১ সালে ২১ বছরের বার্সেলোনা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। ৬৭২ গোল ও ৩৫টি ট্রফি জয়ের পর লা লিগার বেতনসীমার কারণে নতুন চুক্তি করতে না পারায় আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে ক্লাব ছাড়েন তিনি। এরপর যোগ দেন প্যারিস সেন্ট জার্মেইনে। জাতীয় দলের হয়ে মেসির সাফল্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ২০২১ সালে। ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেন তিনি। ম্যাচ শেষে আবেগে মাঠে লুটিয়ে পড়েন মেসি, পরে সতীর্থরা তাকে উঁচুতে তুলে উদ্‌যাপন করেন।

এরপর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে দুই গোল এবং টাইব্রেকারে গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতান মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে সাত গোল করে তিনি হন আসরের সেরা খেলোয়াড়। ২০২৩ সালে অষ্টমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেন। বার্সেলোনা ছাড়ার পর পিএসজি ও ইন্টার মায়ামির হয়েও এই পুরস্কার জেতেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপও মেসির ক্যারিয়ারে যোগ করেছে নতুন অধ্যায়। আসরে আট গোল করে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। পরে কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল করে তাকে ছাড়িয়ে যান। ৩৯ বছর বয়সী মেসির আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে ফাইনালে হেরে গেলেও ব্যক্তিগতভাবে আরও একটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ কাটান তিনি।

মেসির ব্যক্তিগত জীবনের এক কঠিন সময় ছিল তাঁর বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যু। গত ৮ আগস্ট রোসারিওতে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন হোর্হে মেসি এবং ছেলের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন। বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর আবেগঘন বার্তায় নিজের ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয়ের কথা জানিয়েছিলেন মেসি।

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয়েছিল মেসির। এরপর দুই দশকের যাত্রায় দেশকে জিতিয়েছেন ২০২২ বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে না পারলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবেই শেষ হচ্ছে তাঁর আন্তর্জাতিক অধ্যায়। একসময় যে জার্সিতে বড় শিরোপা না জেতার আক্ষেপ ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা, সেই জার্সিই শেষ পর্যন্ত তাকে দিয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে অমর এক অধ্যায়। এবার সত্যিই সেই আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় বললেন লিওনেল মেসি.