শুরুতে স্বীকার করি, আমি কোনো ডিগ্রিধারী শিক্ষাবিদ নই। তবে গত ৫০ বছর ধরে স্কুলশিক্ষা নিয়ে চিন্তা, লেখালেখি ও কাজ করেছি। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু কথা বলতে চাই, যাতে নতুন সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো যেন হোঁচট না খায়।

দেশের সব মাধ্যম মিলিয়ে স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি। এই বিশাল সংখ্যা নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া শিশু ও তার শিক্ষা প্রতিটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। তাই পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে জাতীয় আবেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। উন্নত বিশ্বে এমনটা দেখা যায় না। তবে আমাদের নিজেদের দেশ ও মানুষের কথা ভাবতে হবে। বিশেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব হলো জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। ফলে রাতারাতি সব পরিবর্তন সম্ভব নয়; ধৈর্য ধরে কাজ করতে হবে।

লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক পথ অনুসরণ করা জরুরি। মেধা ও দক্ষতা ব্যক্তিগতভাবে অর্জিত হয়, কিন্তু তার চর্চা হয় সমষ্টিগত বা শ্রেণিভিত্তিক। যেমন ফুটবল খেলায় নিজে মাঠে নামলে এবং ভালো কোচের প্রশিক্ষণ পেলে একজন খেলোয়াড় অগ্রগামী হতে পারে। কোচের গুরুত্ব অপরিসীম, তবে তা কেবল তাদের জন্যই, যারা নিজে খেলে।

আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমে পরীক্ষামুখী মানসিকতার অন্ধবিশ্বাস ভাঙতে হবে। এ জন্য আলোচনা সামাজিক পরিসরে আনতে হবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, পরীক্ষামুখী চিন্তা শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান, এবং গণমাধ্যম তা আরও উসকে দেয়। তারা শুধু ফলাফল নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে না, প্রতিটি পত্রিকা সম্ভাব্য প্রশ্ন ও আদর্শ উত্তর প্রকাশ করে। যদিও এটি শিক্ষার জন্য আত্মঘাতী, তবু মন্ত্রণালয়ের উচিত গণমাধ্যমের সঙ্গে বসে আলোচনা করা, যাতে প্রকৃত মেধাবী ও দক্ষ মানুষ তৈরি হয়। অন্তত কাজটি যেন মাঝপথে ভন্ডুল না হয়, সেদিকে নজর রাখা দরকার।

শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। বড় বাজেট ও বড় উদ্যোগ ছাড়া এটি প্রায় অসম্ভব। আমি শুধু বলব, শিক্ষায় অর্থ আগেও কম খরচ হয়নি, কিন্তু জাতি তার সুফল পায়নি। তাই সমস্যার সব দিক বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে এবং তা কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে, সাথে সাফল্য নিশ্চিত করতে হবে।

দেরিতে হলেও বিগত সরকারের আমলে শিক্ষাপদ্ধতির আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন ঘটে। এখন নতুন সরকার ২০২৮ সাল থেকে একটি নতুন পদ্ধতি ও শিক্ষাব্যবস্থা চালুর জন্য কাজ করছে। আমরা তার সাফল্য কামনা করি, তবে শঙ্কিত চিত্তে, কারণ শিক্ষা নিয়ে এ যাবৎ কোনো সরকারই প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে সফল হয়নি।

সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। দীর্ঘদিন পরীক্ষামুখী মুখস্থবিদ্যার চর্চার ফলে বহু প্রজন্ম কার্যত নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থী ছিল, সক্রিয় নয়। যারা অন্যের প্রশ্নে অন্যের (মূলত শিক্ষক বা কোচের) উত্তর মুখস্থ করে ভালো নম্বর পেয়েছে, তারাই দেশে শিক্ষিতজনের মেধা ও দক্ষতার সংকট তৈরি করেছে। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, সংকটগ্রস্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তি দুর্নীতি ও অন্যায়ের পথে পা বাড়ায়, যা সমাজে নৈতিকতার সংকট সৃষ্টি করে। এখানেই শিক্ষার মূল সংকটের ফাঁদ। এই সংকট রাতারাতি দূর করা যাবে না, তবে অবিলম্বে শুরু করতে হবে।

কাজটি দুই দিকে করতে হবে। একদিকে শিক্ষার্থীদের মেধাচর্চা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যদিকে শিক্ষকতায় যাতে মেধাবী, দক্ষ ও শিক্ষাবান্ধব অনুপ্রেরণাদায়ী তরুণ-তরুণীরা আসেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে। আবারও বলছি, এটি একটি বিশাল কাজ, যেখানে অনেক চ্যালেঞ্জ ও বাজেট সংস্থানের প্রশ্ন রয়েছে। তাই দৌড়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর আদর্শ ব্যবস্থা রাতারাতি সম্ভব নয়। গণমাধ্যমসহ পুরো জাতিকে এটি বুঝতে হবে এবং ইতিবাচক মন নিয়ে অংশ নিতে হবে। তবে বিষয়গুলো জনপরিসরে আনার আগে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।

আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। মতামত লেখকের নিজস্ব।