কখনো প্রতিশোধ, কখনো পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কখনো জমাট থ্রিলার—প্রতিবারই নতুন কোনো মোড় নিয়ে হাজির হয় কে-ড্রামা। এবার সেই পরিচিত ছকের সঙ্গে ভূত, অমীমাংসিত খুন আর রোমান্টিক কমেডির অদ্ভুত মিশেল নিয়ে দর্শকের সামনে এসেছে ‘স্পুকি ইন লাভ’। নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় সিরিজটি। প্ল্যাটফর্মটির বিদেশি সিরিজের শীর্ষ দশের তালিকায় রয়েছে এটি।

প্রথম দেখায় নাম শুনে মনে হতে পারে, এটি বুঝি কেবল ভৌতিক প্রেমের গল্প। কিন্তু ‘স্পুকি ইন লাভ’-এর গল্পে আছে আরও অনেক কিছুই। আছে এমন এক তরুণী, যিনি মৃত মানুষের আত্মা দেখতে পান। আর সেই অস্বাভাবিক ক্ষমতাই তাঁকে টেনে নিয়ে যায় একের পর এক রহস্যময় খুনের ঘটনায়। তাঁর সঙ্গী হন একজন মেধাবী প্রসিকিউটর। দুজনের সম্পর্কের মধ্যেই ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় রহস্য, ভয়, হাস্যরস এবং অবশ্যই প্রেম।

.

গত ১৮ জুলাই মুক্তি পাওয়া সিরিজটি কোরিয়ায় টিভিএনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য নেটফ্লিক্সেও দেখানো হয়েছে। ১২ পর্বের এই সিরিজে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন পার্ক ইউন-বিন, ইয়াং সে-জং ও অং সিয়ং-উ।

ভূত দেখার ক্ষমতাই যখন অভিশাপ
সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র চন ইয়ো-রি। ধনী পরিবারের উত্তরাধিকারী হলেও তার জীবন মোটেও স্বাভাবিক নয়। কারণ, সে ভূত দেখতে পায়। শুধু দেখতে পায় না, মৃত মানুষের আত্মাদের উপস্থিতিও অনুভব করে। অন্যদের কাছে যা কল্পনা বা ভয়ংকর গল্প, ইয়ো-রির কাছে সেটিই প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই ক্ষমতা ইয়ো-রির জীবনকে সহজ করার বদলে আরও জটিল করে তুলেছে। মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকা, একাকিত্ব আর নিজের অস্বাভাবিক ক্ষমতা লুকিয়ে রাখাই যেন তার জীবনের অংশ। কিন্তু মৃত মানুষেরা যখন নিজেদের অসমাপ্ত গল্প নিয়ে তার সামনে হাজির হতে থাকে, তখন আর নির্লিপ্ত থাকা সম্ভব হয় নয়।
বিশেষ করে যাদের মৃত্যু রহস্যে ঘেরা কিংবা অন্যায়ের শিকার হয়ে জীবন শেষ হয়েছে, তাদের আত্মারা যেন ইয়ো-রির কাছে উত্তর খুঁজতে আসে।

.

এক আইনজীবী, এক রহস্যময় নারী
অন্যদিকে মা কাং-উক একজন দক্ষ আইনজীবী। তার কাজ অমীমাংসিত অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের রহস্যের কিনারা করা। যুক্তি, প্রমাণ আর তদন্তের জগতেই তার বিশ্বাস। ফলে এমন একজন নারীর সঙ্গে তার দেখা হওয়া, যে দাবি করে মৃত মানুষেরা তাকে তথ্য দেয়—বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই তার কাছে অবিশ্বাস্য।

কিন্তু ঘটনাগুলো একসময় এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে কাং-উককে ইয়ো-রির ক্ষমতাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

.

দুজনের মধ্যে শুরু হয় অদ্ভুত এক জুটি। একজনের কাছে আছে আইনের তদন্ত, আরেকজনের কাছে মৃত মানুষের অজানা তথ্য। এই দুই বিপরীত জগৎ একসঙ্গে এসে তৈরি করে সিরিজটির মূল আকর্ষণ।

নেটফ্লিক্সের ভাষায়, ভূত দেখতে পাওয়া এক উত্তরাধিকারী ও একজন দক্ষ প্রসিকিউটর আবিষ্কার করেন যে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করার মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত কার্যকারিতা। এরপর তাঁরা হাত মেলান একের পর এক অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে।

শুধু ভয় নয়, আছে প্রেমও
সিরিজটির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর ঘরানার মিশ্রণ। সিরিজটি পুরোপুরি হরর নয়। আবার একে শুধু রোমান্টিক কমেডিও বলা যায় না। রহস্য আছে, খুনের তদন্ত আছে, অতিপ্রাকৃত ঘটনা আছে; কিন্তু তার মধ্যেই রয়েছে দুই প্রধান চরিত্রের সম্পর্কের ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার গল্প।

প্রথমে সন্দেহ, তারপর প্রয়োজনের তাগিদে একসঙ্গে কাজ করা—এরপর ধীরে ধীরে তৈরি হয় নির্ভরতা। আর সেখান থেকেই প্রেমের সম্ভাবনা।
কোরীয় নাটকের দর্শকদের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বভাবের দুই মানুষের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সিরিজটি সেই পরিচিত সূত্রের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে ভূতের উপস্থিতি ও অপরাধ তদন্তের গল্প। ফলে একটি দৃশ্য যেখানে ভয় ধরাতে পারে, পরের দৃশ্যেই সেখানে হাসির উপলক্ষ তৈরি হয়।

.

পার্ক ইউন-বিনের নতুন চমক
সিরিজটির অন্যতম বড় আকর্ষণ পার্ক ইউন-বিন। ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাটর্নি উ’ দিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চরিত্রে হাজির হয়েছেন।

চন ইয়ো-রি চরিত্রটি একই সঙ্গে অদ্ভুত, রহস্যময় ও সংবেদনশীল। ভূত দেখার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে, কিন্তু সেই ক্ষমতার কারণে তার জীবনে তৈরি হয়েছে একাকিত্বও। চরিত্রটির এই দুই দিককে পর্দায় তুলে ধরাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে ইয়াং সে-জং অভিনয় করেছেন প্রসিকিউটর মা কাং-উকের চরিত্রে। বাস্তববাদী ও যুক্তিনির্ভর এই চরিত্রটি ইয়ো-রির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের এই বিপরীত স্বভাবের সংঘাতই ধীরে ধীরে সিরিজের রোমান্টিক রসায়নের ভিত্তি তৈরি করে।
আর অং সিয়ং-উর উপস্থিতি গল্পে যোগ করেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। সহশিল্পীদের মধ্যে জো হাই-জু, কিম দো-ওয়ানসহ আরও কয়েকজন পরিচিত মুখ রয়েছেন।

.২১ লাখ ২৯ হাজার দর্শক, কোরীয় বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে ‘হোপ’.

কেন দর্শকের আগ্রহ?
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কোরীয় সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে ঘরানা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একটি গল্পের মধ্যে একাধিক স্বাদ দিতে পারার দক্ষতায় কে-ড্রামা অনেকটাই এগিয়ে।

সিরিজটিতে সেই প্রবণতারই একটি উদাহরণ। এখানে প্রেমের গল্প আছে, কিন্তু প্রেমই একমাত্র বিষয় নয়। ভূতের উপস্থিতি আছে, কিন্তু সিরিজটি শুধু ভয় দেখানোর চেষ্টা করে না। হত্যাকাণ্ডের রহস্য আছে, কিন্তু এটি পুরোপুরি গাঢ় ক্রাইম থ্রিলারও নয়।
এই বৈচিত্র্যই সিরিজটিকে আলাদা করেছে। সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক। কেউ কেউ সিরিজটির রোমান্স, অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও খুনের রহস্য একসঙ্গে মেলানোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। আবার কারও মতে, শুরুতে দুই প্রধান চরিত্রের দেখা হওয়ার ঘটনাগুলো কিছুটা বেশি কাকতালীয় মনে হয়েছে। তবু পার্ক ইউন-বিন ও ইয়াং সে-জংয়ের উপস্থিতি এবং গল্পের অস্বাভাবিক ধারণা দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ভ্যারাইটি ও কোরীয় টাইম অবলম্বনে