বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম শোনেননি, পৃথিবীতে এমন মানুষ কমই আছে। যুদ্ধবাজ এই নেতা গত তিন দশকে সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ বছর ইসরায়েলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহু ও তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষুধাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগও।

হামাসের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পরোয়ানা জারি হয়েছিল, তবে তাঁরা নিহত হওয়ার পর সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন যে ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার মোক্ষম সময় এসে গেছে।

ট্রাম্পের নিজের উপদেষ্টারাও সেই পরিকল্পনাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হলো যৌথ যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজতে ট্রাম্প এখন হিমশিম খাচ্ছেন।

.আল-আকসার ওপর চূড়ান্ত আঘাত আসছে; মুসলিম বিশ্ব কি জাগবে?.রমজান এলেই কেন আল–আকসায় হামলা চালায় ইসরায়েল.

এই পটভূমিতে আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিছু মৌলিক তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক।

নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১ আসনের সমর্থন, যা কোনো একক দলের পক্ষে পাওয়া কার্যত অসম্ভব বলে জোট গঠনই সেখানে ক্ষমতার আসল খেলা।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই খেলার কেন্দ্রে আছেন নেতানিয়াহু। কয়েক দফায় প্রধানমন্ত্রিত্ব করে তিনি ইসরায়েলের ইতিহাসের দীর্ঘতম মেয়াদের সরকারপ্রধান।

রাজনৈতিক মৃত্যুর দুয়ার থেকে বারবার ফিরে আসার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তাঁকে বলা হয় ইসরায়েলি রাজনীতির চূড়ান্ত ‘সারভাইভার’।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাঁর অবস্থানও সুস্পষ্ট: তিনি প্রকাশ্যে, বারবার ঘোষণা করেছেন যে তাঁর অধীনে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্ম তিনি কখনো হতে দেবেন না। ওয়াশিংটনের চাপও তাঁকে এই অবস্থান থেকে নড়াতে পারেনি।

এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন গাদি আইজেনকোট, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা এই জেনারেল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন।

২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তর গাজার জাবালিয়ায় এক সুড়ঙ্গমুখে বিস্ফোরণে নিহত হন তাঁর ২৫ বছরের ছেলে গাল আইজেনকোট। একই যুদ্ধে প্রাণ হারান তাঁর দুই ভাগনেও।

.গাজা বাহানামাত্র, লাল গরুতে সওয়ারিদের মূল নিশানা আল আকসা!.লাল গরু এসে গেছে, আল-আকসা ভেঙে থার্ড টেম্পল গড়া হবে?.

২০২৪ সালের জুনে যুদ্ধ পরিচালনায় সরকারের অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন আইজেনকোট।

আজ তাঁর নবগঠিত দল ‘ইয়াশার’ একাধিক জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে সমানে সমান লড়ছে, কখনো কখনো এগিয়েও থাকছে।

যুদ্ধে সন্তান হারানো এই সৈনিক-বাবার প্রতি ইসরায়েলি সমাজের একটি বড় অংশের সহানুভূতি তাঁর রাজনৈতিক পুঁজির বড় উৎস।

এই নির্বাচনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইতামার বেন গভির, নেতানিয়াহুর জোট সরকারের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী। তাঁর সম্পর্কে দুটি তথ্যই যথেষ্ট।

কিশোর বয়সে উগ্রপন্থী মতাদর্শের কারণে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থার আপত্তিতে তাঁকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়নি, আর পরবর্তীকালে আদালত তাঁকে বর্ণবাদে উসকানি ও একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন।

প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁর বসার ঘরের দেয়ালে ঝুলত বারুখ গোল্ডস্টেইনের ছবি; ২০২০ সালে রাজনৈতিক জোট গঠনের স্বার্থে তিনি ছবিটি নামিয়ে ফেলেন। কে এই বারুখ গোল্ডস্টেইন?

.

১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, রমজান মাসে, এই মার্কিন-ইসরায়েলি চিকিৎসক সেনা পোশাক পরে হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদে ঢুকে ফজরের নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিলেন, আহত করেছিলেন আরও ১২৫ জনকে।

যে মানুষ এমন এক গণহত্যাকারীর ছবি দশকের পর দশক নিজের বসার ঘরে টাঙিয়ে রেখেছিলেন, তিনি আজ ইসরায়েলের পুলিশ বাহিনীর রাজনৈতিক অভিভাবক। এবং তিনি থেমে নেই।

মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৫ আগস্ট প্রচারিত এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, গাজায় প্রতি রাতে ‘টার্গেটেড’ হামলা চালিয়ে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা করা উচিত।

তাঁর ভাষায়, শুধু যারা তাৎক্ষণিক হুমকি তারাই নয়, ‘ওখানে এমন মানুষ আছে, যারা বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।’ যাদের কেউ কেউ ‘নিরপরাধ’ মনে করতে পারে, তাদেরও ছাড় দেওয়া উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

মনে রাখা দরকার, এই কথাগুলো কোনো প্রান্তিক উন্মাদের নয়; এগুলো ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের।

অথচ ইতিহাস এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। একটা সময় ছিল, যখন ইসরায়েল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছিল (২০০০ সালে), গাজা থেকে সব সেনা ও বসতি স্থাপনকারীকে সরিয়ে নিয়েছিল (২০০৫ সালে)।

তারও আগে, ১৯৯৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন ইয়াসির আরাফাতের পাশে দাঁড়িয়ে ফিতা কেটে উদ্বোধন করেছিলেন গাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

.যে কারণে চেঙ্গিস খানের পথে হাঁটছেন নেতানিয়াহু.ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মূলত ‘জেনোসাইড পুরস্কারের’ যোগ্য .

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেটিই ছিল প্রথম সফর। ওই বিমানবন্দর ছিল গাজার অর্থনৈতিক বিকাশ আর আসন্ন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতীক।

প্রথম বছরেই লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি সেখান থেকে যাতায়াত করেছিলেন, হজযাত্রীরা গাজা থেকে সরাসরি উড়ে গিয়েছিলেন হজ করতে।

আজ সেই বিমানবন্দর ধ্বংসস্তূপ, আর সেই স্বপ্নের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক মানবিক বিপর্যয়।

এরপর এল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। হামাসের নজিরবিহীন হামলায় সেদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন, যাঁদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক।

নোভা সংগীত উৎসবে নাচতে থাকা কয়েক শ তরুণ-তরুণীকে হত্যা করা হয়, পরিবারের পর পরিবার নিশ্চিহ্ন করা হয়, ঘটে যৌন সহিংসতার ঘটনাও, আর ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এর জবাবে ইসরায়েল যা করেছে, তা মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকবে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে শিশুই প্রায় ২০ হাজার।

স্বাধীন, পিয়ার-রিভিউড গবেষণাগুলো বলছে প্রকৃত সংখ্যা ৭৫ হাজারের বেশি; খোদ ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তাও প্রায় ৭০ হাজার মৃত্যুর কথা মেনে নিয়েছেন। আর ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসংঘ-সমর্থিত আন্তর্জাতিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসি আনুষ্ঠানিকভাবে গাজা সিটি ও আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে।

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সেটিই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া দুর্ভিক্ষ। একবিংশ শতাব্দীতে, বিশ্বের চোখের সামনে, অবরোধ দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে দুর্ভিক্ষে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

.

গত মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রখ্যাত কলামিস্ট এজরা ক্লাইনের পডকাস্টে ইসরায়েলি অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ ইউভাল হারারি বলেছিলেন, রাষ্ট্রহীন দুই সহস্রাব্দ ধরে এই ইহুদি জাতি টিকে ছিল চিন্তা, প্রশ্ন, আর জ্ঞানচর্চার জোরে।

৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা জেরুজালেমের দ্বিতীয় উপাসনালয়, ইহুদি ধর্মের একটা পবিত্র স্থাপনা, ধ্বংস করে দেয়। অথচ আজ নেতানিয়াহুর মতো নেতারা শেখাচ্ছেন যে রোমানদের মতো হতে হবে: শক্তিশালী হতে হবে, দয়ামায়াহীন সামরিক বাহিনী গড়তে হবে, শত্রুদের নগর ধ্বংস করতে হবে, এটাই নাকি ধর্তব্য।

হারারির প্রশ্ন ছিল: ‘দুই হাজার বছর পর ইহুদিরা যদি শেষ পর্যন্ত রোমানদের পথেই চলে, তাহলে এই দুই হাজার বছরের যাত্রার অর্থ কী ছিল?’

রোমানদের মতো আচরণ দেখতে কেমন, তার দুটি দৃষ্টান্ত গোটা বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। প্রথমটি ছোট্ট বাবু হিন্দ রজবের গল্প।

২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি গাজা সিটি থেকে পালানোর সময় এক পরিবারের গাড়িতে গুলি চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। পাঁচ-ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে হিন্দ বেঁচে ছিল ছয় স্বজনের মৃতদেহের মাঝখানে বসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে রেড ক্রিসেন্টের কাছে সে আকুতি জানিয়েছিল, ‘আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও।’

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে, তাদেরই দেওয়া পথ ধরে যে অ্যাম্বুলেন্স তাকে উদ্ধারে গিয়েছিল, সেটির ওপরও গোলা ছোড়া হয়; নিহত হন দুই প্যারামেডিক। কয়েক দিন পর হিন্দ, তার স্বজনেরা আর উদ্ধারকর্মীদের মরদেহ একসঙ্গে পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটা খ্যাতিমান শেফ হোসে আন্দ্রেসের প্রতিষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন, একটি অলাভজনক ত্রাণ সংস্থা, যারা ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেয়।

.
নির্বাচনের ঠিক আগে, ১৯ আগস্ট ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই যুদ্ধে সেনাদের আচরণ নিয়ে তাদের প্রথম ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে, যার একটি হিন্দ রজব হত্যার ঘটনা। আর ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত কর্মীর হত্যার বিষয়ে কোনো ফৌজদারি তদন্তই হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
.

২০২৪ সালের ১ এপ্রিল ক্ষুধার্ত গাজাবাসীর জন্য খাবার পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে সংস্থাটির স্পষ্ট চিহ্নিত তিন গাড়ির বহরে পরপর ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। নিহত হন সাতজন ত্রাণকর্মী: ফিলিস্তিন, অস্ট্রেলিয়া, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক।

নির্বাচনের ঠিক আগে, ১৯ আগস্ট ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই যুদ্ধে সেনাদের আচরণ নিয়ে তাদের প্রথম ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে, যার একটি হিন্দ রজব হত্যার ঘটনা। আর ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত কর্মীর হত্যার বিষয়ে কোনো ফৌজদারি তদন্তই হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রোমান আচরণ শুধু গাজায় সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খোদ ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিকেও মুখ খুলতে হয়েছে।

হাকাবি কে, সেটা বোঝা জরুরি। ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান এই সাবেক ব্যাপ্টিস্ট যাজক ও আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর বর্তমানে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তাঁর মেয়ে সারা হাকাবি স্যান্ডার্স ট্রাম্পের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি এবং আরকানসাসের বর্তমান গভর্নর।

.

হাকাবি আজীবন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের একনিষ্ঠ সমর্থক; বাইবেলের প্রতিশ্রুত ভূমি প্রসঙ্গে চলতি বছরের শুরুতে তিনি এমনও বলেছিলেন যে ইসরায়েল যদি ফোরাত থেকে নীল নদ পর্যন্ত পুরোটাই নিয়ে নেয়, তাতেও আপত্তির কিছু নেই।

সেই হাকাবি গত সপ্তাহে পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে এক ফিলিস্তিনি-মার্কিন পরিবারের বাড়ি ঘেরাও করে পানি-বিদ্যুৎ কেটে দেওয়া বসতি স্থাপনকারীদের ‘ইসরায়েলি সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, ঘটনাটিকে বলেছেন ‘ভয়ংকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’।

বসতি আন্দোলনের এমন নিবেদিত সমর্থকের মুখ থেকে ‘সন্ত্রাস’ শব্দটি বের করে আনতে পরিস্থিতিকে কতটা চরমে পৌঁছাতে হয়েছে, পাঠক নিজেই অনুমান করুন।

এই সহিংসতার পেছনে একটি গভীরতর হিসাবের সন্দেহও করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে তার সব বসতি স্থাপনকারীকে সরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু পশ্চিম তীরে এখনো কয়েক লাখ বসতি স্থাপনকারী রয়ে গেছেন, যাঁদের একটি উগ্র অংশ প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালাচ্ছে।

সন্দেহটি হলো, এই লাগাতার উসকানির লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের আরেকটি অভ্যুত্থানে বাধ্য করা, যাতে গাজার মতো একটি সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের অজুহাত পশ্চিম তীরেও তৈরি হয়।

আর তেমন অভিযানে বেন গভিরের মতো নেতারা এবং সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা যে সানন্দে শামিল হবেন, সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তবু একটি কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। এত কিছুর পরও ইসরায়েল অন্তত কাগজে-কলমে, হয়তো ক্রমেই অনুদার হয়ে ওঠা চেহারায় হলেও, একটি গণতন্ত্র।

.ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা যে কারণে ‘ভালো বার্তা’ নয়.২৫০০ বছরের পুরোনো দুশমনি: ইসরায়েল কি ‘মরদখাই’? ইরান কি ‘হামান’?.

গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় বিনা বাধায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নেতানিয়াহুর মতো পরাক্রান্ত নেতাকেও সেখানে ভোটের মাঠে দাঁড়াতে হয়, এবং ভোটে হারলে বিদায়ও নিতে হয়।

সেখানকার বিচার বিভাগ এখনো এতটা স্বাধীন যে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলা চালিয়ে যেতে পারে; নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে আদালতের কাঠগড়ায় হাজিরা দিচ্ছেন।

২৭ অক্টোবর কী হবে, কেউ জানে না। নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার দীর্ঘ ও প্রমাণিত রেকর্ডের অধিকারী; তাঁকে অনেকবার শেষ ঘোষণা করে অনেকে ভুল প্রমাণিত হয়েছেন।

কিন্তু জনমত জরিপ বলছে, এটিই সম্ভবত তাঁর জীবনের কঠিনতম নির্বাচন। ফলাফল যা-ই হোক, এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির পথ একটিই: পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, যারা নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে সহাবস্থান করবে।

দুই হাজার বছরের নিপীড়ন সয়ে টিকে থাকা একটি জাতি নিশ্চয়ই জানে, নিপীড়কের ভূমিকায় নামলে ইতিহাস ক্ষমা করে না।

প্রার্থনা করি, এই যুদ্ধগুলোর অবসান হোক; যে ধ্বংসযজ্ঞকে বিশ্বের বহু বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ ও প্রতিষ্ঠান গণহত্যা বলে চিহ্নিত করছেন, তার সমাপ্তি ঘটুক; আর হারারির প্রশ্নটির উত্তর ইসরায়েলি ভোটাররা নিজেরাই খুঁজে নিন: দুই হাজার বছর পর তাঁরা কি সত্যিই নিজেদের আদি পরিচয় ছেড়ে রোমান হয়ে উঠতে চান?

  • মো. এহতেশামুল হক: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আইনজীবী ও লেখক।