বরগুনার পাথরঘাটা থানার এক প্রত্যন্ত বাজার চরদুয়ানী। এই নামেই পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সরু একটি খাল, কিছুদূর গিয়ে যা মিশেছে প্রমত্ত বলেশ্বর নদে।

বলেশ্বর বেয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে যেতে মোহনার কাছাকাছি একটি জনমানবহীন চর আছে, স্থানীয়ভাবে কেউ বলে ‘মাঝের চর’, কেউ ডাকে ‘গুমচর’। নামের অর্থ আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে হয় না।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মোহনার সেই গভীর স্রোতে প্রায় এক দশক ধরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ধরে আনা অসংখ্য মানুষের ‘সমাধি’ হয়েছে।

চোখ-হাত বেঁধে, নৌকার পাটাতনে শুইয়ে গুলি করে, ছুরি দিয়ে পেট চিরে, শরীরের সঙ্গে সিমেন্টের ব্লক বা বস্তা বেঁধে ফেলে দেওয়া হতো বলেশ্বরের পানিতে

এভাবে গুম করে দেওয়া মানুষটির কোনো নাম-পরিচয় থাকত না, এদের বলা হতো ‘প্যাকেট’।

বছরের পর বছর বলেশ্বরের বুকে চলা এই চর্চা একটি বাহিনীর গোপনীয় অপারেশন তো ছিলই, একই সঙ্গে এটি পুরো জনপদকেও বোবা করে রেখেছিল।

.গুম প্রতিরোধে কেমন আইন ও বিচার দরকার.জুলাই হত্যাকাণ্ড: যত গুম–খুনের বিচার আইসিটির মাধ্যমেই যুক্তিযুক্ত.

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, অপারেশনের দিন সাদাপোশাকের লোকেরা এসে চরদুয়ানী বাজারের বরফকলের দোকানপাট রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে যেত।

বিশ্বস্ত সোর্সদের তত্ত্বাবধানে চরদুয়ানী থেকেই খাবার, দড়ি, লাশ বাঁধার চাটাই থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় হতো।

অন্ধকার নিশ্চিত হলে ঘাটে আসতে শুরু করত গাড়ি, ঘাতক দল একে একে ট্রলারে তুলত চোখ-হাত বাঁধা ‘প্যাকেট’গুলোকে।

আশপাশের মানুষ উঁকিও দিত না; কারণ দু-একজন মুখ খুলতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন।

এই প্যাকেট নামকরণটা কি নিছক নিষ্ঠুরতার ভাষা, নাকি সুচিন্তিত একটি কৌশল—সেটি একটি প্রশ্ন।

কারণ, অপরাধের যে কাঠামোতে ভিকটিমের কোনো পরিচয় থাকে না, সেই কাঠামোয় নির্দেশদাতার কোনো স্বাক্ষরও থাকে না, অপরাধীদের প্রকৃত পরিচয়ও জানা যায় না।

গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে গুমের বিভিন্ন অংশ, যেমন অপহরণ, নির্যাতন, বন্দিত্ব এবং হত্যা (কিংবা মুক্তি), ভিন্ন ভিন্ন দলের মাধ্যমে পরিচালনা করা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি দল অন্য দলের কাজ সম্পর্কে জানত না।

.গণতন্ত্র, গুম, মানবাধিকার—সবই ভাঁওতাবাজি!.‘গুম’ হওয়ার ভয় যে নির্বাচনে.

সুচতুরভাবে তৈরি করা এই কাঠামোগত ফাঁকগুলোই গুম ভিকটিমদের বিষয়ে তদন্ত এবং বিচারের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে।

গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে কেবলমাত্র কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী বা নির্দিষ্ট শাসনামলের ‘ব্যক্তিগত পাপ’ হিসেবে বিচার করলে ভুল হবে। এটি একটি প্রবণতা।

জবাবদিহিহীন যেকোনো নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গেলেই সে বেআইনি পথে চলতে শুরু করে; আর এই প্রবণতার একটা নির্দিষ্ট ব্যাকরণ হলো সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাটের হাতিয়ার হিসেবে নদী বা স্রোতকে ব্যবহার করা।

বলেশ্বর ছাড়াও বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা মেঘনার মতো নদীগুলোতে এর চর্চা হয়েছে বহুবার, যা প্রত্যক্ষদর্শীরা আদালতে বলছেন।

আর বিশ্বের অন্তত তিনটি ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এর প্রয়োগ দেখা গেছে।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপরাধের প্রমাণ লোপাটের জন্য নদীর ব্যবহার ঠিক কখন শুরু হয় বাংলাদেশে, এ নিয়ে সরাসরি প্রামাণ্য দলিল নেই।

তবে বলেশ্বরপাড়ের বয়স্ক বাসিন্দাদের কেউ কেউ ৭২ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে রক্ষীবাহিনীর কিছু অভিযানের কথা বলেন, একই কায়দায় নদীতে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প, যাঁদের মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন বলে দাবি করা হয়।

.
রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হওয়ার তিন দশক পরে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দক্ষ হাতে অপরাধ দমনের লক্ষ্যে; কিন্তু র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের বহু অভিযোগ উঠেছে; গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও বাহিনীটির সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে।
.

এই অভিযোগগুলো যাচাই করা হয়নি, তাই একে প্রমাণিত ইতিহাস নয়; বরং জীবন্ত স্মৃতি হিসেবেই পড়া উচিত।

কিন্তু এই স্মৃতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করে যে প্রশাসনিক কাঠামো বা রাজনৈতিক চর্চা, সেগুলো অব্যাহত থাকলে এই অপরাধ যেকোনো মুহূর্তে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হওয়ার তিন দশক পরে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দক্ষ হাতে অপরাধ দমনের লক্ষ্যে; কিন্তু র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের বহু অভিযোগ উঠেছে; গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও বাহিনীটির সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে।

বলেশ্বরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে র‍্যাবের সদস্যদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এসেছে।

১৯৭২ সালের রক্ষীবাহিনী হোক কিংবা ২০১০ সালের পরের র‍্যাব— দুই সময়ের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা এক নয়; কিন্তু উভয় সময়েই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

জবাবদিহিহীন নিরাপত্তা কাঠামোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে কীভাবে একই ধরনের অপরাধপদ্ধতি আবার তৈরি হতে পারে, এই দুই সময়ের অভিজ্ঞতা সেই বিষয়টি সামনে আনে।

.

সীমানার বাইরে তাকালে প্রমাণ লোপাটের এই ব্যাকরণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফিরে ফিরে আসে। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি পাঞ্জাবে বিদ্রোহ দমনের সময় অসংখ্য শিখ তরুণকে গুম ও হত্যার অভিযোগ ওঠে।

তাঁদের অনেকের মরদেহ শতদ্রু ও বিপাশাসহ বিভিন্ন নদী ও খালে ফেলে দেওয়ার তথ্যও সামনে আসে। ভাসমান লাশের চাপ অসহনীয় হয়ে উঠলে ১৯৯২ সালে রাজস্থান সরকার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায় পাঞ্জাব সরকারের কাছে।

মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরা পৌরসভার শ্মশানের বেওয়ারিশ-খাতা ঘেঁটে হাজারো নিখোঁজ মানুষের হিসাব কষতে শুরু করেছিলেন।

১৯৯৫ সালে তাঁকে অপহরণ করা হয়, পরে তাঁকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয় হরিকে খালে, যেখানে শতদ্রু মিশেছে বিপাশার সঙ্গে। যিনি নিখোঁজ ব্যক্তিদের হিসাব রাখছিলেন, তাঁর নিজের শেষ ঠিকানা হলো নদী।

লাতিন আমেরিকায় একই কৌশল আরও বড় আকারে প্রয়োগ হয়েছিল। আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬-৮৩ সময়কালে সামরিক জান্তা পরিচালনা করত ‘ভুয়েলোস দে লা মুয়ের্তে’ (মরণ-উড়াল বা ডেথ ফ্লাইট)। অচেতন বন্দীদের বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হতো লা প্লাতা নদী ও আটলান্টিকে।

.গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই.‘গুম’ মানুষের খোঁজে.

চিলিতে পিনোশের বাহিনী একই কাজ করেছে মাপোচো নদী ও প্রশান্ত মহাসাগরে। বুয়েনস এইরেসের সাহসী নারী আসুসেনা ভিয়াফ্লোর নিজের নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে অন্য মায়েদের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘মাদারস অব প্লাজা দে মায়ো’ (যেভাবে গড়ে উঠেছিল আমাদের ‘মায়ের ডাক’)।

১৯৭৭ সালে তাঁকেও অপহরণ করে ডেথ ফ্লাইট থেকে ফেলে দেওয়া হয় লা প্লাতায়, তাঁর মরদেহ পরে লা প্লাতা মোহনার উপকূলীয় এলাকায় ভেসে ওঠে। যে পদ্ধতি উন্মোচন করতে বেরিয়েছিলেন তিনি, সেই পদ্ধতিই তাঁকে গ্রাস করল, ঠিক যেমনটা ঘটেছিল যশবন্ত সিং খালরার ক্ষেত্রে শতদ্রুতে।

তবে নদী যে সব সময় নীরবে প্রমাণ লোপাট করে, তা নয়; অনেক ক্ষেত্রে সে প্রমাণ বেরও করে দেয়।

২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় সাত খুনের ভিকটিমদের মরদেহ ফেলে দেওয়া হলেও তাঁরা ভেসে উঠেছিলেন; শেষ পর্যন্ত ওই মামলায় সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়।

.

তবে র‍্যাবের ভেতরকার এই চর্চা কিংবা তার বিস্তৃতি নিয়ে সেখানে কোনো আলোচনা হয়নি।

২০১০ সালে অপহরণের পর বলেশ্বরে ডুবিয়ে দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও ভেসে উঠেছিল পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুলের লাশ; পরে ডিএনএ পরীক্ষায় যাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়; কিন্তু যাঁরা কোনো দিন ভেসে ওঠেননি, যাঁরা আজও ফিরে আসেননি, যাঁদের পরিবারের এখনো দিন কাটে অন্তহীন অপেক্ষায়; তাঁদের জন্য আইনি সুরক্ষা বা যথাযথ বিচার পাওয়ার পথটা বড় কঠিন।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেশ্বর ও চরদুয়ানীকে লাশ ফেলার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

মুন্সিগঞ্জে মিলেছে বেওয়ারিশ লাশের একটি কবরস্থান, যেখান থেকে উদ্ধার হওয়া দেহের হাত ছিল বাঁধা, মাথায় ছিল গুলির ক্ষত।

দায়ী ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে; র‍্যাবের নামও রয়েছে।

দীর্ঘদিনের ছড়ানো-ছিটানো অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য আর নিখোঁজ পরিবারের আশঙ্কার সঙ্গে এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের ফলও যুক্ত হলো।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলায় চলমান তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়াতেও উদ্‌ঘাটিত হচ্ছে নানা তথ্য, যা এর আগে প্রকাশ্য আলোচনায় আনার সুযোগ ছিল না।

.
অন্তর্বর্তী সময়ে জারি হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর কিছু বিধান (যা বর্তমানে আর কার্যকর নয়) নতুন এই আইনে কতটা ধরে রাখা হয়, তার ওপর অনেকখানি নির্ভর করবে আইনটি বাস্তবে কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে।
.

এখন তাহলে করণীয় কী। গুম প্রতিরোধ আইনের যে নতুন খসড়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনাধীন, সেখানে অংশীজনদের গ্রহণযোগ্য সুপারিশ যুক্ত করে, বিশেষত যথাযথ তদন্তের সক্ষমতা নিশ্চিত করে আইনটিকে কার্যকর করা প্রয়োজন।

৩ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬’ নিয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি গোলটেবিল আলোচনায় মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

বিশেষত তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁরা কথা বলেছেন।

অন্তর্বর্তী সময়ে জারি হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর কিছু বিধান (যা বর্তমানে আর কার্যকর নয়) নতুন এই আইনে কতটা ধরে রাখা হয়, তার ওপর অনেকখানি নির্ভর করবে আইনটি বাস্তবে কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে।

যে ফাঁকফোকর দিয়ে বলেশ্বরের ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছিল, চূড়ান্ত আইনে সেই ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা; আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সদিচ্ছা ও সক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে বলেই প্রত্যাশা করি।

নদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না; কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণ গোপনের কাজে যাঁরা নদীকে ব্যবহার করেছেন, তাঁদের বিচার করা যায়।

বাংলাদেশে বলেশ্বর কিংবা অন্য কোনো নদীকে যেন আর কোনো দিন নিখোঁজ মানুষের ভার বইতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন প্রধান কাজ।

  • শাইখ মাহদী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী; বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে কর্মরত।

ই-মেইল: [email protected]