সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করা আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। কিন্তু দাঁত পরিষ্কার করার যে টুথব্রাশটি প্রতিদিন মুখে দিচ্ছেন, সেটি কোথায় রাখছেন, সেদিকে কি খেয়াল করেন?

অনেকের টুথব্রাশ থাকে বাথরুমের বেসিনের পাশে, টয়লেটের কাছাকাছি কোনো কাপে কিংবা ব্রাশ রাখার পাত্রে। সুবিধার জন্য এটি স্বাভাবিক মনে হলেও বাথরুমের আর্দ্র পরিবেশ এবং টয়লেটের কাছাকাছি থাকার কারণে টুথব্রাশে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু জমতে পারে। গবেষণাতেও বাথরুমে রাখা টুথব্রাশে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

তবে এর মানে এই নয় যে বাথরুমে টুথব্রাশ রাখলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। বরং সঠিকভাবে পরিষ্কার, শুকানো ও সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চলুন বিস্তারিত জেনে নিই।

টুথব্রাশে জীবাণু জমে কেন?

টুথব্রাশ ব্যবহারের পর সেটি ভেজা থাকে। ভেজা ব্রিসলে সহজেই বিভিন্ন অণুজীব থাকতে পারে। এর সঙ্গে যদি ব্রাশটি আর্দ্র ও বাতাস চলাচল কম এমন জায়গায় রাখা হয়, তাহলে জীবাণু বেড়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাথরুমে রাখা টুথব্রাশে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি ছিল। বিশেষ করে বাথরুমে টয়লেট থাকলে এবং পরিবেশ আর্দ্র হলে জীবাণুর উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।

এ ছাড়া একই পাত্রে পরিবারের একাধিক টুথব্রাশ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখলেও এক ব্রাশ থেকে অন্য ব্রাশে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে।

টয়লেট ফ্লাশের সঙ্গে কী সম্পর্ক?

টয়লেট ফ্লাশ করার সময় পানির সঙ্গে খুব ছোট ছোট কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের কণার মাধ্যমে টয়লেটের জীবাণু আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছাতে পারে। গবেষণায় টয়লেটের পানিতে জীবাণু থাকার এবং ফ্লাশের পরও কিছু সময় তা থেকে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে টয়লেট ফ্লাশের কণা টুথব্রাশে গিয়ে পড়লেই তা ব্যবহারকারীর শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ঘটাবে, এমন প্রমাণ নেই। এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।

তারপরও টুথব্রাশকে টয়লেট থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা এবং ফ্লাশ করার সময় ঢাকনা বন্ধ করা ভালো স্বাস্থ্যবিধির অংশ।

ভেজা টুথব্রাশ ঢেকে রাখবেন না

টুথব্রাশ ব্যবহারের পর অনেকে সঙ্গে সঙ্গে সেটি প্লাস্টিকের ঢাকনা বা বন্ধ পাত্রের মধ্যে রেখে দেন। ব্রাশ ভেজা অবস্থায় এভাবে বন্ধ করে রাখলে ভেতরে আর্দ্রতা আটকে যায়।

এতে ব্রিসল শুকাতে পারে না এবং জীবাণু বেড়ে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন টুথব্রাশ ব্যবহারের পর ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে খোলা অবস্থায় সোজা করে রাখার পরামর্শ দেয়।

তাই ভেজা ব্রাশ এয়ারটাইট পাত্রে রাখার অভ্যাস বাদ দিন।

তাহলে টুথব্রাশ কোথায় রাখবেন?

সম্ভব হলে টুথব্রাশ এমন জায়গায় রাখুন যেখানে বাতাস চলাচল করে এবং সেটি দ্রুত শুকাতে পারে।

বাথরুমেই রাখতে হলে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করুন-

টয়লেট থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখুন

টুথব্রাশ সোজা করে রাখুন

অন্যের টুথব্রাশের সঙ্গে ব্রিসল যেন না লাগে

ব্যবহারের পর পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন

ব্রাশটি শুকানোর সুযোগ দিন

ভেজা ব্রাশ বন্ধ পাত্রে রাখবেন না

কিছু গবেষণায় বাথরুমের বাইরে টুথব্রাশ রাখলে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কম থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

পরিবারের সবার ব্রাশ একসঙ্গে রাখবেন না

একই ব্রাশ হোল্ডারে পরিবারের সবার টুথব্রাশ রাখা খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু ব্রিসল একে অপরের সঙ্গে লেগে থাকলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই প্রত্যেকের টুথব্রাশ আলাদা করে রাখা ভালো। বিশেষ করে পরিবারের কেউ অসুস্থ থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

ব্রাশ পরিষ্কার করার সঠিক নিয়ম

টুথব্রাশ পরিষ্কার রাখতে খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই।

প্রতিবার দাঁত ব্রাশ করার পর কলের পরিষ্কার পানিতে ব্রিসল ভালোভাবে ধুয়ে নিন। ব্রিসলের মধ্যে লেগে থাকা টুথপেস্ট ও খাবারের কণা সরিয়ে ফেলুন। এরপর অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে টুথব্রাশটি সোজা করে এমন জায়গায় রাখুন যেখানে বাতাস চলাচল করে।

আঙুল দিয়ে বারবার ব্রিসল ঘষে পানি বের করার প্রয়োজন নেই। গবেষণাভিত্তিক পরামর্শেও টুথব্রাশ ভালোভাবে ধুয়ে স্বাভাবিকভাবে শুকানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতি তিন মাসে ব্রাশ বদলাবেন

একটি টুথব্রাশ দীর্ঘদিন ব্যবহার করা উচিত নয়। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, সাধারণভাবে প্রতি তিন থেকে চার মাস পর টুথব্রাশ বদলে ফেলা উচিত। ব্রিসল আগেই ছড়িয়ে গেলে বা ক্ষয়ে গেলে তার আগেই নতুন ব্রাশ ব্যবহার করা ভালো।

কারও অসুস্থতার পরই টুথব্রাশ বদলানো সবার জন্য বাধ্যতামূলক, এমন প্রমাণ নেই। তবে গুরুতর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার সমস্যা থাকলে বা চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ থাকলে আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।

টুথব্রাশে ব্যাকটেরিয়া থাকা কি অস্বাভাবিক?

না। টুথব্রাশ যেহেতু মুখের ভেতরে ব্যবহার করা হয়, তাই ব্যবহারের পর এতে মুখের বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া থাকা স্বাভাবিক।

একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের টুথব্রাশে মুখের বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বাথরুমে টয়লেট থাকা এবং আর্দ্র পরিবেশের সঙ্গে কিছু ব্যাকটেরিয়ার বেশি উপস্থিতির সম্পর্কও দেখা গেছে।

তাই টুথব্রাশকে পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব বা প্রয়োজনীয়, এমন ধারণা ঠিক নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় জীবাণু জমা ও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমানো।

টুথব্রাশে জীবাণু থাকলেই কি রোগ হবে?

এখানে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

টুথব্রাশে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসব ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকলেই গুরুতর রোগ হবে, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। টুথব্রাশের জীবাণু নিয়ে প্রচলিত অনেক ভয় অতিরঞ্জিতও হতে পারে।

তাই বাথরুমে টুথব্রাশ রাখছেন বলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টুথব্রাশ পরিষ্কার রাখতে যে ভুলগুলো করবেন না

কিছু অভ্যাস টুথব্রাশে জীবাণু জমার সুযোগ বাড়াতে পারে।

ভেজা ব্রাশ বন্ধ পাত্রে রাখা: এতে আর্দ্রতা আটকে যায়।

অন্যের ব্রাশের সঙ্গে লাগিয়ে রাখা: এক ব্রাশ থেকে অন্য ব্রাশে জীবাণু স্থানান্তরিত হতে পারে।

টুথব্রাশ না ধুয়ে রাখা: ব্রিসলে টুথপেস্ট ও খাবারের কণা জমে থাকতে পারে।

বহুদিন একই ব্রাশ ব্যবহার করা: পুরোনো ও ক্ষয়ে যাওয়া ব্রিসল ঠিকভাবে দাঁত পরিষ্কার করতে পারে না।

টয়লেটের একেবারে পাশে রাখা: ফ্লাশের সময় ছড়িয়ে পড়া কণা ব্রাশের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়াতে পারে।

কমোডের ঢাকনা বন্ধ করে ফ্লাশ করবেন?

এটি ভালো অভ্যাস। টয়লেট ফ্লাশের সময় ঢাকনা বন্ধ করলে আশপাশে কণা ছড়িয়ে পড়া কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে শুধু ঢাকনা বন্ধ করলেই সব ধরনের জীবাণু ছড়ানো বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

তাই টুথব্রাশের অবস্থান, বাথরুমের পরিচ্ছন্নতা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

বাথরুম পরিষ্কার করার সময় টুথব্রাশ সরিয়ে রাখুন

বাথরুম পরিষ্কার করার সময় ব্যবহৃত পরিষ্কারক দ্রব্য বা স্প্রে টুথব্রাশের ওপর না পড়াই ভালো। তাই পরিষ্কার করার সময় টুথব্রাশ সরিয়ে একটি পরিষ্কার ও শুকনো জায়গায় রাখা যেতে পারে।

পরিষ্কার করার পর জায়গাটি শুকিয়ে গেলে আবার টুথব্রাশ নির্দিষ্ট স্থানে রাখা উচিত।

সহজ কয়েকটি নিয়ম মনে রাখুন

টুথব্রাশ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার প্রয়োজন নেই। শুধু কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললেই যথেষ্ট।

ব্যবহারের পর টুথব্রাশ ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

ব্রাশটি সোজা করে রাখুন।

বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় শুকাতে দিন।

ভেজা ব্রাশ বন্ধ পাত্রে রাখবেন না।

পরিবারের সবার ব্রাশ আলাদা রাখুন।

টয়লেট থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখুন।

ব্রিসল ক্ষয়ে গেলে বা ছড়িয়ে গেলে দ্রুত ব্রাশ বদলান।

সাধারণভাবে তিন থেকে চার মাস পর নতুন টুথব্রাশ ব্যবহার করুন।

বাথরুমে টুথব্রাশ রাখা আমাদের অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। এতে টুথব্রাশে কিছু জীবাণু জমার সম্ভাবনা থাকলেও শুধু বাথরুমে রাখার কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বরং টুথব্রাশ ব্যবহারের পর ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া, শুকানোর সুযোগ দেওয়া, অন্য ব্রাশ থেকে আলাদা রাখা এবং টয়লেট থেকে দূরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাতেও পরিষ্কার ও শুকনো টুথব্রাশ সঠিকভাবে সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দাঁত পরিষ্কার রাখার মতোই টুথব্রাশটিকেও পরিষ্কার ও শুকনো রাখার অভ্যাস করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় জীবাণুর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব হবে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা