ঘর কেবল বাসস্থান নয়, তা হলো প্রশান্তির এক নিজস্ব জগৎ। সাম্প্রতিক সময়ের পরিবর্তিত জীবনযাত্রা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে বাংলাদেশে অন্দরসজ্জার ধারণাতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন আর শুধু নান্দনিকতা নয়, বরং আরামদায়ক পরিবেশ, স্পেস ম্যানেজমেন্ট এবং টেকসই মেটেরিয়াল নির্বাচনের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। লাইটিং, আসবাব ও রঙের সঠিক সমন্বয়ে আবাসনকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও কার্যকরী করে তোলাই বর্তমান অন্দরসজ্জার মূল কথা।
বাড়ির প্রবেশপথ বা প্রধান দরজা এখন আর কেবল ভারী সলিড কাঠের হয় না। আকর্ষণীয় চেহারা ও কম রক্ষণাবেক্ষণের কারণে আধুনিক লেমিনেটেড ও ফ্লাশ ডোরের চাহিদা বেড়েছে। দরজার সৌন্দর্য ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে এর ফিটিংসের ওপর। নান্দনিক ডোর লক, স্মার্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট হ্যান্ডেল ও অত্যাধুনিক সিকিউরিটি ফিটিংস এখন নিরাপত্তার পাশাপাশি দরজার আভিজাত্য বৃদ্ধিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
জ্যামিতিক প্যাটার্ন ও মিনিমাল ডিজাইনের পাশাপাশি ‘স্মার্ট হোম’ বা হোম অটোমেশন কনসেপ্ট অন্দরসজ্জায় বিপ্লব এনেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে বাড়ি এখন আর কেবল ইটের দেয়াল নয়, তা হয়ে উঠেছে ইন্টারেক্টিভ। স্মার্ট লাইটিং, সেন্সর-ভিত্তিক সিকিউরিটি সিস্টেম, স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট ও এনার্জি-সেভিং সলিউশনের মাধ্যমে জীবনযাত্রা সহজ ও নিরাপদ হচ্ছে। অফিস থেকেও স্মার্টফোনের এক ক্লিকে ঘরের আলো, এসি বা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
ঘরের পরিবেশ গড়তে আলো এখন অপরিহার্য। প্রোফাইল লাইট, অ্যাকসেন্ট লাইটিং ও আধুনিক ঝাড়বাতি ঘরের নির্দিষ্ট কোণে বা সিলিংয়ে আভিজাত্য যোগ করে। এর সাথে আসবাবের রঙের সাথে মিল রেখে পর্দা নির্বাচন জরুরি। দিনের প্রাকৃতিক আলোর জন্য শিয়ার পর্দা এবং রাতে গোপনীয়তা রক্ষায় ব্ল্যাকআউট বা ভারী ব্লাইন্ডের ব্যবহার ঘরে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে।
শহুরে জীবনে সবুজের সংস্পর্শে থাকতে ছাদ ও বারান্দা এখন প্রধান কেন্দ্র। ইনডোর প্লান্ট, ভার্টিক্যাল গার্ডেন ও রুফটপ ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমে প্রশান্তির কোণ তৈরি করা হচ্ছে। রোদ ও বৃষ্টিতে টিকে থাকার জন্য রতন বা ওয়েদারপ্রুফ মেটেরিয়ালের আউটডোর ফার্নিচার ব্যবহার জনপ্রিয়। আরামদায়ক বসার জায়গার পাশাপাশি ওয়ার্ম ফেয়ারি লাইট বা সোলার ল্যাম্প রাতের খোলা বারান্দাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
বসার ঘর গৃহকর্তার রুচির প্রতিফলন। তাই ছিমছাম ও মিনিমালিস্ট ডিজাইনের দিকেই এখন বেশিরভাগের ঝোঁক। গাদাগাদি আসবাবের বদলে পর্যাপ্ত হাঁটাচলার জায়গা রেখে টেকসই কাঠের এল-শেপ সোফা ও সেন্টার টেবিলের সঠিক বিন্যাস লিভিং স্পেসকে প্রশান্তিদায়ক রূপ দেয়।
অন্দরসজ্জার উপকরণে আধুনিক বোর্ড শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার্ড উডের ব্যবহার বেড়েছে। রান্নাঘরের ক্যাবিনেট বা ওয়ার্ডরোবে আর্দ্রতারোধী প্লাইউড, এমডিএফ ও ভিনিয়ারের ব্যবহার খরচ কমাতে সাহায্য করছে। দেশীয় বাজারেই আন্তর্জাতিক মানের এসব বোর্ড পাওয়া যাচ্ছে, যা ইন্টেরিয়র কাজকে আরও সহজলভ্য করেছে।
শুধু বসতবাড়িই নয়, করপোরেট ও বাণিজ্যিক ভবনের অন্দরসজ্জাতেও নতুনত্ব এসেছে। প্রতিষ্ঠানের প্রফেশনালিজম ও আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলতে অভ্যর্থনাক্ষ বা লাউঞ্জ ডিজাইন করা হয়। আরামদায়ক ওয়েটিং স্পেস, দৃষ্টিনন্দন রিসেপশন ডেস্ক, বায়োফিলিক ডিজাইন ও পরিমিত আলোর ব্যবহারে করপোরেট স্পেসগুলো কর্মবান্ধব ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
রঙ ও ফিনিশিংয়েও বৈচিত্র্য এসেছে। গতানুগতিক রুপালি রঙের বাইরে আধুনিক বাথরুমে ম্যাট ব্ল্যাক, ব্রাশড গোল্ড, রোজ গোল্ড ও কপার ফিনিশিংয়ের প্রাধান্য বেড়েছে। ফসেটের আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি ক্যাবিনেটরির জন্য ব্যবহৃত বোর্ডেও পরিবর্তন এসেছে। বাথরুম ও কিচেনের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ মোকাবিলায় ওয়াটারপ্রুফ প্লাইউড, এইচডিএইচএমআর ও আর্দ্রতারোধী বোর্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বোর্ডের ওপর অ্যাক্রিলিক বা ভিনিয়ার ফিনিশিং কাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি প্রিমিয়াম লুক দেয়।
স্বপ্নের ঘর কেবল দামি আসবাব বা উপকরণের সমষ্টি নয়। সঠিক পরিকল্পনা, রুচিশীল মেটেরিয়াল নির্বাচন ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে যেকোনো সাধারণ স্পেসই নান্দনিক ও আরামদায়ক হয়ে ওঠে। অন্দরসজ্জার বর্তমান এই ট্রেন্ডগুলো শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায়, বরং আধুনিক জীবনের নিত্যনতুন চাহিদাও পূরণ করছে।