অস্ট্রেলিয়া–বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ড–পাকিস্তানের সাম্প্রতিক টেস্ট ম্যাচ দুটি মাত্র দুই দিনে শেষ হওয়ার পর ক্রিকেট বিশ্লেষণে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। পরিসংখ্যান বলছে, ক্রমেই কমছে টেস্টের দৈর্ঘ্য। তিন দিন বা তার কম সময়ে শেষ হওয়া ম্যাচের হার ১৯৯০–এর দশকের ৬.৯৮ শতাংশ থেকে এখন বেড়ে হয়েছে ২৩ শতাংশের বেশি। এই প্রবণতার পেছনে কী কারণ, তা নিয়ে মন্তব্য করেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন। ইংল্যান্ড–পাকিস্তান লর্ডস টেস্টের তৃতীয় দিনে বৃষ্টির বিরতিতে স্কাই স্পোর্টসের আলোচনায় মাইকেল আথারটন তাই বলছিলেন, আগে প্রশ্নটি হওয়া উচিত, টেস্ট সত্যিই দ্রুত শেষ হচ্ছে কি না।

গত দুই সপ্তাহে ম্যাকাই ও হেডিংলিতে অনুষ্ঠিত টেস্ট দুটি মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় শেষ হয়। এর আগে অ্যাশেজ সিরিজের দুটি ম্যাচও একই ভাগ্যে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দুই বা তিন দিনে টেস্ট শেষ হওয়া আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। ১৯৪৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে একটিও দুই দিনের ম্যাচ হয়নি। অথচ গত এক দশকে এমন ঘটনা ঘটেছে ৯ বার। পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবেই নির্দেশ করছে যে, ম্যাচের সময়কাল সংকুচিত হচ্ছে। ১৯৯০–এর দশকে পঞ্চম দিনে গড়াত প্রায় ৬৮.৬ শতাংশ ম্যাচ, যা ২০২০–এর দশকে নেমে এসেছে ৪১.৪৩ শতাংশে। উল্টোদিকে চার দিনে শেষ হওয়া ম্যাচের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫.৪৬ শতাংশ।

আথারটনের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ব্যাটিংয়ের ধরনে আমূল পরিবর্তন। টি–টুয়েন্টি এবং সাদা বলের ক্রিকেটের প্রভাব টেস্ট ব্যাটিংয়েও পড়েছে। ব্যাটসম্যানরা এখন রক্ষণাত্মক খেলার বদলে দ্রুত রান করার মানসিকতায় আক্রমণাত্মক শট খেলছেন, ফলে ঝুঁকি বাড়ছে। একদিকে রান দ্রুত উঠলেও অন্যদিকে উইকেটও দ্রুত পড়ছে। এই যুগের সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে ইংল্যান্ডের ‘বাজবল’ কৌশল উল্লেখযোগ্য। যদিও আথারটনের কথা শুধু ইংল্যান্ডকে নিয়ে নয়। আধুনিক ব্যাটসম্যানরা সাধারণভাবেই আগের প্রজন্মের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক। রান রেট ও ম্যাচের গতি বাড়লেও সেই গতির মূল্য অনেক সময় উইকেট দিয়ে দিতে হয়।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রযুক্তির ভূমিকা, বিশেষ করে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএস। আগে এলবিডব্লুর আবেদনগুলোতে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল, কিন্তু এখন প্রযুক্তির সহায়তায় অনেক সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে। বল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে উইকেটে লাগত কি না, তা অনেক বেশি নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়। ফলে আগের চেয়ে বেশি এলবিডব্লু আউট হচ্ছে এবং বোলারদের জন্য উইকেট নেওয়ার একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে।

তৃতীয় কারণ হলো উইকেটের প্রকৃতি। আথারটনের মতে, আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে আগের তুলনায় বোলারদের সহায়ক উইকেট তৈরি করার প্রবণতা বেড়েছে। এর পেছনে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রভাবও রয়েছে। এখন প্রতিটি ম্যাচের ফলের মূল্য বেশি। ড্রয়ের তুলনায় জয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে পাঁচ দিন ধরে ম্যাচ গড়িয়ে নিষ্প্রাণ ড্রয়ের দিকে যাওয়ার বদলে এমন উইকেট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে ফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্টভাবেই ম্যাচের ফলাফলে দেখা যায়। ১৯৭০–এর দশকে টেস্টের প্রায় ৭৮ শতাংশই পঞ্চম দিনে শেষ হতো। ২০০০–এর দশকে সেটি নেমে আসে ৫৮ শতাংশে। এখন, অর্থাৎ ২০২০–এর দশকে তা মাত্র ৪১.৪৩ শতাংশ।