সঠিক সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছ থেকে ফসলের বীজ না পাওয়ায় কৃষকরা এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে সংকুচিত হয়ে আসছে বিএডিসির ব্যবসা। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কুমিল্লায় গত পাঁচ বছরে বিএডিসির বীজ বিক্রি কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি বীজের বিক্রি হ্রাস পাওয়ায় রাজস্ব কমছে এবং মজুত ব্যবস্থাপনায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পাচ্ছে।

কুমিল্লার গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএডিসির বিভিন্ন ফসলের বীজ বিক্রি এক হাজার ৭০৮ দশমিক ৭৯৪ মেট্রিক টন কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বীজ বিক্রি হয়েছিল ১০ হাজার ৭১০ দশমিক ২৯১ টন, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫৭ দশমিক ৭৮৮ টনে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিক্রি কিছুটা বেড়ে ১০ হাজার ৬৬২ দশমিক ৬৯০ টন হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পুনরায় কমে ১০ হাজার ৩০০ দশমিক ২৯৭ টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১ দশমিক ৪৯৭ টনে।

ফসলভিত্তিক হিসাবে আমন ধান ও আলুবীজের বিক্রিতে বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমন ধানের বীজ বিক্রি হয়েছিল দুই হাজার ১৩৮ দশমিক তিন টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে এক হাজার ৯৮৪ দশমিক ৩৬৫ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক হাজার ৩২২ টনে নেমে এসেছে। একইভাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিন হাজার ২৯৪ দশমিক ৬১৬ টন আলুবীজ বিক্রি হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দুই হাজার ২৫২ দশমিক ১৮২ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক হাজার ৭১৪ দশমিক ৩৬৬ টনে হ্রাস পেয়েছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে কৃষক নাফিজুর বলপন বলেন, "বিএডিসির বীজ সময়মতো না ছাড়লে কৃষক অপেক্ষা করতে পারেন না। তখন কোম্পানির বীজ কিনেই চাষ করতে হয়। এতে বেসরকারি কোম্পানির বীজের বাজার বাড়ছে।"

অন্যদিকে কৃষক কবির হোসাইন বলেন, "কৃষকের জন্য ভালো মানের দেশি বীজ কম দামে ও সময়মতো পাওয়া নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি বীজের বাজার কমে গেলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো সেই জায়গা দখল করবে।"

তবে বীজ বিক্রি কমার পেছনে সামগ্রিক কৃষি পরিস্থিতির প্রভাব দেখছেন বিএডিসি কুমিল্লার উপপরিচালক (বীজ বিপণন) নিগার হায়দার। তিনি বলেন, "কৃষক উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শ্রমিক সংকট রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। এসব কারণে অনেক কৃষক কৃষিকাজ থেকে সরে যাচ্ছেন।"

তিনি আরও জানান, "কৃষিতে লাভ কমে গেলে চাষের পরিমাণও কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বীজের চাহিদায়। বীজের দামও কৃষকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। নগর এলাকায় অনেকের কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এখন ছাদবাগান কিংবা সীমিত পরিসরে সবজি চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে। বড় পরিসরে কৃষিজমিতে চাষ কমে যাওয়ায় বীজের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।"