জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ ও জনগণের সাহসী লড়াই সত্ত্বেও দেশে প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মোটাদাগে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বহাল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অল্টারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম। শনিবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অল্টারনেটিভসের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন এবং ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন।

‘দেশের অবস্থা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে পাঠকৃত বিবৃতিতে অল্টারনেটিভসের জাতীয় সাংগঠনিক কমিটির মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার পরিবর্তন হলেও কাঠামোগত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তা নতুন মোড়ে ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ, সংগঠিত হওয়া, প্রতিবাদ অব্যাহত রাখা ও প্রয়োজনে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মাহফুজ আলম অল্টারনেটিভসের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন; অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য নিরসন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন; জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা; ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গ্রেপ্তার সকল ব্যক্তি ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়া; মানবাধিকার কমিশন, গুম-সংক্রান্ত কমিশন ও এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন) আইন কার্যকর করে ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

এছাড়া দাবিগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট সমাধান; কুইক রেন্টাল ও অসম চুক্তিতে জড়িতদের জবাবদিহি; আমদানি, অলিগার্ক ও বিদেশি কোম্পানিনির্ভরতা কমানো; নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার ও জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ‘স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা অধ্যাদেশ–২০২৫’ ও ‘রোগী সুরক্ষা ও প্রতিকার অধ্যাদেশ–২০২৫’ আইন আকারে প্রণয়ন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সুলভ রাখা, মানসম্মত উৎপাদন ও ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতি প্রণয়নেরও দাবি জানানো হয়। নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

শ্রম ও শিক্ষা খাত সংক্রান্ত দাবিগুলোতে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও শ্রম আইন, ২০২৬ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন; বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি; চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনঃকর্মসংস্থান; সারসংকটের সমাধান; কৃষকদের ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন; নতুন কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা; দলীয় পক্ষপাতমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগ প্রথা চালু; প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল; জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়ন; বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন—এসব বিষয়ও দাবিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।