জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চল মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সরকার ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা উচিত। একইসাথে এই ব্যর্থতার দায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এড়াতে পারবেন না। তিনি এনসিপির সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন খাতে অবহেলা ও দুর্নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এ সভায় এনসিপির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম সভাপতিত্ব করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সারজিস আলম বলেন, ‘আমরা যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসব বিষয় তুলে ধরি, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা উড়িয়ে দেন। একটি সমস্যার সমাধান তখনই সম্ভব, যখন তা সমাধানের মানসিকতা থাকে। বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—তারা নিজেদের সমস্যাকে সমস্যা বলেই স্বীকার করতে চায় না।’
তিনি ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক শিক্ষিকার ছিনতাইকারীর কবলে প্রাণহানির ঘটনা এবং রংপুরে সনাতন ধর্মাবলম্বী একই পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, দেশে নিত্যদিন এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নারী নির্যাতন, হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধের প্রতিবেদন জমা পড়ছে দাবি করে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে অপরাধের হার অনেক বেড়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের দিকে সুদৃঢ় নজরদারি বাড়ানো জরুরি। আইনশৃঙ্খলার অবনতি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকিতে ফেলবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে সরকারের পলিসিগত ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে সারজিস আলম অভিযোগ করেন, পেট্রোল পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল। সরকার সেই সিন্ডিকেটের কাছে নতিস্বীকার করে তেলের দাম বাড়ালেও পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন আর ছিল না, যা নির্দেশ করে তেল ও ডিজেল পর্যাপ্ত ছিল কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় তা মজুত রাখা হয়েছিল। দাম বৃদ্ধির প্রভাবে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও হুহু করে বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে সারা দেশের মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারের মধ্যকার একটি গোষ্ঠী প্রতিটি খাতকে ব্যবহার করে লুটপাট, চাঁদাবাজি ও ধান্দাবাজি চালিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। বিভিন্ন খাত থেকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। বিএনপি তাদের এমপি, মন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের এই অপকর্ম থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক সুশাসনে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের বেহাল দশা তুলে ধরে সারজিস আলম বলেন, অর্থমন্ত্রী কিংবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী যদি বলেন যে সমস্যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, তবে অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা উচিত। শুধু একজন মন্ত্রীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দায় এড়াতে পারেন না। কোনো মন্ত্রী যদি দক্ষতা দেখাতে না পারেন, তবে তাকে অপসারণ করা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। তা না করে ব্যর্থতার এই নাটক দেখতে থাকলে দায়ভার তার ওপরই বর্তাবে। জনগণকে আর দুর্ভোগে ফেলবেন না; দ্রুত সমাধান না এলে জনগণের ক্ষোভ সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতে ফ্যাসিবাদের দোসরদের তৎপরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফেরার একটি গুঞ্জন বা ‘হাওয়া’ দেখতে পাচ্ছে—যা মূলত নেটদুনিয়া ও ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের ফেরার কোনো সুযোগ নেই। এই স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডে গণহত্যাকারী, খুনি ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা কখনোই ফিরে আসতে পারবে না। সে দেশে ফিরলে জনগণ তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু স্বৈরাচার ও খুনীদের রুখে দেওয়ার প্রশ্নে জুলাই আন্দোলনের সব শক্তি এক হয়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবে।
বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, ৩ আগস্টে শহীদ মিনারে যে রুমিন ফারহানা আপাকে দেখেছিলাম, আজ আওয়ামী লীগের প্রশ্নে তার কণ্ঠ কোমল (সফট) হয়ে যেতে দেখে প্রশ্ন জাগছে। গণহত্যাকারী ও খুনিদের বিষয়ে কোনো দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ নেই। বিএনপি বা অন্য কোনো দল গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে—সে বিষয়ে আশা রাখা যায়, কিন্তু খুনিদের ক্ষমা করার সুযোগ নেই। আমরা রুমিন ফারহানাকে নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত জাজমেন্টে যেতে চাই না। তবে তার মধ্যে যদি এই ধরনের কোনো সহানুভূতির জায়গা তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত পরিহার করা উচিত। অন্যথায় গণহত্যাকারীদের পক্ষে প্রেম তাদের দিকেই, তাদের পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।
সভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ উদ্দিন মাহদী, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার ও ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক বাকের আহমেদ মজুমদারসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।