মাঠে ‘মেসি’ লেখা ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলছিলেন হোয়াকিন নামের এক ফুটবলার। কিন্তু ছোট্ট গ্যালারিতে যখন ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি উঠল, সেটি তার জন্য ছিল না। দর্শকদের চোখ তখন হুড টেনে বসে থাকা অন্য একজনের দিকে।
তিনি লিওনেল মেসি। রোজারিওর কাছের আর্রোয়ো সেকোয় বসে আর্জেন্টিনার চতুর্থ বিভাগের একটি ম্যাচ দেখছিলেন। হাতে মাতে, পাশে পরিবারের সদস্যরা। মাঠে খেলছিল তার প্রতিষ্ঠিত ক্লাব লিওনেস, যার সভাপতি মেসির ভাই মাতিয়াস।
লিওনেস ম্যাচটি ২-০ গোলে হেরে যায়। মেসি তবু শেষ বাঁশি পর্যন্ত বসে থাকেন। পরে দর্শকদের অটোগ্রাফ দিয়ে নীরবে গাড়িতে উঠে চলে যান। দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে উঠে আসা এই দৃশ্যটির মাত্র ছয় দিন আগেই তার পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
গত ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিলেন মেসি। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জেতে স্পেন।
৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য সেটিই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ২০১৪ সালের পর আবারও ফাইনালে হারলেন তিনি। তবে এবার আর চার বছর পর ফিরে এসে গল্পটি বদলে দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেননি মেসি। পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, এই ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে।
বিশ্বকাপ হারার বেদনার আড়ালে তখন মেসির জীবনে চলছিল আরও বড় এক দুশ্চিন্তা। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তার বাবা হোর্হে মেসি। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি যতটা সম্ভব গোপন রাখা হয়েছিল।
বিশ্বকাপের শুরুতেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর কেঁদেছিলেন মেসি। পরে জানিয়েছিলেন, কঠিন কিছু দিনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। সতীর্থ ও দলের অন্য সদস্যরা তাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন।
বাবার অসুস্থতা নিয়েই পুরো বিশ্বকাপ খেলেছেন মেসি। তার চাওয়া ছিল, আর্জেন্টিনা যেন যত দূর সম্ভব যায় এবং বাবা ছেলের আরও একটি ম্যাচ দেখার সময় পান। দল ফাইনালে উঠলেও হোর্হে তখন সেটি উপভোগ করার মতো অবস্থায় ছিলেন না।
হোর্হে শুধু মেসির বাবা ছিলেন না, ছিলেন তার ফুটবলজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। কিশোর বয়সে চিকিৎসা ও ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য ছেলেকে আর্জেন্টিনা থেকে বার্সেলোনায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মেসির প্রতিনিধি হিসেবে চুক্তি ও দলবদলসহ মাঠের বাইরের প্রায় সব বিষয় সামলেছেন।
বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনা দলের বেশির ভাগ সদস্য দেশে ফিরলেও মেসি কিছুটা পরে রোজারিওয় যান। বাবার সঙ্গে দেখা করাই ছিল তার ফেরার প্রধান কারণ। সেই সময়ই আর্রোয়ো সেকোর ছোট মাঠে লিওনেসের ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন তিনি।
কয়েক দিন বাবার সঙ্গে কাটিয়ে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন মেসি। ১ আগস্ট ইন্টার মায়ামির হয়ে কলম্বাস ক্রুর বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠেও নামেন। কিন্তু এক সপ্তাহ পরই আবার রোজারিওয় ফিরতে হয় তাকে।
৮ আগস্ট দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৬৮ বছর বয়সে মারা যান হোর্হে। মায়ামির পরের ম্যাচের আগে তার স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। গোল করার পর মেসির নাম ও ১০ নম্বর লেখা জার্সি দেখিয়ে বন্ধুর পাশে দাঁড়ান রদ্রিগো দে পল।
বাবাকে হারানোর পর মেসির লেখা বিদায়ী বার্তাতেই তার মানসিক অবস্থার গভীরতা বোঝা যায়। তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমাকে ছাড়া কী করব, জানি না। ফুটবলও আর কত দিন চালিয়ে যাব, তা নিয়ে আমার সংশয় আছে।’
এরপরও দীর্ঘ বিরতি নেননি মেসি। বাবার মৃত্যুর মাত্র চার দিন পর লিওনের বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামেন। দলটি ম্যাচটি হারে ৩-২ গোলে। তিন দিন পর ন্যাশভিলের বিপক্ষে ৪-১ গোলের পরাজয়ে পেনাল্টিও কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।
ফিলাডেলফিয়ার বিপক্ষে গোল ও সহায়তা করলেও মায়ামি ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র করে। টরন্টোর বিপক্ষেও গোল পান মেসি, কিন্তু দল হারে ২-১ ব্যবধানে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা পাঁচ ম্যাচ জয়ের বাইরে চলে যায় গত মৌসুমের এমএলএস চ্যাম্পিয়নরা।
এই ফলগুলোর দায় শুধু মেসির ওপর চাপানো অন্যায় হবে। শোক সঙ্গে নিয়ে তিনি মাঠে ফিরেছেন। মাঠে নামতে পারা এবং মানসিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। তার তৎকালীন কোচ গিলের্মো হোয়োসও বলেছিলেন, এমন ব্যথা এক দিনে কাটে না। মেসির প্রয়োজন নীরবতা, শান্তি এবং নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ।
২০২৮ সাল পর্যন্ত ইন্টার মায়ামির সঙ্গে মেসির চুক্তি রয়েছে। কিন্তু বাবাকে লেখা তার কথাগুলো সেই চুক্তির বাইরেও একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ফুটবল চালিয়ে যাওয়ার আগের তাগিদ তিনি ফিরে পাবেন কি না, সেটির উত্তর সম্ভবত মেসির নিজের কাছেও এখন নেই।
ক্যারিয়ারের প্রায় প্রতিটি কঠিন মুহূর্তের জবাব মেসি দিয়েছেন মাঠে। কখনো গোল করে, কখনো শিরোপা জিতে। কিন্তু এবার প্রতিপক্ষ কোনো দল নয়। একটি গোল কিংবা একটি জয় দিয়ে এই শোক হারানো সম্ভব নয়।
এই সময়ে তাই মেসিকে তাঁর পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করার সুযোগ কম। এক মাসের মধ্যে বিশ্বকাপ হার এবং বাবার মৃত্যুর ধাক্কা সামলানো মানুষটির এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সময়। ফুটবলও হয়তো অপেক্ষা করবে সেই পরিচিত হাসিটি আবার দেখার জন্য।