প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ট্রামা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল অস্ট্রীয় কবি গেয়র্গ ট্রাকলকে। ১৯১৪ সালের ৩ নভেম্বর অতিরিক্ত কোকেন সেবনের ফলে তাঁর মৃত্যুর আগে মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ‘গ্রুডেক’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেন।

৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৭ সালে জন্মগ্রহণকারী ট্রাকল ছিলেন একজন ফার্মাসিস্ট। কেমিস্ট হিসেবে তিন বছর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তিনি আর্মির একটি মেডিক্যাল ইউনিটে লেফটেন্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইউক্রেনের গ্রুডেক নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে রাশিয়ান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান বাহিনী ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়। পরাজয়ের পর প্রায় ৯০ জন মারাত্মক আহত সৈনিককে চিকিৎসার জন্য ট্রাকলের কাছে সমর্পণ করা হয়। ওষুধের অভাব, অ্যানেসথেসিয়ার অনুপস্থিতি এবং ডাক্তার না হওয়া সত্ত্বেও একা ৯০ জন যুদ্ধাহত সৈনিকের চিকিৎসা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর চাপে।

এই চরম পরিস্থিতি ট্রাকলের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন এবং কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঐ হাসপাতালে অবস্থানকালেই তিনি ‘গ্রুডেক’ কবিতাটি রচনা করেন।

ইংরেজি থেকে কবিতাটি অনুবাদ করেছেন মেহেদী হাসান। নিচে কবিতাটির সম্পূর্ণ পাঠ দেওয়া হলো:

গ্রুডেক

সন্ধ্যায়, শরতের বৃক্ষরা
মারণাস্ত্র হাতে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তোলে, সোনালি খেত
আর নীল ঝিলের ওপর সূর্য ওঠে, অস্ত যায়। মৃত্যুপথযাত্রী
যোদ্ধাদের, তাদের ক্ষতবিক্ষত মুখের পশুবৎ কাতরতাকে,
আলিঙ্গন করে রাত্রি।

ধু ধু সবুজ প্রান্তরে নিভৃতে জমাট বাঁধতে থাকে লোহিত মেঘ;
এখানে, লাল লাল মেঘের কোলে, থাকে এক রাগত খোদা;
চারদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে চাক চাক রক্ত, আছে অধর চাঁদের স্তব্ধতা;
যত পথ ছিল খোলা সব মিলিয়েছে মিশকালো গহ্বরে।

শরতের রাত্রি আর তারকারাজি ছড়িয়ে দিয়েছে সোনালি ডালপালা
তার নিচে, নিঃশব্দ ঝোপঝাড় মাড়িয়ে,
বীরদের আত্মাদের, তাদের রক্তাক্ত মস্তকেরে অভিনন্দন জানাতে,
ধীর লয়ে এগিয়ে যায় আমাদের বোনেদের ছায়া।
কাশবনে কোমল সুরে বেজে ওঠে শরতের মরনবাঁশি।
হে মহান যন্ত্রণা! এ কেমন বলিদান!
সন্ধ্যায়, অনাগত সন্তানেরা, এক সুতীব্র বেদনা হয়ে,
আত্মার উত্তপ্ত আগুনেরে বাড়াইতেছে ক্রমে।