রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী এলাকার রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানাটিতে ১৭৭ জন শ্রমিক কাজ করতেন। কর্মচারীসহ মোট জনবল ছিল ১৯০ জন। ছোট এই কারখানা গত বছর প্রায় ২০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছিল।

কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুবুল হাসান ফয়সাল আজ শুক্রবার নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্যদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি নানান উপায়ে চেষ্টা করেছি, প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার। কিন্তু সফল হতে পারলাম না। শুধু ব্যবসায়িক মন্দার জন্যই না, কিছু মানুষের স্বার্থান্বেষী চেষ্টাতেও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছি।...সবার কাছে আমি দোয়া চাই, আমি যেন ফ্যাক্টরির একটা সুব্যবস্থা করে সমস্ত পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করে একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি।’

এই বার্তার সূত্র ধরে আজ দুপুরে মাহবুবুল হাসান ফয়সালের সঙ্গে কথা হয় মুক্তকণ্ঠের এই প্রতিবেদকের। দীর্ঘ আলাপে তিনি তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা, নানা প্রতিকূলতা, ব্যবসার সুদিন এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে না পারার গল্প তুলে ধরেন। তাঁর আক্ষেপ, কোনো ব্যাংকঋণ ছাড়াই ১৯ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?

.

মাহবুবুল হাসান জানান, ২০০৬ সালে আরও পাঁচজন অংশীদারকে নিয়ে তিনি মিরপুরে ম্যাট্রিক্স স্টাইল নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি প্রথমে সাব–কন্ট্রাক্টিংয়ের কাজ করত। পরের বছর সরাসরি রপ্তানি শুরু করে। কিন্তু অংশীদারদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় সেই ব্যবসা আড়াই বছরের বেশি টেকেনি। ওই কারখানা করার আগে তিনি আড়াই বছর ট্রেডিং ব্যবসা করেছিলেন। তারও আগে দুই অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্কিন প্রিন্টের কারখানা ছিল তাঁর।

২০০৯ সালে একই এলাকায় ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস নামে নতুন কারখানা শুরু করেন মাহবুবুল হাসান। আগের ব্যবসা থেকে পাওয়া ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পুরোনো মেশিন কেনেন। কিন্তু আবাসিক ভবনে কারখানা করায় প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পাচ্ছিলেন না। সে কারণে অন্য দুটি কারখানার নামে ঋণপত্র নিয়ে নিজের কারখানায় উৎপাদিত পোশাক রপ্তানি করেন। পরে রপ্তানির অর্থ এলে ওই কারখানাগুলো তাঁর পাওনা আটকে দেয়। এরপর আরেকটি কারখানার নামে ক্রয়াদেশ এনে কাজ করাতে থাকেন। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি।

.
ব্যবসা করতে গিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা (ব্যাংকঋণ নয়) এখন আমার ঘাড়ে। কীভাবে এই দায় থেকে বের হব, বুঝতে পারছি না। ১৯ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা কারখানাটি বিক্রির চেষ্টা করছি, যাতে এটি কারও না কারও হাত ধরে বেঁচে থাকে। সেটি হলেও কিছুটা সান্ত্বনা পাব।
মাহবুবুল হাসান, এমডি, ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস
.

২০১১ সালে মিরপুরের রূপনগরে একটি কমার্শিয়াল শেড ভাড়া নিয়ে কারখানা স্থানান্তর করেন মাহবুবুল হাসান। ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স সংগ্রহ করে নিজের নামে রপ্তানি শুরু করেন। কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ছোট ছোট ক্রয়াদেশ দিতে থাকে। ব্যবসাও বাড়তে থাকে। জমির মালিক নতুন ভবন নির্মাণ করে দিলে সেখানে কারখানার কার্যক্রম চলতে থাকে।

তবে রানা প্লাজা ধসের পর অনিরাপদ কারখানা ভবনের বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থা ও ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স কড়াকড়ি আরোপ করে। ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের ভবনটি বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নির্মিত না হওয়ায় সেটিকেও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

.

এরপর ২০২২ সালের শেষ দিকে মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের পেছনে একটি ভাড়া শেডে কারখানাটি স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই ২০২৩ সালে ৪১ লাখ ডলারের, অর্থাৎ ৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। তখন ফ্রান্স, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, জার্মানি, স্পেন ও ইতালির ১০ থেকে ১১টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাজ করত ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস।

কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় উন্নীত হয়। মাহবুবুল হাসান বলেন, এতে উৎপাদন ব্যয় একলাফে অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু ক্রেতারা বাড়তি মূল্য দিতে রাজি হয়নি। উল্টো একটি পুরোনো ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানটি বড় চাপের মুখে পড়ে।

.

মাহবুবুল হাসান বলেন, মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস-সংকটের কারণে ডায়িং খরচ বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কিছু ক্রেতা লিড টাইম কমিয়ে দেয়। এর মধ্যেই আবার মজুরি ৯ শতাংশ বাড়ে। একের পর এক ব্যয় বাড়লেও ক্রেতারা পোশাকের দাম না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে দেয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় না ওঠায় অনেক ক্রয়াদেশ ছেড়ে দিতে হয়। অন্যদিকে ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে সময়মতো ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানি করা যায়নি। এভাবেই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এদিকে ২০২৪ সালে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের রপ্তানি নেমে আসে সাড়ে ২০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের প্রায় অর্ধেক। গত বছর রপ্তানি আরও কমে হয় ১৭ লাখ ডলারে। চলতি বছর ক্রয়াদেশের সংকটে কয়েক মাস ধরে কারখানাটিতে সাব–কন্ট্রাক্টিংয়ের কাজ চলছিল।

.

মাহবুবুল হাসান বলেন, রপ্তানি কমে যাওয়ায় গত সাত-আট মাস শ্রমিকদের বেতন দিতেই হিমশিম খেতে হয়েছে। সাব–কন্ট্রাক্টিং করেও খরচের টাকা ওঠেনি। প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। কারখানার ভাড়াও ৯ মাস বকেয়া পড়েছে। এমনকি একটি ফ্ল্যাট ব্যাংকে বন্ধক রাখতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

মাহবুবুল হাসান হতাশার সুরে বলেন, ‘ব্যবসা করতে গিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা এখন আমার ঘাড়ে। কীভাবে এই দায় থেকে বের হব, বুঝতে পারছি না। ১৯ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা কারখানাটি বিক্রির চেষ্টা করছি, যাতে এটি কারও না কারও হাত ধরে বেঁচে থাকে। সেটি হলেও কিছুটা সান্ত্বনা পাব।’