চশমা ব্যবহারকারীদের জন্য লেন্সে জমে ওঠা আঙুলের ছাপ, ধুলা বা তেলতেলে দাগ একটি সাধারণ সমস্যা। কখন যে লেন্সে দাগ লাগল তা বোঝাও যায় না। ফলে কিছুক্ষণ পর চশমার কাচ ঘোলা হয়ে দেখতে অসুবিধা হয়। সমস্যা হলো, পরিষ্কার করতে গিয়ে অনেকেই শার্ট, ওড়না, টিস্যু বা হাতের কাছে থাকা যেকোনো কাপড় ব্যবহার করেন। এতে আপাতদৃষ্টিতে দাগ উঠে গেলেও লেন্সে সূক্ষ্ম আঁচড় পড়তে পারে। বিশেষ করে লেন্সে ধুলার কণা থাকা অবস্থায় শুকনো কাপড় দিয়ে ঘষলে এই ঝুঁকি বাড়ে। তাই চশমা পরিষ্কার করার সময় শুধু দাগ তোলা নয়, লেন্সের আবরণ ও স্বচ্ছতাও ঠিক রাখার দিকে নজর দিতে হবে।

প্রথমে পানি দিয়ে ধুলা সরানো জরুরি। চশমার লেন্সে ধুলা জমে থাকলে সরাসরি কাপড় দিয়ে ঘষবেন না। কারণ ধুলার ছোট কণাগুলো লেন্সের ওপর ঘষা খেয়ে আঁচড় তৈরি করতে পারে। প্রথমে স্বাভাবিক বা হালকা কুসুম গরম পানির নিচে চশমাটি ধুয়ে নিন। এতে লেন্সের ওপর থাকা ধুলা ও অন্যান্য আলগা কণা সরে যাবে। তবে খুব গরম পানি ব্যবহার করা উচিত নয়। পানি দিয়ে ধোয়ার সময় লেন্সের পাশাপাশি নাকের ওপর বসে থাকা অংশ এবং ফ্রেমের কানের পাশের অংশও পরিষ্কার করুন। এসব জায়গাতেও তেল, ঘাম ও ধুলা জমে থাকে।

চশমার লেন্সে আঙুলের ছাপ বা তেলতেলে দাগ থাকলে সামান্য তরল সাবান ব্যবহার করা যায়। আধা কাপ কুসুম গরম পানিতে কয়েক ফোঁটা মৃদু তরল সাবান মিশিয়ে নিতে পারেন। তবে এমন সাবান বেছে নেওয়া ভালো যাতে লোশন, ময়েশ্চারাইজার বা অতিরিক্ত সুগন্ধি উপাদান নেই। খুব অল্প পরিমাণ সাবানই যথেষ্ট। বেশি সাবান ব্যবহার করলে পরে লেন্সে আস্তরণ পড়ে যেতে পারে। সাবান ব্যবহারের পর পরিষ্কার পানি দিয়ে লেন্স ভালোভাবে ধুয়ে নিন। লেন্সে সাবানের অংশ থেকে গেলে শুকানোর পর আবার দাগ দেখা দিতে পারে।

চশমা পরিষ্কার করার জন্য মাইক্রোফাইবার কাপড় ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতিগুলোর একটি। এটি লেন্সের ওপর জমে থাকা পানি, তেল ও আঙুলের ছাপ তুলতে সাহায্য করে এবং সাধারণ কাপড়ের তুলনায় সূক্ষ্ম আঁচড়ের ঝুঁকি কমায়। চশমা মোছার সময় খুব জোরে ঘষবেন না। লেন্সের ওপর কাপড় আলতোভাবে চালিয়ে পানি ও দাগ তুলে ফেলুন। মাইক্রোফাইবার কাপড়টিও নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। কাপড়ের মধ্যেই যদি ধুলা ও ময়লা জমে থাকে, তাহলে সেটি দিয়ে লেন্স পরিষ্কার করার সময় উল্টো আঁচড় পড়তে পারে।

চশমা পরিষ্কারের ঘরোয়া উপায় হিসেবে পানি ও অল্প সাদা ভিনিগারের মিশ্রণ ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সব ধরনের লেন্সের আবরণ ভিনিগারের মতো অম্লীয় উপাদানের সঙ্গে একইভাবে প্রতিক্রিয়া করে না। আধুনিক চশমার অনেক লেন্সে আঁচড় প্রতিরোধী, আলো প্রতিফলন কমানো বা অন্য ধরনের বিশেষ আবরণ থাকে। তাই চশমার প্রস্তুতকারকের নির্দেশনায় অনুমতি না থাকলে নিয়মিতভাবে ভিনিগার ব্যবহার না করাই নিরাপদ। বিশেষ করে দামী বা বিশেষ আবরণযুক্ত লেন্স হলে চশমার দোকান বা প্রস্তুতকারকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কিছু ঘরোয়া পরিষ্কারের পদ্ধতিতে পানির সঙ্গে অল্প অ্যালকোহল ও বাসন মাজার তরল মেশানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু চশমার লেন্সে থাকা বিশেষ আবরণের কথা বিবেচনা করে নিজের মতো করে অ্যালকোহল বা অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা ঠিক নয়। সব ধরনের লেন্সের আবরণ একই নয়। বিশেষ করে অ্যান্টি-রিফ্লেকটিভ বা অন্য বিশেষ আবরণযুক্ত লেন্স পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে চশমার দোকান বা প্রস্তুতকারকের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করাই ভালো।

চশমা পরিষ্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলোর একটি হলো শার্ট বা কাপড়ের হাতা দিয়ে লেন্স মুছে নেওয়া। চোখে দেখার জন্য লেন্স যতই পরিষ্কার মনে হোক, কাপড়ের তন্তু এবং তাতে আটকে থাকা ধুলার কণা লেন্সের ওপর সূক্ষ্ম আঁচড় তৈরি করতে পারে। এসব আঁচড় প্রথম দিকে চোখে ধরা না পড়লেও সময়ের সঙ্গে লেন্স ঘোলা দেখাতে পারে। তাই বাইরে থাকলেও সঙ্গে একটি পরিষ্কার মাইক্রোফাইবার কাপড় রাখা ভালো। হাতের কাছে মাইক্রোফাইবার কাপড় না থাকলে টিস্যু ব্যবহার করার প্রবণতা অনেকেরই আছে। কিন্তু সব ধরনের টিস্যু লেন্স পরিষ্কারের জন্য উপযুক্ত নয়। কাগজের তন্তু লেন্সের বিশেষ আবরণে ক্ষতি করতে পারে এবং শুকনো টিস্যু দিয়ে ঘষলে আঁচড়ের ঝুঁকিও থাকে। জরুরি অবস্থায় আগে পানি দিয়ে লেন্সের ধুলা সরিয়ে নেওয়া এবং পরে উপযুক্ত কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করা নিরাপদ পদ্ধতি।

চশমা পরিষ্কার করার পুরো প্রক্রিয়াটি খুব সহজ। প্রথমে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন। এরপর চশমাটি পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে লেন্সের ধুলা সরিয়ে ফেলুন। প্রয়োজন হলে এক ফোঁটা মৃদু তরল সাবান ব্যবহার করুন। আঙুলের ডগা দিয়ে খুব আলতোভাবে লেন্স পরিষ্কার করুন। এরপর সাবানের সবটুকু পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সবশেষে পরিষ্কার মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে লেন্স আলতোভাবে মুছে নিন। চশমার ফ্রেম, নাকের ওপর বসার অংশ এবং কানের পাশের অংশও পরিষ্কার করুন। এসব জায়গায় ঘাম ও তেল জমে থাকলে চশমা দ্রুত নোংরা হয়ে যায়।

চশমা ভালো রাখতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস করা যায়। লেন্সে ধুলা থাকা অবস্থায় শুকনো কাপড় দিয়ে ঘষবেন না। খুব গরম পানি ব্যবহার করবেন না। শার্ট, ওড়না বা যেকোনো কাপড় দিয়ে লেন্স মুছবেন না। মাইক্রোফাইবার কাপড় পরিষ্কার রাখুন। লেন্সে বেশি চাপ দিয়ে ঘষবেন না। চশমা ব্যবহারের পর কেসে রাখুন। বিশেষ আবরণযুক্ত লেন্স হলে প্রস্তুতকারকের পরিষ্কার করার নির্দেশনা অনুসরণ করুন। লেন্সে আগে থেকেই আঁচড় পড়ে গেলে ঘরোয়া উপায়ে তা ঘষে তুলে ফেলার চেষ্টা করবেন না।

একবার লেন্সে স্থায়ী আঁচড় পড়ে গেলে ঘরোয়া উপায়ে সেটি পুরোপুরি তুলে ফেলা সাধারণত সম্ভব নয়। বরং বেকিং সোডা, টুথপেস্ট বা অন্য কোনো ঘষে পরিষ্কার করার উপাদান ব্যবহার করলে লেন্সের বিশেষ আবরণ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই আঁচড় পড়লে নতুন করে কোনো ঘরোয়া উপায় প্রয়োগ না করে চশমার দোকানে দেখানো ভালো। প্রয়োজনে লেন্স বদলাতে হতে পারে।

আসলে চশমা একেবারে বেশি নোংরা হওয়ার অপেক্ষা না করাই ভালো। নিয়মিত পরিষ্কার করলে লেন্সে তেল ও ময়লা জমে শক্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে। প্রতিদিন ব্যবহার করলে দিনের শেষে একবার পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে পারেন। বাইরে বেশি সময় থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে লেন্স মুছে নিন। তবে কাপড় দিয়ে মুছতে যাওয়ার আগে লেন্সে ধুলা বা বালির কণা আছে কি না খেয়াল করুন। থাকলে আগে পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়াই ভালো। চশমার লেন্স পরিষ্কার রাখতে খুব দামি কোনো উপকরণের প্রয়োজন নেই। পরিষ্কার পানি, মৃদু তরল সাবান এবং একটি ভালো মাইক্রোফাইবার কাপড়ই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুলভাবে লেন্স ঘষে পরিষ্কার না করা। আঙুলের ছাপ বা দাগ তোলার তাড়াহুড়োয় শার্ট, টিস্যু কিংবা অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে দাগ উঠলেও লেন্সে স্থায়ী আঁচড় পড়ে যেতে পারে। তাই চশমা পরিষ্কার করার সময় লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ঝকঝকে করা নয়, লেন্সের স্বচ্ছতা ও বিশেষ আবরণও দীর্ঘদিন ভালো রাখা।

সূত্র: নিউজ ১৮