কাজী নজরুল ইসলাম মানেই যেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অগ্নিময় উচ্চারণ। অথচ তাঁর গদ্যেও ধরা পড়ে সময়, রাজনীতি, সাম্য ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। কথ্যভঙ্গি, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও জনতার প্রতি সরাসরি আহ্বানে গড়ে ওঠা সেই স্বতন্ত্র গদ্যভাষাই ‘নজরুলী গদ্য’। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা সেই ‘অচেনা’ অথচ শক্তিশালী গদ্যভুবন।
.শুরুটা গদ্য দিয়ে, অথচ সৃষ্টির প্রায় সবটাই গ্রাস করে নিয়েছে পদ্য; যাঁর প্রথম প্রকাশিত বই একটি ছোটগল্প সংকলন, তাঁর সব পরিচিতি আজ কবিতার করতলে বন্দী। নজরুলের ভাগ্যে এমনটাই ঘটেছে। স্কুলের চত্বরে থাকাকালে তিনি গল্প লিখতেন। তারুণ্যে ১৯১৯ সালে করাচি থেকে সওগাত–এ পাঠালেন ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’। ছাপা হলো সেই গল্প। ১৯২২ সালে প্রকাশ পেল তাঁর প্রথম বই ব্যথার দান। তার আগে প্রবল আলোড়ন তুলে বেরিয়ে গেছে কবিতা—‘বিদ্রোহী’। সেই উন্মাদনার ভেতর চাপা পড়ে গেছে এই তথ্যও—ওই বছরই প্রকাশিত হয়েছে অগ্নি-বীণা ও যুগ–বাণী। গদ্য-পদ্যের এই মেলবন্ধনে বাংলাভাষী পাঠক পেয়েছে নতুন এক লেখক। কিন্তু কবিতার নজরুল আমাদের কাছে যতখানি চেনা, গদ্যের নজরুল ঠিক যেন
ততখানিই অচেনা।
অথচ ‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, ‘আমার সুন্দর প্রথম এলেন ছোট গল্প হয়ে, তারপর এলেন কবিতা হয়ে। তারপর এলেন গান, সুর, ছন্দ ও ভাব হয়ে। উপন্যাস, নাটক, লেখা (গদ্য) হয়েও মাঝে মাঝে এসেছিলেন।’ এই আত্মস্বীকৃতির পাশে নজরুলের গদ্য বিষয়ে আমাদের আলাপ-আলোচনা ও বিশ্লেষণ তুলনামূলকভাবে কম নয় কি?
১০০ বছর পিছিয়ে গেলে দেখতে পাই, সময় ও প্রতিবেশ নজরুলকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে একরাশ গদ্য। কবিতা আর গানের তুলনায় সেই গদ্যসম্ভার নিতান্ত স্বল্পায়তন। কিন্তু গদ্য তো নজরুলের সৃষ্টিবিশ্বেরই একটি অংশ। ছোটগল্প ও উপন্যাসের মতো সাহিত্য-আঙ্গিকের শৈল্পিক হাতছানিতে তিনি সাড়া দিয়েছেন। লিখেছেন বইয়ের ভূমিকা ও সমালোচনা। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্মিলনে অংশ নিতে গিয়ে লিখেছেন অভিভাষণ। গদ্যের সে তালিকায় আছে তাঁর আবেগ-কম্পিত একগুচ্ছ চিঠি।
অন্যদিকে সময়ের প্রগাঢ় উত্তেজনায় উদ্বেলিত হয়ে লিখেছেন ‘সাংবাদিক গদ্য’। নজরুলের পেশাও তখন সাংবাদিকতা। সম্পাদনা করেছেন নবযুগ (১৯২০), ধূমকেতু (১৯২২), লাঙল (১৯২৬)। ১৯২০ থেকে ১৯২৬—এই কালপর্বের ভেতর তিনি হাত খুলে লিখেছেন সম্পাদকীয় নিবন্ধ। গদ্যগুলো ছাপা হয়েছে সেকালের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, গণবাণী, আত্মশক্তি, বুলবুল প্রভৃতি পত্রিকায়। আর সময়?
ঔপনিবেশিক ইতিহাসে তখন বহু কিছু ঘটে গেছে। বঙ্গভঙ্গ থেকে বঙ্গভঙ্গ রদ, একটি বিশ্বযুদ্ধ, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। খিলাফত আন্দোলন আর অসহযোগ আন্দোলন পেরিয়ে এসে গেছে পাকিস্তান প্রস্তাব। নজরুলের গদ্যে উৎকীর্ণ হয়ে আছে সেই সময়ের দাগ-নকশা-খতিয়ান। ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে ওঠা পরিচয়ের রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশীজন হয়ে উঠেছে নজরুলের গদ্য।
.নবযুগের পর্ব সামনে রেখে নজরুল তাঁর গদ্যে রাজনৈতিক ঐক্যবিন্দু গঠনের প্রস্তাব তুলেছেন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানের জন্য পেশ করেছেন সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ আহ্বান। নজরুল সারা জীবন এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই ভরসা করে চলেছেন। কিন্তু তা কখনোই তাঁর সম্প্রদায়গত পরিচয়কে ব্যাহত করেনি, বাতিল করে দেয়নি। নজরুলের গদ্যে সেই প্রমাণও হাজির। ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ শীর্ষক প্রবন্ধ কিংবা ‘তরুণের সাধনা’র মতো অভিভাষণে মুসলমান পরিচয়কেই তিনি শিরোধার্য করেন।.
নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’র (১৯১৯) কথাই ভাবা যাক। বিদেশি লেখকের বরাতে ভারতবর্ষ পত্রিকায় লেখক হেমেন্দ্রকুমার রায় দাবি করেছিলেন, ‘তুর্ক রমণীরা মোটেও সুন্দরী নয়।’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিজের প্রবন্ধে নজরুল লিখলেন, “একজন সাহেব বলে ফেলেছেন যখন, তখন তা বেদবাক্য” আর সাহেব যদি বাংলায় আসেন তাহলে আমাদের কুললক্ষ্মীদের রূপ বর্ণনায় লিখবেন, “বাঙালি মেয়েগুলো বিশ্রী কালো, তদুপরি তৈলচিক্বণ হওয়ায় বোধহয় যেন আবলুস কাঠে ফ্রেঞ্চ পালিশ বুলানো হয়েছে।” যুক্তি-তর্কের খেলানির্ভর ‘বস্তুনিষ্ঠ’ প্রবন্ধ এটি নয়। কিন্তু উপস্থাপনার রাজনীতির দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমি অপরায়ণের বিপরীতে ছোট্ট একটি জবাব হয়ে উঠেছে নজরুলের লেখা।
অন্য সব গদ্যে নজরুলের পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য আরও তীক্ষ্ণ। তিনি প্রবেশ করেছেন স্থান ও কালের গভীর মহলে। বিভিন্ন নিবন্ধে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় আন্দোলন ও অভিজাততন্ত্রের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে, ভাষাকে শাণিত করেছেন ব্যুরোক্রেসির বিরুদ্ধে। নজরুল যেন আধ্যাত্মিক কিংবা আত্মিক জাগরণের কথা বলেন, ভাবেন প্রবল শক্তিধর এক চিত্তশক্তির কথা; আত্মোপলব্ধির আলোয় যেমন করে চোখ মেলে তাকিয়েছিলেন বোধিসত্ত্ব বুদ্ধ। জাতীয় সমগ্রের ভেতর নজরুল শুনতে ও শোনাতে চান এই আহ্বান—‘আবির্ভাব হও’। ‘আল্লাহু আকবর’—এই উচ্চারণের ভেতরও নজরুল পেতে চেয়েছেন সমবায়ী শক্তি। নজরুলের এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা যায় ‘আধ্যাত্মিকতার রাজনীতি’—আত্মকে জাগাও, আত্মশক্তিও জাগাও, সমবেত হও একই ময়দানে, একই অভিমুখে, বদলে দাও নিজের সমাজ ও রাষ্ট্রকে।
আপাতভাবে মনে হতে পারে, এ ধরনের ভাবনা বুঝি ধর্ম আন্দোলনের দ্যোতনা ছড়ায়। কেউ কেউ মনে করতে পারেন, সামষ্টিক অভিপ্রায়ের ভেতর দিয়ে জাতীয় চেতনা কিংবা জাতীয়তাবাদ এভাবেই পরিগঠিত হয়। কিন্তু সমকালীন ইতিহাসের পাতা খুলে নজরুল দেখেছেন ধর্ম, শ্রেণি ও জাতীয়তার সীমানা ভেঙেই বিচ্ছিন্ন শক্তিসমূহ একীভূত হয়ে বড় বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছে। নজরুলের ভাষায় ‘একই অবিচ্ছিন্ন মহাত্মার অংশ বলিয়া অন্তরের দিক হইতে চিনিয়াছি।’ রাশিয়ার বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের জাগরণ কিংবা তুরস্কের বিপ্লবে যেন তা-ই ঘটেছে। জাগরণের ঐতিহাসিক এই পর্বকে নজরুল বলেছেন ‘নবযুগ’।
নবযুগের পর্ব সামনে রেখে নজরুল তাঁর গদ্যে রাজনৈতিক ঐক্যবিন্দু গঠনের প্রস্তাব তুলেছেন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানের জন্য পেশ করেছেন সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ আহ্বান। নজরুল সারা জীবন এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই ভরসা করে চলেছেন। কিন্তু তা কখনোই তাঁর সম্প্রদায়গত পরিচয়কে ব্যাহত করেনি, বাতিল করে দেয়নি। নজরুলের গদ্যে সেই প্রমাণও হাজির। ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ শীর্ষক প্রবন্ধ কিংবা ‘তরুণের সাধনা’র মতো অভিভাষণে মুসলমান পরিচয়কেই তিনি শিরোধার্য করেন। প্রকৃতপক্ষে, বিশ শতকের প্রথম তিন দশকে মুসলমানদের সম্পাদনা ও রচনায় নতুন এক ‘কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়’ গড়ে উঠেছিল, যার সাংস্কৃতিক পরিচয় ‘বাঙালি মুসলমান’; নজরুলের গদ্য সেই মুসলমানের পরিচিতি নির্মাণে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে। মৃত্যুক্ষুধা কিংবা কুহেলিকার আখ্যান ও গদ্য নির্বাচনের পেছনেও আছে এই ঐতিহাসিক কার্যকারণ।
.নজরুল তাঁর পাঠক বা উদ্দিষ্ট জনকে আহ্বান করেন, নির্দেশ দেন, এমনকি প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি চাও?—শৃঙ্খল, না স্বাধীনতা? তুমি কি চাও—তোমাকে লোকে মানুষের মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করুক, না পা-চাটা কুকুরের মতো মুখে লাথি মারুক?’ ‘উচ্চারণ’কে প্রাধান্য দেন বলে নজরুল কোনো বাক্য বা বক্তব্যের পাশে রেখে দেন সম্ভাব্য উচ্চার্য শব্দ। যেমন ‘একটি হাতির গর্দানে (স্কন্ধে) মাত্র চল্লিশ হাজার (বাপস্!) মাংসপেশি থাকে।’.
নজরুলের অবস্থানকে অনেকে কেবলই ‘উদারনৈতিক’ কাঠামোয় বিবেচনা করতে চান। পাশাপাশি তাঁর নবযুগের ধারণাকে শনাক্ত করতে চান ‘ইউটোপিয়া’ হিসেবে। এসব ক্ষেত্রে কারও কারও যুক্তি—সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের ‘উদারনৈতিক’ দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বিরল ঘটনা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবন, সাহিত্য, গদ্যে–পদ্যে আধ্যাত্মিক সমুন্নতি ও সংযোগের ধারণা এবং তার সঙ্গে বিপ্লবী উপাদানের সংমিশ্রণ সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু সহজলভ্য ব্যাপার ছিল? হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টাননির্বিশেষে বাঙালির মধ্যে এই চিন্তার সাহিত্যিক উপস্থাপন ও বিস্তার ছিল কি?
মূল ব্যাপারটা এই—নজরুলের ভাবনায় এসে জড়ো হয়েছে বিভিন্ন চিন্তা-ঐতিহ্যের সারবস্তু; তার মধ্যে অন্তত তিনটি খাত সহজভাবে চিহ্নিত করা যায়—ভারতীয় ধর্মসমূহের আধ্যাত্মিকতা ও সমাজ-রূপান্তরের ধারণা, জাতীয়তাবাদপ্রসূত জাতীয় ঐক্যবোধের অভিপ্রায় এবং মার্ক্সবাদের বৈষম্যমুক্তির ইশতেহার। নজরুলের গদ্যে—হোক তা প্রবন্ধ কিংবা কথাসাহিত্য—এই উপাদানগুলোর পরিভ্রমণই বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। উল্লেখ্য, তাঁর কবিতার মর্মসারেও নিহিত এসব উপাদান। প্রশ্ন হলো, জনতাকে যিনি বুঝতে চান, সমবেত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যাঁর মধ্যে প্রবল, গদ্যের পৃথিবীতে তিনি কীভাবে কথা বলেন?
বাংলা গদ্যের ইতিহাসে নজরুলের কবিতার মতোই চিহ্নিত হতে পারে ‘নজরুলী গদ্য’; অত্যুক্তির মতো শোনালেও ‘নজরুলী গদ্য’–এর বৈশিষ্ট্য বিবেচনাযোগ্য বলে মনে করি। কেননা নজরুল ‘উচ্চারণ’কে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন। সে কারণেই তিনি কথা বলেছেন উদ্দিষ্ট পাঠক ও জনতাকে সামনে রেখে। যেন তাঁর সামনে উপস্থিত কল্পিত পাঠক, উদ্দিষ্ট জন—যাকে তিনি কথাটি বা ভাববস্তুটি জানাতে চান। নজরুল তাই গদ্যে সম্বোধন করেন, ‘ঐ শোনো, শৃঙ্খলিত নিপীড়িত বন্দীদের শৃঙ্খলের ঝনৎকার। তাহারা শৃঙ্খল-মুক্ত হইবে, তাহারা কারাগৃহ ভাঙিবে।’
নজরুল তাঁর পাঠক বা উদ্দিষ্ট জনকে আহ্বান করেন, নির্দেশ দেন, এমনকি প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি চাও?—শৃঙ্খল, না স্বাধীনতা? তুমি কি চাও—তোমাকে লোকে মানুষের মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করুক, না পা-চাটা কুকুরের মতো মুখে লাথি মারুক?’ ‘উচ্চারণ’কে প্রাধান্য দেন বলে নজরুল কোনো বাক্য বা বক্তব্যের পাশে রেখে দেন সম্ভাব্য উচ্চার্য শব্দ। যেমন ‘একটি হাতির গর্দানে (স্কন্ধে) মাত্র চল্লিশ হাজার (বাপস্!) মাংসপেশি থাকে।’ কামাল পাশা প্রসঙ্গে লেখেন, ‘হাঁ, ব্যাটাছেলে বটে বাবা, একেই বলে বাপের ছেলে সুপুত্তুর।’ কথক হিসেবে ছোটগল্প আর উপন্যাসেও নজরুল বহাল রাখেন উচ্চারণের আবহ।
.‘কবির গদ্য’ বলে একটি অভিধা সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বেশ প্রচলিত। ধারণা করা হয়, কবি বলেই তাঁর গদ্যে ব্যবহৃত হবে কবিতার শিল্প-প্রকৌশল—থাকবে উপমার মালা, চিত্রকল্পের মাধ্যমে দৃশ্যায়িত হবে ভাব, রূপক আর প্রতীকের পোশাকে আচ্ছাদিত হবে চিন্তা। নজরুলের অবস্থান একই সঙ্গে এই আপ্তধারণার ভেতরে ও বাইরে। কেননা প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি গদ্যে কাব্যের প্রথাগত শক্তিগুলোকে ব্যবহার করেন, আবার কাব্য থেকে সরে গিয়ে ঢুকে পড়েন কথ্যের কোলাহলে।.
এই উচ্চারণ আদতে ধাবিত হয় কথ্যভঙ্গির দিকে। জনতার কাছে পৌঁছাতে চাইলে যেন এর কোনো বিকল্প নেই। তা ছাড়া সাংবাদিকতার প্রয়োজনে এই গদ্য সহৃদয়হৃদয়সংবাদী হতে বাধ্য। সে কারণে নজরুল বাঙালির কথনভঙিমাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইংরেজি থেকে সৃজিত অনুবাদমূলক গদ্যগুলোতেও নজরুল এ বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছেন। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, আঞ্চলিক, লৌকিক, স্ল্যাং-এর মধ্যে টানেননি কোনো বিভাজন-রেখা। অবারিতভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাংলা বাক্ভঙ্গি। যেমন গোলামির মতো বেঁচে থাকতে আগ্রহীদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘তবে তুমি জাহান্নামে যাও! তোমার সারমেয় গোষ্ঠী লইয়া খাও-দাও আর পা চাটো।’ নজরুলের সমকালে এই ধাঁচের সাংবাদিকী ও সাহিত্যিক গদ্যের নজির পাওয়া ভার। যদিও তত দিনে সংস্কৃতের কঠোরতা ভেঙে বাংলা গদ্য অনেকটাই শিথিল আর বহুস্বরিক হয়ে উঠেছে।
প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্রমথ চৌধুরীর কল্যাণে গদ্য পেয়েছে মৌখিকতার প্রশ্রয়। রবীন্দ্রনাথের কলমও চলেছে চলতি গদ্যের পথে। আমরা দেখি, নজরুলের গদ্য রবীন্দ্রনাথের তুলনায় কম বিমূর্ত, প্রমথ চৌধুরীর তুলনায় অনেক বেশি কথ্য। নজরুলের সাধু গদ্যেও পাওয়া যায় কথ্যের আস্বাদ। এই গদ্য কখনো কখনো ‘উইটি’, খানিকটা প্রমথ চৌধুরীর মতো; ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে কোনো ছাড় নেই। নজরুল শব্দ নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। বিরোধাভাসপূর্ণ উক্তি তৈরিতেও তাঁর আগ্রহ সমান। সত্যিকার অর্থে, উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক ও সংস্কৃতায়িত গদ্যের বিপরীতে নজরুলের গদ্য ব্যতিক্রমী। অবশ্য সংস্কৃত ভাষা ও শব্দের সঙ্গে নজরুলের কোনো বিরোধ নেই।
নজরুলের গদ্যের ধার ছিল। শাসকগোষ্ঠী তাই বেছে নিয়েছিল বই নিষিদ্ধকরণের পথ। বাংলা সরকারের হাত ধরে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল যুগ-বাণী, দুর্দিনের যাত্রী, রুদ্রমঙ্গল। ধার ছিল, ভার ছিল কি? অভিযোগ উঠেছে—উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে নজরুলের গদ্য যুক্তিনিষ্ঠ ও চিন্তার ভাষা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু নজরুলের লক্ষ্য যত না যুক্তি হাজির করা, তার চেয়ে বেশি পাঠকের মনে চিন্তা তৈরি করা এবং পাঠককে অভিভূত করে উপনিবেশিত শরীর ও সত্তার মুক্তি কামনা করা।
‘কবির গদ্য’ বলে একটি অভিধা সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বেশ প্রচলিত। ধারণা করা হয়, কবি বলেই তাঁর গদ্যে ব্যবহৃত হবে কবিতার শিল্প-প্রকৌশল—থাকবে উপমার মালা, চিত্রকল্পের মাধ্যমে দৃশ্যায়িত হবে ভাব, রূপক আর প্রতীকের পোশাকে আচ্ছাদিত হবে চিন্তা। নজরুলের অবস্থান একই সঙ্গে এই আপ্তধারণার ভেতরে ও বাইরে। কেননা প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি গদ্যে কাব্যের প্রথাগত শক্তিগুলোকে ব্যবহার করেন, আবার কাব্য থেকে সরে গিয়ে ঢুকে পড়েন কথ্যের কোলাহলে। যে বাস্তবতায় তাঁর বসবাস এবং তাঁর ভাষায় ধরা পড়েছে যে বাস্তবতা—সে দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধের জন্য প্রয়োজন পড়ে একটি গদ্যভাষার; নজরুল তেমন এক ভাষার কারিগর। তাঁর মতো গদ্যকারের এই শক্তি ঐতিহাসিকভাবেই পুনঃপাঠ দাবি করে।
সুমন সাজ্জাদ: কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়