ড্যানিয়েল ক্রাউস সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। নিউইয়র্ক বেস্টসেলার এই লেখক ১৯৭৫ সালের ৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’ ২০২৬ সালের পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেছে। এর আগে তাঁর ‘হোয়েলফল’ উপন্যাসটিও বিশ্বজুড়ে বেশ সাড়া ফেলেছিল। ওয়েবপোর্টাল ‘ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফিকশন’-এ প্রকাশিত এ সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন নকিব মুকশি

.

প্রশ্ন: ছোট করে ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’ সম্পর্কে বলুন—বইটি আসলে কী নিয়ে?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: এটি পাঁচ মার্কিন বেসরকারি সৈনিকের গল্প, যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে একজন দেবদূতের দেখা পায়। আর্টিলারি ফায়ারে আহত হয়ে সে আকাশ থেকে পড়ে গিয়েছিল। এই দেবদূতের এমন একটা ক্ষমতা ছিল যে সে তাদের সবাইকে বাঁচাতে পারে, এমনকি পুরো পৃথিবীকেও রক্ষা করতে পারে। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লোভ তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। তারা সেই দেবদূতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। এই প্রবণতা তাদের জীবন হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়।

এককথায় বললে, আমরা কীভাবে পৃথিবীতে শিল্পায়িত সহিংসতাকে (ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড ভায়োলেন্স) আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, এই বইয়ে মূলত সেটিই চিত্রায়িত হয়েছে। আর আমরা এখন এটা থামাতে অক্ষম, অনিচ্ছুকও বটে, যতক্ষণ না তা আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে।

প্রশ্ন: এই উপন্যাস তো একটিমাত্র বাক্যে লেখা হয়েছে! আপনি গল্প বলার জন্য কেন এমন অস্বাভাবিক পথ বেছে নিলেন? গল্পকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের লিখনশৈলী কী ভূমিকা রাখে বলে আপনি মনে করেন?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: বাক্যের এই গঠনরীতি বা সিনট্যাকটিক স্টাইল একধরনের লুপের মতো কাজ করে। এটি এমন এক কার্যকর ফাঁদ, যা পাঠককে বইয়ের ভেতর আটকে রাখে। এই বাক্যশৈলী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু হওয়া শিল্পায়িত যুদ্ধযানের চাকার অনবরত ঘুরে চলার প্রতীক। এটা পাঠকের মধ্যে এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিও তৈরি করে, যেমনটা সৈনিকদের মধ্যে দেখা যায়, যাদের একমুহূর্ত থামার বা ভাবার অবকাশ নেই, যারা কেবল আরেক সেকেন্ড বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে চলে।

প্রশ্ন: এই উপন্যাসের জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেই কেন আপনি বেছে নিলেন?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: আমি অন্য যুদ্ধকেও বিবেচনা করেছিলাম, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধটা এমন এক সময় হয়েছিল, যখন যুদ্ধপ্রযুক্তি সব মানবিক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যখন মানুষকে না দেখেই নির্বিচারে হত্যা করা সম্ভব হয়ে উঠেছিল। এই বিশ্বযুদ্ধ থেকেই সরাসরি একটা পথ গেছে পারমাণবিক যুদ্ধ, সামরিক ড্রোন আর ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দিকে, যা শেষ পর্যন্ত মানবজাতিকেই ধ্বংস করে দেবে।

প্রশ্ন:  আপনার ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’ বই নিয়ে পাবলিশার্স উইকলি লিখেছে, ‘ক্রাউস যুদ্ধ-উপন্যাস জনরায় নতুন প্রাণসঞ্চার করেছেন।’ এটি আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে? আপনি কি সচেতনভাবে যুদ্ধ-উপন্যাস সম্পর্কে পাঠকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চেয়েছেন?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: আমি আসলে ‘অ্যাঞ্জেল ডাউন’কে ক্ল্যাসিক ধারার যুদ্ধ-উপন্যাস হিসেবে ভাবিনি। তবে হ্যাঁ, আমেরিকান সাহিত্যে যুদ্ধ-উপন্যাসের দীর্ঘ ও উজ্জ্বল ইতিহাস আছে। তাই এমন তুলনায় আমি সম্মানিত বোধ করছি। আমি বরাবরই ভাবতাম যে আমি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের ধারণা নিয়েই লিখছি—যদিও অবশ্যই নির্দিষ্ট যুদ্ধ নিয়েও লিখেছি।

.
বৈচিত্র্যই আমার সৃষ্টিশীলতার জ্বালানি। আমি বিচিত্রভাবে পড়ি, বিচিত্রভাবে সিনেমা দেখি, বিচিত্রভাবে শুনি, আর লিখিও বিচিত্রভাবে। কোনো ঘরানা বা লিখনশৈলীই আমার স্পর্শের বাইরে রাখতে চাই না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি যে কাজগুলো করি, সেগুলো একে ওপরের চেয়ে এতটাই আলাদা যে তারা পরস্পরের জন্য ‘প্যালেট ক্লিনজার’ (একঘেয়েমি কাটানোর উপায়) হিসেবে কাজ করে।
.

প্রশ্ন:  আপনার ‘হোয়েলফল’ বইটি অবলম্বন করে রন হাওয়ার্ড ও ব্রায়ান গ্লেজারের প্রযোজনা সংস্থা ‘ইমাজিন এন্টারটেইনমেন্ট’ বড় বাজেটের একটি সিনেমা বানাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আপনি কতটা যুক্ত? আপনি কি আমাদের বলতে পারেন, সিনেমাটির কাজ এখন কোন পর্যায়ে আছে? এ পর্যন্ত এর যতটুকু দেখলেন, তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: এই যে আমরা কথা বলছি, এই সময়েও সিনেমাটির শুটিং চলছে। ব্যস্ততার কারণে শুটিং সেটে মাত্র কয়েকবার যেতে পেরেছি, কিন্তু যতটুকু দেখেছি, তাতে অভিভূত হয়েছি। এ রকম কাজ এর আগে কখনো দেখিনি।

প্রশ্ন:  আপনি তো বেশ সৃষ্টিশীল লেখক। আপনার সর্বাধিক বিক্রীত প্রাপ্তবয়স্ক উপন্যাস ছাড়াও পুরস্কারপ্রাপ্ত বইও রয়েছে। এ ছাড়া আপনি সিনেমা ও টেলিভিশনের জন্যও লিখেছেন। হরর জগতের ‘মাস্টার’ গিলারমো দেল তোরোর সঙ্গেও কাজ করেছেন এবং কিংবদন্তি সিনেমা নির্মাতা জর্জ এ রোমেরোর সঙ্গে দুটি কাজও সম্পন্ন করেছেন। কাজের এই বৈচিত্র্য একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে আপনাকে কতটা পুষ্ট করে? পছন্দের কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র আছে আপনার?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: বৈচিত্র্যই আমার সৃষ্টিশীলতার জ্বালানি। আমি বিচিত্রভাবে পড়ি, বিচিত্রভাবে সিনেমা দেখি, বিচিত্রভাবে শুনি, আর লিখিও বিচিত্রভাবে। কোনো ঘরানা বা লিখনশৈলীই আমার স্পর্শের বাইরে রাখতে চাই না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি যে কাজগুলো করি, সেগুলো একে ওপরের চেয়ে এতটাই আলাদা যে তারা পরস্পরের জন্য ‘প্যালেট ক্লিনজার’ (একঘেয়েমি কাটানোর উপায়) হিসেবে কাজ করে। ফলে কাজ নিয়ে ক্লান্তি বা বার্নআউট খুব একটা হয় না; বরং এক কাজের অনুপ্রেরণাই অন্য কাজের ভিত্তি তৈরি করে দেয়—এভাবেই চলতে থাকে।

প্রশ্ন:  আপনার সাম্প্রতিক লেখালেখি নিয়ে জানতে চাচ্ছি—অ্যাডাল্ট উপন্যাস, ইয়াং অ্যাডাল্ট বই, সিনেমা ইত্যাদি সম্পর্কে?

ড্যানিয়েল ক্রাউস: ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ‘ইউনিয়ন স্কয়ার কিডস’ থেকে আমার একটি মিডল গ্রেডের উপন্যাস দ্য জোকারস অন ইউ প্রকাশিত হয়েছে। এটি ‘গ্রেভইয়ার্ড গার্লস’ সিরিজের চতুর্থ বই, যা আমি লিসি হ্যারিসনের সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছি। এরপর ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর ভল্ট কমিকস থেকে এসেছে আমার লেখা গ্রাফিক নভেল আথানাসিয়া। বইটির অলংকরণ করেছেন পুরস্কারজয়ী কমিকশিল্পী দানি। ২০২৬ সালের ১০ মার্চ কাউন্টারপয়েন্ট প্রকাশ করেছে আমার নন-ফিকশন বই পার্শিয়ালি ডিভাওয়ার্ড। এটি মূলত নাইট অব দ্য লিভিং ডেড সিনেমা এবং সেটি নিয়ে আমার ঘোরগ্রস্ত থাকার প্রেক্ষাপটে লেখা। আর আমার পরবর্তী অ্যাডাল্ট ফিকশন হলো সাই-ফাই হরর উপন্যাস দ্য সিক্সথ নিক। এটি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের ‘সাগা প্রেস’ থেকে বাজারে এসেছে।