পরিপূর্ণ সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে সরকার আংশিক সংস্কার করতে চাইছে, এমন অভিযোগ এনে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। আজ বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলী শুরু হওয়ার আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের পাশাপাশি বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু আইনি সংস্কার আনা হয়েছিল। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বর্তমান সংসদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি। ফলে এগুলো কার্যকারিতা হারায়। আর সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।এগুলো আরও যাচাই–বাছাই করে নতুন বিল আনার কথা বলেছিল সরকার। এর একটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ।

অন্যদিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনঃপ্রচলনে এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল পাস করা হয়েছিল। তখন অধিকতর যাচাই–বাছাই করে মানবাধিকার কমিশন আইন আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছিল সরকার।

.

এই দুটি আইনের খসড়া অনুমোদন করার পর থেকে মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। খসড়ার কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষমতা দিয়ে অধ্যাদেশ করেছিল। সংসদে আনা বিলে এটা রাখা হয়নি। বলা হয়েছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করবে। অবশ্য বিলে বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ওই অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত শৃঙ্খলাবাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো শৃ্ঙ্খলাবাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করবে।

অন্যদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের নতুন খসড়া নিয়েও আপত্তি আছে অংশীজনদের। বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের যে ক্ষমতা প্রস্তাব করা হয়েছে এবং কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি করার প্রক্রিয়া—তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কমিশন কতটা স্বাধীন থাকবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আজ সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল তোলার আগে আগে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াক আউট করে।

.

আজ বিল দুটি সংসদে উত্থাপনের আগ মুহূর্তে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের জন্য এখানে তিনটি বিল আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। দেশে নানা সমস্যা বিরাজ করছে। এসব নিয়ে আলোচনার জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেটার জবাব পাননি।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘আজকে আমাদের সামনে এখন তিনটা বিল এসেছে। সেগুলো আজকে অবশ্য আলোচনা হবে না, উত্থাপনের জন্য এসেছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তার প্রক্রিয়াটা শুরু হবে।’

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সংসদ নির্বাচন অনুযায়ী, এর ফলাফল অনুযায়ী সংসদ আহ্বান করা হয়েছে; কিন্তু গণভোটের জন্য সংস্কার পরিষদের সে সভা আহ্বান করা হয়নি।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, গণভোটের রায় মানাতো হয়নি, উল্টো ১৩৩টা অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টা ল্যাপস (বাতিল) করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন—এ মৌলিক বিষয়গুলো ছিল। এগুলো ঠিক না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে দেশ মুক্তি পাবে না।

.

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘এখন আমরা দেখছি যে সেগুলো আস্তে আস্তে বিভিন্ন কায়দায় সরকারি দল এখানে নিয়ে আসছে।’

বৃহস্পতিবার সংসদে বেসরকারি দিবস উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আজকে এখানে যেভাবে সরকারি বিল উত্থাপন করা হচ্ছে, এটা বোধহয় কোনো ভালো নজির হবে না।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সংসদকে ঠেলে একতরফাভাবে, একপেশে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁরা নীতিগতভাবে এই ধরনের বিলে অংশ নিতে চান না।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি যে এর মাধ্যমে সংস্কারের যে মূল দাবি, সেটাকেই চাপা দেওয়া হয়। তো আমরা সেই চাপা দেওয়ার পক্ষে নাই। সংস্কারের মূল দাবির পক্ষে জোরালো ও স্পষ্ট অবস্থান আমাদের। আমরা এখান থেকে সরিনি।’

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা পুরা সংস্কার চাই, আমরা গণভোটের বাস্তবায়ন চাই এবং আমরা এইভাবে খণ্ডিত কোনো প্রসেসের অংশ হতে চাই না, এইজন্য আমরা এখন আর এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করব না। এই পর্বে আমরা সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমরা আবার ওয়াকআউট করছি।’

পরে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।

.স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে উত্তপ্ত সংসদ, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্পিকার