নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা এক চর আজ ‘ধানের শিষ’ নামে পরিচিত। পাকা সড়ক, ঘেরাবাড়ি, ধানের ক্ষেত আর মাছের খামারে ভরপুর এই এলাকাটি আগে ছিল ‘পোড়াচর’। নদীভাঙন, বসতি স্থাপন এবং এক রক্তাক্ত সংঘাতের মধ্য দিয়েই এই গ্রামের ইতিহাস গড়ে উঠেছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষে মেঘনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয় নোয়াখালীর পুরোনো শহর। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৫০-৫১ সাল নাগাদ জেলা সদর দপ্তর মাইজদীতে স্থানান্তরিত হয়। এর পরবর্তী দশকে, অর্থাৎ ১৯৬০ সালের দিকে, ভাঙা এলাকার দক্ষিণে নতুন চর জাগতে শুরু করে। ১৯৭৬-৭৭ সালে নদীর গতিপথ বদলে সেটি প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সরে যায়। মাঝখানে বিশাল আকারের কয়েকটি চর গড়ে ওঠে, যার একটিই বর্তমান ধানের শিষ গ্রাম।
১৯৭৭ সালের শুরুতে হাতিয়া উপজেলাসহ সন্দ্বীপ, রামগতি ও সদরের কালামুন্সি থেকে ভূমিহীন কৃষকরা এই চরে বসতি গড়েন। তখন নদী থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চরে প্রায় ৪০০ পরিবার বসবাস করত। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আমান উল্যাহ মাঝি (৮৪) জানান, তখনকার দিনগুলোতে শান্তি থাকলেও পরবর্তীতে একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন,
১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আষাঢ় মাসে পার্শ্ববর্তী চরলক্ষ্মীর দখলদার ব্যক্তিরা চরটির দখল নিতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সব বাড়িঘর। খেতের ফসল ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। কুপিয়ে, পিটিয়ে হত্যা করে বহু নারী-পুরুষকে। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ২১ জনের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল।
ওই হামলার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এলাকা পরিদর্শনে আসেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে চরে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হাতিয়া সফরকালে পোড়াচর পরিদর্শন করেন। জেলা প্রশাসন নতুন জেগে ওঠা চরসহ আশপাশের এলাকা জরিপ করে। তখনই পোড়াচরের মৌজার নাম পরিবর্তন করে ধানের শিষ মৌজা রাখা হয়। আশপাশের চরগুলোর নাম দেওয়া হয় চর বৈশাখী, ধানসিঁড়ি ও ধানশালিক। সময়ের সাথে সাথে মৌজার নাম অনুসরণ করেই ‘পোড়াচর’ গ্রামটি ‘ধানের শিষ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
রক্তাক্ত এই ঘটনার পর চরটিতে এসেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেকে। তখন জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তে চরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। কিছুদিন পর হাতিয়া সফরে আসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি সফরে এসে পোড়াচরের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন। পরে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নতুন জেগে ওঠা এই চরসহ আশপাশের চরে জরিপ পরিচালনা করা হয়। তখনই পোড়াচরের মৌজার নামকরণ করা হয় ধানের শিষ মৌজা হিসেবে।
ধ্বংসযজ্ঞের পর গ্রামটি ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হয়। বর্তমানে এখানকার লোকসংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার এবং ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ২০০। কৃষি এখানকার প্রধান পেশা হলেও প্রবাসী আয় ও ব্যবসা-বাণিজ্যও অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। বেকার তরুণ-যুবকদের মধ্যে উদ্যোক্তাদের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। তারা ১২টি মাছের খামার ও ৮টি মুরগির খামার গড়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করছেন। জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও পশুজাত দ্রব্য জেলা শহরে রপ্তানি হয়।
শিক্ষাখাতেও গ্রামটি এগিয়ে আছে। ১৯৯১ সালে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা পরে সরকারিকরণ হয়ে ‘মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নাম ধারণ করে। প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে এখানে ২৩০ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। পাশাপাশি কয়েকটি নুরানি মাদ্রাসাও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গ্রামের অর্ধশতাধিক তরুণ-তরুণী বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। মাহমুদুর রহমান ওরফে নিশান জানান, তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে থানার হাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর এইচএসসি শেষ করে বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, অন্য এলাকায় নিয়মিত নানা ঝামেলা লেগে থাকলেও এই গ্রামের মানুষ শান্তিপূর্ণ। এখানে সবার সহাবস্থান রয়েছে।
যদিও গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য পরিচিত, তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাদক সেবন ও বিক্রির হার বেড়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শেখ রিপন জানান, অপরাধমুক্ত এই এলাকায় রাজনীতির খোলস পরে কিছু লোক মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাই গ্রামের শান্তি ও পরিবেশ বজায় রাখতে মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে তিনি মনে করেন।