কক্সবাজার শহরের রেনেসাঁ হোটেল বারে সংঘর্ষের পর দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনও প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি। গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঝাউতলা এলাকার হোটেল বারে শুরু হওয়া মারামারিতে গুরুতর আহত হন নাজিবুল হক রাশেদ (২৭) ও মোহাম্মদ সোলাইমান ওরফে সালমান (২৯)। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উভয়েই মারা যান। ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হতে চললেও থানায় মামলা দায়ের হয়নি এবং কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি।

নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী ন্যায়বিচার দাবিতে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে রাশেদের এলাকায় এবং রাত আটটার দিকে সালমানের এলাকায় বাস টার্মিনালে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করে। শত শত পর্যটক সড়কে আটকা পড়লে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন।

কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আলী বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় এজাহার দিতে বলা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

বার ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার পর খুরুশকুল রাস্তার মাথা এলাকার আবু তাহের মিয়ার ছেলে তাজুয়ার হক রাদি ও সালমান বারে প্রবেশ করেন। ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, সালমান রাশেদকে জাপটে ধরেন। এরপর রাদি রাশেদের দিকে ছুরি ও কাঁচের বোতল নিয়ে হামলা করেন। আহত অবস্থায় রাশেদ বার থেকে নিচে নেমে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান, যেখানে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় কয়েক দফা মারধরে আহত সালমান পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন শুক্রবার সকাল ছয়টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, হামলার পর বারের বাইরে সালমানকে ধরে ফেলেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে রাশেদের স্বজনেরা সেখানে আসেন। তারা সালমানকে মারধর করে রাশেদের এলাকায় (ফিশারী ঘাট) নিয়ে যান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রেনেসাঁ হোটেল বারের ম্যানেজার তারেক জানান, রাশেদসহ পাঁচজন যুবক বারে প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে রাশেদের সঙ্গে কক্সবাজার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের আনসার নামের এক যুবকের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে আনসার ফোন করে আরও দুজনকে ডেকে আনেন। তারা এসে রাশেদকে ভাঙা বোতল ও ছুরি দিয়ে আঘাত করে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় স্থানীয় লোকজন সালমানকে আটক করেন বলে জানান তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. অহিদুর রহমান বলেন, বারের ভেতরের ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, কারা সরাসরি হামলায় জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হবে।

নিহত দুই যুবক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বলে স্বজনরা দাবি করছেন। সালমানের মা ফাতেমা বেগম বলেন, আমার ছেলে তার বন্ধুকে বাঁচাতে সেখানে গিয়েছিল। তার শরীরে প্রচুর আঘাত করা হয়েছে। আমি সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই। আমি রাশেদ হত্যার বিচারও চাই।

ছোট বোন রাজিয়া বিনতে কালাম বলেন, আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। খুনিরা বাঁচার জন্য এই হত্যাকাণ্ডকে গণপিটুনি বলে চালিয়ে দিতে চাইছে। আমার ভাইকে ওই সময় ফোন করে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এই নির্মম মৃত্যু আল্লাহ কাউকে না দিক।

জোড়া খুনের ঘটনায় কক্সবাজারের বারগুলোতে অ্যালকোহল বিক্রি ও পরিবেশনের নিয়মকানুন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী, ২১ বছরের কম বয়সী কাউকে অ্যালকোহল পানের পারমিট বা অনুমতি দেওয়া যায় না। বৈধ পারমিট ছাড়া অ্যালকোহল বিক্রি বা পরিবেশনও আইনসিদ্ধ নয়। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন বারে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের অনেক সময় পারমিট যাচাই ছাড়াই বসে মদ পান করতে দেখা যায়। সরকারি গেজেটে প্রকাশিত লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী, অনুমোদিত বার বা কাউন্টার ছাড়া অন্য কোনো স্থানে বিলাতি মদ বিক্রি বা পরিবেশন করা যাবে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে সরকার অনুমোদিত বার রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো, ঝাউতলার রেনেসাঁ, লাবণী পয়েন্টের কয়লা, কলাতলীর সি-গাল, সি প্যালেস, সি ক্রাউন, নিসর্গ, কক্স-টু ডে, সায়মান, ওশান প্যারাডাইস এবং ইনানীর রয়েল টিউলিপ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, কক্সবাজারে সাড়ে ৫ শতাধিক ব্যক্তির মদ পানের বৈধ পারমিট রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটক ও বিদেশি নাগরিকদের অনেকে বৈধ পারমিটধারী। এসব পারমিটের ভিত্তিতেই কক্সবাজারের বারগুলো পরিচালিত হয়।

তিনি জানান, বৈধ পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি না করতে বার কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। যারা নির্দেশনা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রেনেসাঁ হোটেলের বারে বৃহস্পতিবারের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, আলামত সংগ্রহ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রেনেসাঁ হোটেলের বারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘটনার সময় বারের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।