সত্যের স্বরূপ উন্মোচনে মানব ইতিহাসের আদিম ও জটিল প্রশ্নটি সেলুলয়েডের ফিতায় সবচেয়ে গভীরভাবে তুলে ধরেছিলেন জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া। আজ থেকে ৭৬ বছর আগে, ১৯৫০ সালের ২৬ আগস্ট জাপানের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল তাঁর কালজয়ী সাদাকালো চলচ্চিত্র ‘রাশোমন’। মুক্তির সময় হয়তো কেউ ভাবেনি, ছবিটি শুধু জাপানি সিনেমার ইতিহাসই বদলে দেবে না; বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রে সত্য, স্মৃতি এবং মানব প্রকৃতিকে দেখার ধরনও আমূল পাল্টে দেবে।
১৯১০ সালে টোকিওতে জন্ম নেওয়া আকিরা কুরোসাওয়া প্রথম জীবনে চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তরুণ বয়সে তিনি পশ্চিমা ও জাপানি শিল্পকলার নানা ধারা নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং নিয়মিত ছবি আঁকতেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করলেও সেই শিল্পীসত্তা কখনো তাঁকে ছেড়ে যায়নি। তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে দেখা যায় একজন চিত্রকরের সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি—আলোছায়ার ব্যবহার, চরিত্রের অবস্থান, আবহাওয়ার নাটকীয় প্রয়োগ এবং দৃশ্য নির্মাণের অসাধারণ নান্দনিকতা।
১৯৩৬ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করা কুরোসাওয়া যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী জাপানের সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক সংকট এবং নৈতিক দ্বন্দ্বকে নিজের চলচ্চিত্রে তুলে ধরেন এক অনন্য ভাষায়। একই সঙ্গে তিনি জাপানি ঐতিহ্য, শেক্সপিয়ারের নাটক, রুশ সাহিত্য ও পাশ্চাত্য চলচ্চিত্রভাষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। ফলে তাঁর সিনেমায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির এক বিরল মেলবন্ধন দেখা যায়। তাঁর নির্মিত ‘সেভেন সামুরাই’, ‘ইকিরু’, ‘ইয়োজিম্বো’, ‘থ্রোন অব ব্লাড’, ‘রান’ ও ‘ড্রিমস’ আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্ল্যাসিক হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে ‘সেভেন সামুরাই’ শুধু জাপানি সিনেমার নয়, সর্বকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। ছবিটির গল্প ও কাঠামো পরবর্তী সময়ে হলিউডের ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রকে প্রভাবিত করেছে।
তবে কুরোসাওয়ার আন্তর্জাতিক উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল ‘রাশোমন’। ১৯৫১ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জিতে নেয়। পরের বছর ছবিটি সম্মানসূচক একাডেমি অ্যাওয়ার্ডও লাভ করে। এর মাধ্যমে কুরোসাওয়া এবং তাঁর চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক পরিচিতি পায়। সে সময় পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দর্শক ও সমালোচকের কাছে জাপানি সিনেমা ছিল কার্যত অচেনা। ‘রাশোমন’ সেই অচেনা দরজাটি খুলে দেয়। ইউরোপ ও আমেরিকার দর্শেকরা উপলব্ধি করেন, জাপানি সিনেমার নিজস্ব নন্দনভাষা, গল্প বলার কৌশল ও দার্শনিক গভীরতা বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে সমানতালে দাঁড়াতে পারে। ভেনিসে ছবিটির সাফল্যই জাপানি সিনেমাকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
ছবিটির গল্প মূলত রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার ‘ইন আ গ্রোভ’ গল্প থেকে নেওয়া। আর ‘রাশোমন’ গল্প থেকেই এসেছে ছবির নাম এবং বৃষ্টির মধ্যে রাশোমন গেটের নিচে তিনজনের কথোপকথনের দৃশ্য। প্রাচীন কিয়োটোর বিখ্যাত রাশোমন গেট। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সেই ভগ্নপ্রায় দরজার নিচে আশ্রয় নেয় তিনজন মানুষ। তাদের কথোপকথনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে এক ভয়াবহ ঘটনা—গভীর জঙ্গলে একজন সামুরাইয়ের হত্যা এবং তার স্ত্রীর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা। ঘটনাটি নিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেয় চারজন—কুখ্যাত ডাকাত তাজোমারু, নিহত সামুরাইয়ের স্ত্রী, নিহত সামুরাইয়ের আত্মা (এক মাধ্যমের সাহায্যে) এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক কাঠুরে। এখানেই শুরু হয় কুরোসাওয়ার জাদু। চারজনের বর্ণনাই একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রত্যেকেই ঘটনাটিকে এমনভাবে তুলে ধরে, যাতে তার নিজের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সৎ, সাহসী কিংবা নির্দোষ বলে মনে হয়। ফলে দর্শকের সামনে ধীরে ধীরে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—আসল সত্যটি তবে কোথায়?
‘রাশোমন’-এর প্রভাব শুধু চলচ্চিত্রের পর্দায় থেমে থাকেনি; এর নামেই পরে পরিচিতি পায় একটি বহুল ব্যবহৃত ধারণা—‘রাশোমন ইফেক্ট’। মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন সামাজিক বিজ্ঞানে এই ধারণা ব্যবহার করা হয় এটা বোঝাতে যে একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেও মানুষের স্মৃতি, উপলব্ধি ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তার বর্ণনা ভিন্ন হতে পারে। কুরোসাওয়া দেখিয়েছিলেন, মানুষ একটি ঘটনাকে সব সময় একইভাবে মনে রাখে বা বর্ণনা করে না। স্মৃতি, ভয়, লজ্জা, স্বার্থ ও আত্মরক্ষার প্রবণতা একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে মনে রাখা বা বর্ণনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই ‘রাশোমন ইফেক্ট’ পরবর্তী সময়ে শুধু চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের পরিভাষা হয়ে থাকেনি; মানুষের স্মৃতি, সাক্ষ্য ও বাস্তবতার ধারণা নিয়ে আলোচনাতেও শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কুরোসাওয়ার প্রভাব শুধু জাপানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জর্জ লুকাসের ‘স্টার ওয়ার্স’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ছিল কুরোসাওয়ার ‘দ্য হিডেন ফোর্ট্রেস’। আবার সেভেন সামুরাই থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তৈরি হয় হলিউডের বিখ্যাত ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’। স্টিভেন স্পিলবার্গ, মার্টিন স্করসেজি, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলাসহ বহু নির্মাতা কুরোসাওয়ার কাজের প্রতি তাঁদের ঋণের কথা বলেছেন। তবে তাঁর প্রভাব আটকে থাকেনি হলিউডে। ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও চলচ্চিত্রেও কুরোসাওয়ার সিনেমা গভীরভাবে আলোড়ন তুলেছিল। বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায় কুরোসাওয়ার কাজের প্রবল প্রশংসা করেছিলেন। ‘রাশোমন’ দেখে সত্যজিৎ রায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি ছবিটি টানা তিন দিন দেখেছিলেন। অন্যদিকে কুরোসাওয়াও রায়কে বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্রকার হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য, ‘রায়ের সিনেমা না দেখা মানে পৃথিবীতে বাস করেও সূর্য বা চাঁদ না দেখা।’ দুই নির্মাতার সিনেমার ধরন ছিল আলাদা, তাঁদের সংস্কৃতিও ছিল ভিন্ন; কিন্তু মানুষের জীবনের নৈতিক সংকট ও দ্বন্দ্বকে তাঁরা দুজনেই খুব গভীরভাবে দেখেছেন। আর এ কারণে বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রেও কুরোসাওয়ার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৫০ সালের সেই সাদাকালো চলচ্চিত্র ৭৬ বছর পরও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—সত্য কি সত্যিই একটাই? ব্যক্তিগত স্বার্থ, স্মৃতি, আবেগ কিংবা মতাদর্শ—সবকিছুই সত্যের ব্যাখ্যাকে বদলে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে, যখন ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিনিয়ত আমাদের ঘিরে থাকে, তখন ‘রাশোমন’ যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কুরোসাওয়া কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেননি; বরং প্রশ্নটি আমাদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন—মানুষ কি সত্যকে যেমন ঘটেছে তেমনই বলে, নাকি সত্যেরও ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ থাকে?