সেই বাড়িটার কথা স্পষ্ট মনে আছে। বাড়ি নম্বর ৪২। কলকাতার চারু অ্যাভিনিউয়ে। হুম, এটাই ছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। করোনার আগের বছর বাড়িটা দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন যতটা আগ্রহ নিয়ে গিয়েছিলাম, ততটাই মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বাড়িটি ১৯৮২ সালে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কিনেছিলেন। কিন্তু ঠিক ভানুর কেনা সেই পুরোনো বাড়িটা আর নেই। তার জায়গায় মাথা তুলেছে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট। স্মৃতি বলে আর থাকল কি!
অবশ্য একটা বিষয় মুগ্ধ করেছিল। ভবনের বাইরে দেয়ালে উজ্জ্বল কিছু মানুষের ছবি। কোলাজ আকারে। তুলসী চক্রবর্তী, তুলসী লাহিড়ী, নবদ্বীপ হালদার, জহর রায়, রবি ঘোষ আর চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ভানু। ভালো লাগলো এলাকাটিকে ‘ভানু ব্যানার্জির পাড়া’ বলেই স্থানীয় লোকজন চেনেন। পুরোনো মানুষেরা চট করে বলে দেন, ওইটা ভানুর বাড়ি।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মানে তো আমাদের ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আসল পরিচয় অবশ্য একটাই, ঢাকার ‘পোলা’। নিজের বাঙাল পরিচয় নিয়ে গর্ব করা এই মানুষ জন্মেছিলেন এই বাংলায়, বিক্রমপুরের মুন্সিগঞ্জে ১৯২০ সালে। যার নাম শুনলেই যেমন মনে পড়ে যায় ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘আশিতে আসিও না’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর এ্যাসিট্যান্ট’, ‘পার্সোনাল এ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘ভানু পেল লটারি’, ‘অদৃশ্য মানুষ’, ‘হসপিটাল’ ইত্যাদি ছবির কথা। তেমনি চোখে ভেসে ওঠে পুরান ঢাকা, লক্ষ্মীবাজার, দক্ষিণ মৈশুন্দী, ভজহরি সাহা স্ট্রিট, ভূতের গলি, পোগোজ স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের কথা। তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন সময় এসব অঞ্চল, প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে বারবার।

.

ভাবতেও ভালো লাগে, একসময় এসব অঞ্চলে হেঁটে বেড়িয়েছেন ভানু, এসব প্রতিষ্ঠানে ভানু লেখাপড়া করেছেন। এসব অঞ্চলের আলো–ছায়ায় বড় হয়েছেন। বাতাস বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। এ তো আমাদেরও গর্ব।

.

‘কৌতুক অভিনেতা’—এই তকমায় বন্দী হয়ে গিয়েছিলেন ভানু। এ নিয়ে ভানুর আক্ষেপের শেষ ছিল না। তাঁর ভাষায়, ‘আমাগো দ্যাশে এইডাই ট্র্যাজেডি, কমেডিয়ানরে লোকে ভাঁড় ভাবে!’ আক্ষেপ ছিল মনের মতো অভিনয় করতে না পারারও। সে সময়েও যে খুব মন খুলে কৌতুকচর্চা করতে পেরেছিলেন, তা-ও নয়। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এ দেশের কৌতুকে রাজনৈতিক নেতাদের নাম নেওয়ার সাহস নেই। তাই এখনো কৌতুকে মানুষ বীরবল, গোপাল ভাঁড় বা শেক্‌সপিয়ারের “ফুল”দের খোঁজ করেছেন।’

.
‘কৌতুক অভিনেতা’—এই তকমায় বন্দী হয়ে গিয়েছিলেন ভানু। এ নিয়ে ভানুর আক্ষেপের শেষ ছিল না। তাঁর ভাষায়, ‘আমাগো দ্যাশে এইডাই ট্র্যাজেডি, কমেডিয়ানরে লোকে ভাঁড় ভাবে!’
.

তাহলে কি ভাঁড় ভেবেই দুই বাংলার দর্শক ভানুকে ভুলতে বসেছে? জন্মশতবর্ষে বাংলাদেশে ঢাকার এই পোলাকে নিয়ে বিশেষ কোনো আয়োজন দেখা যায়নি। কলকাতাতেও তেমন একটা কিছু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়নি। হতে পারে করোনা একটা কারণ। তাই বলে চলচ্চিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদানকে, তাঁর শৈল্পিক শক্তি বা প্রতিভাকে, হাস্যরসের মাধ্যমে অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রামকেও কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? আজ অবশ্য কলকাতায় তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে অন্যভাবে। আজ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। এই দিন উপলক্ষে ঘোষণা এসেছে, ‘যমালয়ে জীবন্ত ভানু’ ছবিটির। ইতিমধ্যে ছবিটির চিত্রনাট্যও লেখা হয়েছে। লিখেছেন কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। পরিচালনা করবেন সায়ন্তন ঘোষাল। ভানু অভিনীত জনপ্রিয় ছবির সাড়া জাগানো দৃশ্য ও এবং সংলাপও থাকবে এই ছবিতে। আর এই ছবিতে ভানুর চরিত্রে অভিনয় করছেন টালিউড তারকা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়।

.

বিরল অভিনেতাদের মধ্যে ভানুবাবু একজন
বললে বাড়াবাড়ি হবে না, উত্তমকুমারের যুগে অভিনেতা হিসেবে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু কমেডি নয়, অভিনয়ের বিচারেও যেকোনো চরিত্রে ছিলেন যোগ্য। কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজারের কলকাতার কড়চার ‘একাই ১০০’ প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, ‘খ্যাতির বিচারে তিনিই কার্যত বাংলা কমেডির উত্তমকুমার।’ বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় বলেছেন, ভানু অজস্র ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং যেখানে বিশেষ কিছু করার নেই, সেখানেও করেছেন। আশ্চর্য এই যে যা-ই করেছেন, তা বহরে ছোট হোক বা বড়ই হোক, তার মধ্যে তাঁর সাবলীলতার পরিচয় রেখে গেছেন। সর্বজনপ্রশংসিত বিরল অভিনেতাদের মধ্যে ভানুবাবু একজন।’

.
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বললে শুধুই একটা হাসানোর যন্ত্র মনে পড়ে না; একটা জীবনধারণা, জীবন সম্পর্কে একটা মন্তব্য যেন মনকে ছুঁয়ে যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে যেমন উত্তম-সুচিত্রা ছাড়া চলত না, তেমন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তীর গুরুত্বও অপরিসীম।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
.

প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বললে শুধুই একটা হাসানোর যন্ত্র মনে পড়ে না; একটা জীবনধারণা, জীবন সম্পর্কে একটা মন্তব্য যেন মনকে ছুঁয়ে যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে যেমন উত্তম-সুচিত্রা ছাড়া চলত না, তেমন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তীর গুরুত্বও অপরিসীম। উত্তম-সুচিত্রার মতো তাঁরাও জনপ্রিয় ছিলেন দর্শকদের কাছে। তাঁদের চাহিদাও ছিল সমান। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সৌমিত্র বলেছিলেন, ভানুদার সঙ্গে আড্ডা দেওয়াও সৌভাগ্যের বিষয়। বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন তিনি।

.

ঢাকার নবাবের আমমোক্তার জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘ইন্সপেক্টর অব স্কুলস’ সুনীতি দেবীর মেজ ছেলে ভানুর ভালো নাম ছিল সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের এই নাম নিয়েও মজা করতে ছাড়েননি, ‘আমি তো কমিউনিস্ট, নামেও বহন করি কমিউনিজম।’ ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট ৬০তম জন্মদিনে এক আড্ডায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘একদিন আমাকে এক ভদ্রলোক কমিউনিজম সম্বন্ধে বোঝাতে এসেছিল। তাকে বলেছিলাম, আজ থেকে ৫৯ বছর আগে আমার মায়ের বাবা আমার নাম রেখেছিলেন সাম্যময়! বুঝতে পারছেন, আমি কোন পরিবার থেকে এসেছি? দ্যাট আই অ্যাম আ কমিউনিস্ট, আই বিয়ার ইট ইন মাই নেম। আপনি আমার চেয়ে ভালো কমিউনিস্ট কী করে হবেন?’

.

স্বদেশি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সাম্যময়। ছাত্রজীবনেই নিষিদ্ধ বই, অস্ত্র নিয়ে পাচার করতেন বলে তাঁর বিভিন্ন লেখায় জানা যায়। একসময় বাধ্য হয়েই বন্ধুর গাড়ির ব্যাক সিটের পাদানিতে শুয়ে কলকাতায় পালিয়ে যান সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়, হয়ে ওঠেন ভানু। সালটা ছিল ১৯৪১।

.

ভানুকে নিয়ে নানা গল্প
ভানুকে নিয়ে অনেক গল্প। আজ জন্মদিনে তিনটি গল্প শোনাব। প্রথম গল্পটা বলেছেন ভানুপুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর বাবার খেলার জগৎ নিয়ে খুব আগ্রহ ছিল। খেলা বলতে ফুটবল। ইস্টবেঙ্গল-অন্তঃপ্রাণ। যখন চাকরি করতেন, ইস্টবেঙ্গলের খেলা মানেই অফিস ফাঁকি দিয়ে মাঠে হাজির!

.

মাঝেমধ্যে তাঁর সঙ্গে শচীন দেববর্মন আর হিমাংশু দত্ত আসতেন মাঠে। বিরতির সময় ভানু নিয়ম করে শচীন আর হিমাংশুর হাতে তুলে দিতেন এক খিলি পান আর চিনাবাদাম। এক দিনের ঘটনা। কলকাতার হাতিবাগান পাড়ায় গিয়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় দেখলেন রাস্তায় অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীকে ঘিরে ধরে তাঁর ধুতির কোঁচা, জামা ধরে টানাটানি করছে একদল ছেলে। দেখে মাথায় রক্ত উঠে গেল। গাড়ির দরজা খুলেই সোজা ওদের ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। কিল, ঘুষি, লাথি। নিমেষে সব হাওয়া। ধন্যবাদ দেওয়া দুরস্ত, উল্টো ভানুকেই আচ্ছামতো বকেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী। বললেন, ‘আহা, অত রাগিস কেন, একটু মজা করে যদি ওরা আনন্দ পায়, পাক না। খামোখা মারলি!’

.

দ্বিতীয় গল্প ভানুর সহশিল্পী জহর রায়কে নিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পরে আকাশবাণীর স্টুডিওতে রেকর্ডিং করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভানুর গলা থেমে আসছিল। বারবার সেদিন টেক নিতে হয়েছিল, এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন ভানু। কিন্তু তিনি স্টুডিও থেকে বের হওয়ার পরে তাঁকে দেখে হাসাহাসি করতে থাকে আশপাশের লোক! ‘কৌতুক অভিনেতা’র জীবন এমনই ট্রাজিক।
তৃতীয় গল্পটি বলেছেন ভানুর স্ত্রী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভানু আর নীলিমার বিয়ে হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। তখনো চলচ্চিত্রে নামেননি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন আয়রন অ্যান্ড স্টিল কন্ট্রোল বিভাগের চাকরিজীবী। বিয়ের চার দিনের মাথায় প্রথম সিনেমায় সুযোগ পান, কাউকে না জানিয়েই শুটিংয়ে চলে যান ভানু।

.

টালিগঞ্জের সামনে রাধা ফিল্মস স্টুডিওতে শুটিং। অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পরও ভানুর পাত্তা নেই দেখে চিন্তায় পড়ে যান স্ত্রী নীলিমা। বাবাকে নিয়ে রাধা ফিল্মস স্টুডিওতে গিয়ে দেখেন লিকলিকে মানুষটার গায়ে ছেঁড়া বস্তা। শীতে থরথর করে কাঁপছে। নতুন জামাইকে এ অবস্থায় দেখে শ্বশুর অবাক! ‘জাগরণ’ নামের সেই ছবিতে তাঁর চরিত্রটি ছিল দুর্ভিক্ষপীড়িত।

.

ভানুর দাপুট
সেই ‘দুর্ভিক্ষপীড়িত’ মানুষটাই এক দিন কলকাতার ছবির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা হয়ে উঠলেন। উত্তম-সুচিত্রা জুটির চেয়ে তাঁর দাপট কোনো অংশে কম ছিল না। প্রযোজকের সঙ্গে পারিশ্রমিক নিয়ে দর-কষাকষির সময় সরাসরি বলে দিতেন, ‘নায়ক-নায়িকাই শুধু শিল্পী? চরিত্র খালি তারাই সৃষ্টি করে? পার্শ্বচরিত্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা সবাই গরু-গাধা? আমাদের অবদান কোনো অংশে কম?’ ‘ওরা থাকে ওধারে’ সিনেমায় সুচিত্রা সেনের দৈনিক পারিশ্রমিক ছিল দেড় হাজার টাকা, ভানুর ছিল এক হাজার। ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিল দৈনিক আড়াই শ টাকা।

.

সেই সময়ে কোনো শিল্পীর নামে সিনেমা তৈরি হয়নি, স্বয়ং উত্তমকুমারকে নিয়েও নয়। ভানু ব্যতিক্রম। ‘ভানু পেল লটারি’ আর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ প্রভৃতি ছবির নামেও ভানুর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করেছিলেন পরিচালক।

.
জন্মদিন উপলক্ষে ঘোষণা এসেছে, ‘যমালয়ে জীবন্ত ভানু’ ছবিটির। ভানু অভিনীত জনপ্রিয় ছবির সাড়া জাগানো দৃশ্য ও এবং সংলাপও থাকবে এই ছবিতে। আর এই ছবিতে ভানুর চরিত্রে অভিনয় করছেন টালিউড তারকা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়।
.

অনেকের মতে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমায় তিনি উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ‘মাসিমা, মালপোয়া খামু’ সংলাপটি আজও অনেকে মুখে মুখে ফেরে। ফেসবুকে চর্চিত হয়, মিম হয় তাঁর ছবি ও সংলাপ। যেমন চর্চিত হয় ‘তর কিন্তু আমি লক্ষণ ভালো বুঝি না রে’, ‘ঢাকার পোলা ট্যালেন্টেড হইবই’ সংলাপগুলোও।
অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ছিলেন। তবে তাঁর এ সচ্ছলতাও কিন্তু সব সময় ছিল না।

.

একবার টালিউড সিনেমার সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলনে প্রযোজকদের বিরুদ্ধে আর অভিনয়শিল্পীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। টানা পাঁচ বছর তাঁকে কালোতালিকাভুক্ত করে রেখেছিলেন প্রযোজকেরা। এই সময় কোনো কাজ পাননি। তাই বলে অভিনয় থেকে দূরে থাকেননি। যাত্রা দল নিয়ে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন। বেশ কয়েকটি কৌতুকের অ্যালবামও আছে তাঁর, আজকাল ইউটিউবেও পাওয়া যায়। ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম অ্যালবামের নাম ‘ঢাকার গাড়োয়ান’।

.
ভানু অজস্র ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং যেখানে বিশেষ কিছু করার নেই, সেখানেও করেছেন। আশ্চর্য এই যে যা-ই করেছেন, তা বহরে ছোট হোক বা বড়ই হোক, তার মধ্যে তাঁর সাবলীলতার পরিচয় রেখে গেছেন। সর্বজনপ্রশংসিত বিরল অভিনেতাদের মধ্যে ভানুবাবু একজন।
সত্যজিৎ রায়
.

আঙ্গিক, বাচিক—দুই ধরনের অভিনয়েই ছিলেন দক্ষ, পরিমিতিবোধও ছিল অসাধারণ। তিনি বলতেন, সিরিয়াস অভিনয়ে বেশি কাঁদলে ক্ষতি নেই। কম কাঁদলেও চলবে। কিন্তু কৌতুক অভিনয়ে মাত্রাজ্ঞানটা প্রয়োজন। তাই খুব ভালো সিরিয়াস অভিনেতা না হলে ভালো কৌতুকাভিনেতা হওয়া যায় না। বিভিন্ন আড্ডায় আরেকটা কথা প্রায়ই বলতেন, জগতের সব মজার কথাই হলো সত্য কথা, তবে সেটা কোথায় আর কীভাবে বলতে হবে, জানা দরকার।

.

এই বিদ্যার মহারাজ ছিলেন ভানু। জানতেন, কোথায় আর কীভাবে বলতে হবে, সেই কথা। ভানুর অভিনয়ে, কৌতুক পরিবেশনে ‘বাঙাল’ ভাষা ছিল দারুণ একটা কৌশল। যদিও সত্যি হচ্ছে ভানুর ভাষাটা আমাদের এ বাংলার সর্বজনীন বা শুদ্ধ ভাষা না; তবে ভানুর দৌলতে ওপার বাংলায় ভাষাটা এতই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় যে এখনো ওপার বাংলার মানুষ এপারের ভাষা বলার চেষ্টা করেন ভানুর বলা ভাষায়। এমনকি নাটক, সিনেমাতেও!
ভাষা যা-ই হোক, ভানু হাসাতে হাসাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন দেশভাগের বেদনায় মিশে থাকা আক্ষেপের এক ইতিহাসবোধ। ১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ সেই বেদনা-আক্ষেপ নিয়েই কলকাতার উডল্যান্ডস হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ফেলেন ‘ঢাকার পোলা’ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
সূত্র: ভানুসমগ্র, আনন্দবাজার, আনন্দলোক