বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য লুকানো ডোর হ্যান্ডেল এখন চীনের সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কড়া নজরে। সম্প্রতি চীন সরকার ৪০ লাখেরও বেশি গাড়ি বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিশ্বখ্যাত টেসলা ব্র্যান্ডের। এটি চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গাড়ি প্রত্যাহারের ঘটনা।
চীনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়ির দরজার ভেতরে ও বাইরে জরুরি অবস্থায় দরজা খোলার জন্য যান্ত্রিক হাতল থাকা বাধ্যতামূলক। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনায় লুকানো হাতলের কারণে জরুরি মুহূর্তে গাড়ির দরজা খুলতে সমস্যা হয়েছে, যা উদ্ধারকাজে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
আধুনিক গাড়িতে লুকানো হাতলের ব্যবহার চীনে ব্যাপক হারে বেড়েছে। দেশটিতে বিক্রি হওয়া শীর্ষ ১০০টি নতুন জ্বালানির গাড়ির (হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক) প্রায় ৬০ শতাংশেই এই লুকানো হাতল ব্যবহৃত হচ্ছে। অটোমোবাইল খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনার্সের বিশ্লেষক স্টিফেন ডায়ার বিবিসিকে বলেন, এই নকশা গাড়িকে দৃষ্টিনন্দন চেহারা দেওয়ার পাশাপাশি বাতাসের বাধা কমায়। তবে প্রায়ই এগুলো ব্যবহারে বিভ্রান্তি হয়। তিনি আরও বলেন, “এমনকি অনেক সময় আমারও মনে হয়, অপরিচিত কোনো গাড়ির ভেতর থেকে দরজা খোলার জন্য সুইচ খুঁজে বের করাটা কঠিন।”
সম্প্রতি চীনে শাওমি এবং যুক্তরাষ্ট্রে টেসলার কয়েকটি মডেলে মারাত্মক দুর্ঘটনার পর এই নকশার ত্রুটি সামনে আসে। এসব দুর্ঘটনায় গাড়িতে আগুন লাগার পর যাত্রীদের বের করা সম্ভব হয়নি। জরুরি পরিস্থিতিতে দরজার লুকানো হাতল কাজ না করার আরও অনেক অভিযোগ উঠেছে। নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক লিউ চেন বলেন, গাড়ি দুর্ঘটনা বা বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অনেক সময় এই বৈদ্যুতিক বোতাম কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে ভেতরে থাকা যাত্রীরা আটকা পড়েন এবং বাইরে থাকা উদ্ধারকারীদের পক্ষে দ্রুত দরজা খোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
গত বছর চীনের গাড়ি কোম্পানি শাওমির এসইউ৭ মডেলের দুটি গাড়ি ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের পর গাড়ির দরজা আনলক না হওয়ায় যাত্রীরা ভেতরেই আটকে পড়েছিলেন। যদিও শাওমির প্রতিনিধিরা জানান, এসইউ৭ মডেলের প্রতিটি দরজার একদম নিচে যান্ত্রিক জরুরি হাতল আছে, যা বিদ্যুৎ–সংযোগ ছাড়াই কাজ করে। তবে এসইউ৭-এর নতুন সংস্করণগুলোয় এখন দরজার হাতল রাখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও এই দরজার হাতল ডিজাইনের জন্য টেসলা মামলার মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় টেসলার বৈদ্যুতিক পিকআপ সাইবারট্রাকের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনজন কলেজশিক্ষার্থী মারা যান। ওই ঘটনায় একমাত্র জীবিত ব্যক্তি জর্ডান মিলার টেসলার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার আইনজীবী ভিভিন ফার্ম অভিযোগ করেন, সাইবারট্রাকের ডিজাইনের কারণেই যাত্রীরা জ্বলন্ত গাড়ির ভেতরে আটকে পড়েছিলেন। গাড়িতে সাধারণ হাতল ছিল না এবং দরজা খোলার ইলেকট্রনিক বোতামগুলো দুর্ঘটনায় বিকল হয়ে যায়। যদিও আদালতে দায়ের করা নথিতে টেসলা যেকোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেছে, তাদের সাইবারট্রাক যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের নিরাপত্তা মান মেনে চলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চীন লুকানো হাতলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দেয়। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভেতর ও বাইরে থেকে যান্ত্রিকভাবে দরজা খোলার ব্যবস্থা ছাড়া কোনো গাড়ি বিক্রি করা যাবে না। একই সঙ্গে গাড়ির দরজায় জরুরি মুহূর্তে কীভাবে লক খুলতে হবে, তার নির্দেশিকা বা সংকেত থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গত ২১ আগস্ট চীনের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফর মার্কেট রেগুলেশন (এসএএমআর) টেসলা, শাওমি, জিলি ও এক্সপেনগের মতো প্রতিষ্ঠানের মোট ৪০ লাখের বেশি গাড়ি তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে এককভাবে টেসলারই গাড়ি আছে প্রায় ৩০ লাখ। নির্মাতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, গাড়ির ভেতরের হাতল সহজে চেনার জন্য নির্দেশক লেবেল লাগাতে হবে। সেই সঙ্গে ক্র্যাশ বা দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানালার কাচ নিচে নেমে যায়—এমন হালনাগাদ সফটওয়্যার দিতে হবে।
চীনের এই কঠোর সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সড়ক নিরাপত্তা সংস্থা এখন গাড়ির যান্ত্রিক নির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন বিশ্বজুড়ে গাড়ির অন্যতম বড় বাজার হওয়ায় তাদের এই নতুন নীতি শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে পরিবর্তন নিয়ে আসবে।