চলতি বছরের শুরুতেই দেশের বাজারে মুঠোফোনের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। কোম্পানি ও মডেলভেদে প্রতিটি মুঠোফোনের দাম বেড়ে যায় ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে সরকারের শুল্ক ছাড় দেওয়ায় দাম কমে আসবে বলে আশা দিয়েছেন মুঠোফোন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, ফেব্রুয়ারি শুরুর আগেই দাম কমতে পারে।

তবে বাস্তবে এই ‘দাম কমানো’ বলতে মূলত বাড়ানো দামের ওপর থেকে কিছুটা কমিয়ে আগের দামে ফেরা বলেই মনে করছেন অনেকে। ফলে শুল্ক ছাড়ের সুফল গ্রাহকেরা পাচ্ছেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।

দেশে এত দিন ‘অফিশিয়াল’ ও ‘আনঅফিশিয়াল’—এই দুই ধরনের মুঠোফোন বিক্রি হতো। কম দামের কারণে ক্রেতাদের কাছে বৈধ প্রক্রিয়ায় না আনা হ্যান্ডসেটের চাহিদাই বেশি ছিল। ‘অফিশিয়াল’ ফোন ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছিলেন, আনঅফিশিয়াল বাজারে চোরাই ও রিফার্বিশড সেট বিক্রি হচ্ছে, যা বৈধ ব্যবসার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের অক্টোবরে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর ঘোষণা দেয়। এর লক্ষ্য ছিল অবৈধ ও অনিবন্ধিত মুঠোফোনের ব্যবহার বন্ধ করা। তবে এনইআইআর চালুর ঘোষণার পর থেকেই আনঅফিশিয়াল মুঠোফোন ব্যবসায়ীরা প্রথমে এর বিরোধিতা এবং পরে সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ফলে সরকার ১৫ দিন এনইআইআর কার্যকরের সময়সূচি পিছিয়ে দেয়।

সে সময় ব্যবসায়ীরা মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানান, যাতে আনঅফিশিয়াল ব্যবসায়ীরাও বৈধভাবে আনা হ্যান্ডসেট বিক্রি করতে পারেন। একই সঙ্গে এনইআইআর চালু হলে মুঠোফোনের দাম বেড়ে যাবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তাঁরা।

পরে সরকার চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকেই এনইআইআর চালু করে। একই দিনে মুঠোফোন আমদানিতে শুল্কও কমানোর সিদ্ধান্ত হয়।

তবে ওই দিনই দেশের বাজারে অফিশিয়াল মুঠোফোনের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বৈশ্বিক বাজারে এআই চিপসেটের মূল্যবৃদ্ধিকে সামনে আনছেন। এ বিষয়ে শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আগে যে মেমোরিটা আমরা ১০ ডলারে কিনতাম, সেই মেমোরি এখন প্রায় ৬০ ডলার। বর্তমানে ল্যাপটপসহ যেকোনো ইলেকট্রনিক পণ্যে যেখানে মেমোরি ব্যবহার হচ্ছে, সবকিছুর দামই বেড়েছে। নেপালে ডিসেম্বরে, ইন্দোনেশিয়ায় নভেম্বরে এবং ভারতে ডিসেম্বরে দাম বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই কারণে দাম বেড়েছে।’

দাম কতটা কমতে পারে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মুঠোফোনের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি মুঠোফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

এনবিআরের হিসাবে, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের আমদানি করা প্রতিটি মুঠোফোনের দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো কমার কথা। আর ৩০ হাজার টাকার কম দামের প্রতিটি মুঠোফোনের দাম কমতে পারে দেড় হাজার টাকার মতো।

১৪ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবও বলেন, ‘যেহেতু শুল্ক কমেছে, তাই দাম অবশ্যই কমে আসবে।’

দাম কমানোর কথা বলছেন মুঠোফোন আমদানিকারকেরাও। আমদানি করা মুঠোফোনের ক্ষেত্রে এনবিআরের হিসাবকে সঠিক বলছেন তাঁরা। তবে দেশে সংযোজিত মুঠোফোনের ক্ষেত্রে মডেলভেদে দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কমতে পারে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সদস্য এবং এক্সেল টেকনোলজিসের (স্যামসাং ব্র্যান্ড) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাইফুদ্দিন টিপু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দেশে সংযোজিত ফোনের ক্ষেত্রে যদিও ৫ শতাংশ দাম কমার কথা বলা হচ্ছে, তবে এসটিএম বা এসকেডি পদ্ধতিতে আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক বিন্যাস জটিল হওয়ায় বাস্তবে এর প্রভাব পড়বে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশের মতো।

কবে থেকে দাম কমতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুদ্দিন টিপু বলেন, ‘যাঁরা বৈধভাবে ফোন আমদানি করেন, তাঁরা যখন নতুন পণ্য খালাস করবেন, তখন এই সুবিধা পাওয়া যাবে। আশা করা হচ্ছে, চলতি মাসের শেষ দিকেই বাজারে দামের সমন্বয় ঘটবে।’

সুফল কি পাওয়া যাবে

বৈধ মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের চলতি মাসের মূল্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪ জিবি র‍্যাম ও ৬৪ জিবি রমের শাওমি রেডমি এ৫ ফোনটির দাম গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ২ হাজার টাকা বেড়েছে। ৮ জিবি র‍্যাম ও ২৫৬ জিবি রমের রেডমি নোট ১৪ প্রো ৪জি মডেলের দাম বেড়েছে ৫ হাজার টাকা।

৮ জিবি র‍্যাম ও ১২৮ জিবি রমের ভিভো ওয়াই২১ডি মডেলের দাম বেড়েছে ২ হাজার টাকা। দাম বেড়েছে স্যামসাংয়েরও হ্যান্ডসেটেরও। কোম্পানিটির অন্তত দুই ডজন মডেলের দাম ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানির বিভিন্ন মডেলের মুঠোফোনের দাম বাড়ানো হয়েছে।

মুঠোফোন আমদানিকারকেরা যে দাম কমানোর কথা বলছেন, তা মূলত এই বর্ধিত দামের ওপর থেকে কমানো হবে। অর্থাৎ শুল্ক কমার ফলে মূল্য কমার যে প্রকৃত সুফল পাওয়ার কথা, তা ভোক্তারা পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে যখনই সরকার কোনো পণ্যের ওপর শুল্ক কমায়, সেই সুযোগ ব্যবসায়ীরাই নেন। মুঠোফোনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। এতে একদিকে রাষ্ট্র, অন্যদিকে জনগণ—দুই পক্ষই প্রতারিত হয়েছে।’

শুল্ক আরও কমানোর দাবি

ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক আরও কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এনইআইআর যেমন চালু রাখতে হবে, তেমনি মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক আরও কমিয়ে আনতে হবে। কারণ ‘গ্রে মার্কেট’ উঠে গেলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাবে। এতে কিছুটা সুবিধা নেবেন বৈধ আমদানিকারকেরা।

‘যত দিন সরকার শুল্ক আরও না কমাবে, তত দিন মুঠোফোনের দাম কমার সুফল ভোক্তারা পাবেন না,’ বলেন ফাহিম মাশরুর।