রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার অধিকার থাকলেও স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে মনে করছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ১৫টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীদের ঢল নামার নবম বর্ষপূর্তিতে ১৫টি দেশ ও ইইউর পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। বিবৃতিতে তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পথ খুঁজতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।

মঙ্গলবার ঢাকায় ফরাসি দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এই যৌথ বিবৃতিতে কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কসভো, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের গণহারে বাস্তুচ্যুতির পর ৯ বছর পেরিয়েছে। এখনো বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়ে গেছে। ওই ঘটনার বর্ষপূর্তিতে আমরা রোহিঙ্গাদের দৃঢ়তা, সাহস আর মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুতি ও বিভিন্ন দুর্ভোগের মধ্যেও রোহিঙ্গারা নিজেদের মধ্যে এসব গুণ ধরে রেখেছে। সেই সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার উদারতা দেখানোর জন্য আমরা বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের প্রতিও কৃতজ্ঞ।”

১৫টি দেশ ও ইইউ মনে করে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার অধিকার রয়েছে। তবে রাখাইনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানবিক সংকটও বাড়ছে। ক্রমেই বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতা, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মানবিক সহায়তা বিতরণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ঘটনা বিদ্যমান মানবিক সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল ক্রমেই বাড়ছে। বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে মিয়ানমারে ফেরার মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।

বিবৃতিতে ১৫টি দেশ ও ইইউ বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হলে কৌশলগত ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করতে হবে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে।

সফলভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে হলে তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে রাখাইনে ফিরে রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও সম্প্রদায় নতুন করে গড়ে তুলতে পারবেন বলেও মনে করছে এসব দেশ ও সংগঠন।

বিবৃতিতে ১৫টি দেশ ও ইইউ জানিয়েছে, “রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পথ খুঁজতে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাব। তত দিন পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের পাশে থাকব। তাদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করব। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করা হবে।”

এতে বলা হয়, ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার বিষয়টি শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর নির্ভর করছে না। তাদের কাছে সহায়তা কীভাবে আরও কার্যকর উপায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। ১৫টি দেশ ও ইইউ বিবৃতিতে বলেছে, এ জন্য আমরা স্থানীয় নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ সমর্থন করি। আমরা সহায়তা পরিকল্পনা ও সেসব বাস্তবায়নে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নেতৃত্বাধীন সংগঠনের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে।

তবে রোহিঙ্গাদের জীবন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার কেন্দ্রে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর থাকতে হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এ সংকট ১০ বছরে পা দিল। এ পরিস্থিতিতে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, রোহিঙ্গাদের যাতে কেউ ভুলে না যান। আমরা রোহিঙ্গাদের কণ্ঠ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে কাজ করে যাব। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মেলবন্ধনে রোহিঙ্গাদের জন্য বৈশ্বিক সমর্থন ধরে রাখার কাজ চলবে।”