ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুর গ্রামের বাসিন্দাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন। অন্ধকারে নদের স্রোতের শব্দ শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন নদপাড়ের মানুষ। কখন যে উঠানটুকুও নদে মিশে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে ঘুমানোর আগেই টিন, খুঁটি, ধান-চাল ও কাপড়চোপড় গুছিয়ে প্রস্তুত থাকেন অনেকে।
সত্তরোর্ধ্ব আবদুল মান্নান জীবনের চারবার বসতভিটা হারিয়েছেন। বর্তমানে মেঝো ছেলের সাথে যে বাড়িতে আছেন, সেটিও নদের সামনে। এরই মধ্যে দুটি ঘর ভেঙে পড়েছে। একসময় তার ২০ একর জমি থাকলেও এখন সব শেষ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "২০ একর জমিন ছিল, সবই শেষ। বাড়ি আর কত ভাঙব, আর কতবার বানবাম?"
স্থানীয়দের হিসাবে, গত দুই বছরে এই গ্রামের প্রায় দেড়শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বছরেও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক বাড়ির উঠান শেষ হয়ে ভাঙনের কিনারায় পৌঁছেছে। কেউ কেউ নদের ওপারে জেগে ওঠা চরে নতুন ঘর তুললেও সেখানেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মিলিক জান নামের এক নারী সাত বছর আগে স্বামী এবং পাঁচ মাস আগে এক ছেলেকে হারিয়েছেন। স্বামীর রেখে যাওয়া ২২ কাঠা জমিও এখন ব্রহ্মপুত্রের পেটে। তিনি বলেন, "স্বামী জমিজমা যা থুইয়া গেছিন, সব নদে গিয়া পড়ছে। আমার সুখের সংসার ছিল। কিন্তু নদভাঙনে আমি সব হারাইছি।"
একই সংকটে আছেন সোহেল রানা। এর আগে তিনবার বাড়ি ভাঙার পর এবার ভিটায় থাকা আটটি ঘর ঝুঁকিতে পড়েছে এবং ৩০ থেকে ৩৫ কাঠা কৃষিজমি নদে চলে গেছে। সিরাজুল ইসলাম জানান, খোদাবক্সপুর কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় ভাঙনে কৃষকদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি।
এই সংকট কেবল খোদাবক্সপুরে নয়, বরং গৌরীপুরের ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচর এবং ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরদড়ি-কুষ্টিয়া ও শ্রীকলদীসহ বেশ কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঙনামারী ইউনিয়নের বাসিন্দা আমান উল্লাহ আকন্দ জানান, বর্ষায় পানি বাড়লেই ভাঙন শুরু হয়, যার ফলে অনেক জমি ও বাড়িঘর ঝুঁকিতে রয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, "ভাঙনের সময় তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না। এর মধ্যে নদ আরও কয়েক হাত, কয়েক শ হাত এগিয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্রকে থামানো যাবে না। নদের গতিপথও সব সময় মানুষের ইচ্ছেমতো বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু নদের তীরে যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করছে, তাদের জন্য নিরাপদ বসতি, কার্যকর তীররক্ষা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করার ব্যবস্থা করা সম্ভব। সেই ব্যবস্থা যত দেরি হবে, তত বাড়ি হারাবে মানুষ।"
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলছে। পাউবোর ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, প্রায় ২৭০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি কাজ চলছে। চরদড়ি-কুষ্টিয়ায় ৬০ মিটার অংশে জিও টিউব এবং চর শ্রীকলদী, খোদাবক্সপুর ও মরিচারচরে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ডিপিপি প্রণয়ন ও কারিগরি কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং খোদাবক্সপুরে ব্লক দিয়ে তীর সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, নদীভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে অবৈধ বালু উত্তোলনের কথা উল্লেখ করেছেন জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। তিনি জানান, গত তিন মাসে দুটি বড় অভিযানে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও রাত ও ভোরে অবৈধ বালু উত্তোলনের চেষ্টা চলছে, যা ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি মামলা করা হচ্ছে।