মাছ, মাংস কিংবা ডাল—যা-ই রান্না করা হোক না কেন, সবকিছুতেই অপরিহার্য এক ‘ম্যাজিক উপাদান’ হলো রসুন। স্বাদ ও গন্ধ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যগুণের জন্য রসুনকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেকেই তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কোয়া কাঁচা রসুন খান। তবে প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্যের জন্য কাঁচা রসুন বেশি উপকারী, নাকি রান্না করা?

মাঝারি মাপের মাত্র দুই কোয়া কাঁচা রসুনে থাকে প্রায় ১৩ ক্যালরি। এতে ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ খুব বেশি না থাকলেও আছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যালিসিন।

অ্যালিসিন একটি সালফার যৌগ, যা রসুনের তীব্র ঝাঁজালো গন্ধের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে রসুনের বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতার পেছনেও অ্যালিসিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। রসুনের কোয়া থেঁতলে নিয়ে, কুচি বা টুকরা করে কাটার সময় এর ভেতরের অ্যালিনেজ নামের একটি এনজাইম সক্রিয় হয়। এরপর এই এনজাইম অ্যালিন নামের যৌগকে অ্যালিসিনে রূপান্তর করে।

অর্থাৎ রসুন কেটে বা থেঁতো করার পরই এর অ্যালিসিন তৈরি হতে শুরু করে। এ কারণে রসুন কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিও এর পুষ্টিগুণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রান্না করলে রসুনের পিএইচের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। রান্নার ফলে রসুনের কিছু পুষ্টি উপাদানের পরিমাণও কমে যেতে পারে, বিশেষ করে অ্যালিসিন।

অতিরিক্ত তাপে রসুন রান্না করলে অন্যান্য উপকারী যৌগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, রসুনে থাকা বি ও সি ভিটামিন পানিতে দ্রবণীয় হওয়ায় প্রচণ্ড তাপে রান্না করলে এসব ভিটামিনের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

সুইজারল্যান্ডের বাসেলভিত্তিক একটি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থা এমডিপিআই (মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিজিটাল পাবলিশিং ইনস্টিটিউট) তাদের এক গবেষণায় কাঁচা ও রান্না করা রসুনের তুলনা করে দেখা হয় কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ এবং ক্যানসারের বৃদ্ধি কমাতে কোনটি বেশি কার্যকর। এতে দেখা যায়, কাঁচা রসুন এসব ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও রান্না করার ফলে এর উপকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং এতে থাকা উপকারী যৌগের পরিমাণও হ্রাস পায়।

তবে কম তাপে (১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত) রসুন রান্না করলে অ্যালিসিনের কিছু উপকারিতা বজায় থাকতে পারে। তাই রসুন বেশি সময় রান্না না করে রান্নার একেবারে শেষ দিকে যোগ করা ভালো।

রসুনে থাকা অ্যালিনেজ এনজাইম তাপের প্রতি সংবেদনশীল। ফলে রসুন সরাসরি বেশি তাপে রান্না করলে অ্যালিসিন তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় বা বেশি তাপে রান্না করলে রসুনের কিছু ভিটামিন ও অন্যান্য উপকারী যৌগও কমে যেতে পারে।

মোটকথা, কাঁচা রসুনে অ্যালিসিন পাওয়া যায় বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে রান্না করা রসুনের কোনো উপকার নেই। রান্নার সময় কিছু ভিটামিন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এতে বিভিন্ন সালফারযুক্ত যৌগ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান বজায় থাকে।

কাঁচা রসুনে অ্যালিসিনের পরিমাণ বেশি থাকায় এর কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তবে রান্না করা রসুনেও উপকারী বিভিন্ন যৌগ ও পুষ্টি উপাদান থাকে। তাই কাঁচা রসুন খেতেই হবে, এমন নয়। কাঁচা রসুন খেলে মুখে তীব্র গন্ধ তো হয়ই, এ ছাড়া কাঁচা রসুন খেলে যাঁদের পেটে অস্বস্তি, বুকজ্বালা হয়, তাঁরা রান্না করা রসুন খেতে পারেন।

তবে রসুন রান্নার সময় একটি সহজ কৌশল কাজে লাগানো যায়। রসুনকুচি বা থেঁতলে নেওয়ার পর ৫-১০ মিনিট রেখে দিন। এরপর রান্নার একেবারে শেষ দিকে তা যোগ করুন। এতে অ্যালিসিনসহ কিছু উপকারী যৌগ যতটা সম্ভব ধরে রাখা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, কাঁচা হোক বা রান্না করা—যেভাবে রসুন খাওয়া আপনার জন্য আরামদায়ক এবং যেভাবে নিয়মিত খেতে পারবেন, সেভাবেই খেতে পারেন।