আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, শিং মাছ খেলে শরীরে রক্ত বাড়ে। বিশেষ করে রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়ই এই মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শিং মাছ পুষ্টিকর এবং এতে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকলেও শুধু এই মাছ খেলেই রক্তের পরিমাণ বেড়ে যাবে—বিষয়টি এত সহজ নয়।

রক্তের প্রধান উপাদান লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও স্বাভাবিক রাখতে শরীরে আয়রন, ভিটামিন বি১২ এবং ফলেটের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এর ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। শিং মাছসহ ক্যাটফিশজাতীয় মাছে এই ভিটামিন বি১২ থাকে। হেল্থলাইনের তথ্য অনুযায়ী, "১০০ গ্রাম তাজা ক্যাটফিশে দৈনিক প্রয়োজনের প্রায় ১২১ শতাংশ ভিটামিন বি১২ পাওয়া যেতে পারে।" একই পরিমাণ মাছে প্রায় ১৮ গ্রাম প্রোটিনও থাকে। ফলে শিং মাছ রক্ত তৈরির প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করলেও একে সরাসরি রক্ত বাড়ানোর ওষুধ হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়।

রক্তস্বল্পতার কারণ বহুমুখী হতে পারে, যেমন—আয়রন, ভিটামিন বি১২ বা ফলেটের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা কিংবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। তাই হিমোগ্লোবিন কম থাকলে কেবল শিং মাছ খেয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রথমে রক্তস্বল্পতার সঠিক কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়া জরুরি।

পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণে হেল্থলাইনের তথ্যমতে, ১০০ গ্রাম তাজা ক্যাটফিশে প্রায় ১০৫ ক্যালরি, ১৮ গ্রাম প্রোটিন এবং ২ দশমিক ৯ গ্রাম ফ্যাট থাকে। এছাড়া এতে সেলেনিয়াম, ফসফরাস, থায়ামিন ও পটাশিয়াম বিদ্যমান। প্রোটিন শরীরের কোষ ও টিস্যু মেরামত ও তৈরিতে সহায়ক, যা সামগ্রিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে সাহায্য করে। পাশাপাশি স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও কোষের বিপাকীয় কাজে ভিটামিন বি১২ অপরিহার্য।

হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য শিং মাছের মতো ক্যাটফিশে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড উপকারী। তবে স্যামন, সার্ডিন বা ম্যাকেরেলের তুলনায় এতে ওমেগা-৩ এর পরিমাণ কম।

মাছের পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে রান্নার পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। হেল্থলাইনের তথ্য অনুযায়ী, "১০০ গ্রাম ক্যাটফিশ শুকনো তাপে রান্না করলে প্রায় ১০৫ ক্যালরি থাকে। তেল দিয়ে বেক বা রান্না করলে তা প্রায় ১৭৮ ক্যালরিতে উঠতে পারে। আর ব্যাটারে মুড়ে ভাজলে ক্যালরি প্রায় ২২৯ পর্যন্ত হতে পারে।" তাই কম তেলে ঝোল, ভাপা বা গ্রিল পদ্ধতিতে রান্না করা অধিক স্বাস্থ্যকর।

পরিশেষে, শিং মাছ সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে অত্যন্ত উপকারী কারণ এতে ভিটামিন বি১২ ও প্রোটিন রয়েছে। তবে এটি খেলেই সরাসরি রক্তস্বল্পতা সেরে যাবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় কেবল শিং মাছের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় খাবার বা ওষুধের ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।