পরিবারের নজর এড়িয়ে মাদক গ্রহণ করে এমন কিশোর-তরুণের সংখ্যা নেহাত কম নয়। অনেক সময় ছোটখাটো পরিবর্তনগুলো অভিভাবকের চোখ এড়িয়ে যায়। তাই কিছু বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। তবে এমনটাও যেন না মনে হয় যে আপনি নজরদারি করছেন। এ প্রসঙ্গে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী শারমিন হকের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম।
উঠতি সন্তানের আচরণে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। অভিভাবক হিসেবে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে হরমোনজনিত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটছে তার। আবেগের দিক থেকে সে ভীষণ টালমাটাল একটা সময় পার করছে। তার যেকোনো বিষয়ে আপনি অধৈর্য হলে তার জীবনের বড় ক্ষতির ঝুঁকি আছে।
দু–একটি পরিবর্তন বা অস্বাভাবিকতা দেখেই তাকে সন্দেহ করা যাবে না। যদি বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং এসব বেশ লম্বা সময় ধরে থেকে যায়, তাহলে বুঝতে হবে তার কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। কেবল মাদক গ্রহণের কারণে নয়, একাডেমিক বা পারিপার্শ্বিক চাপ কিংবা মানসিক পীড়ার মতো কিছু কারণেও এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
আপনার আদরের সন্তান হুট করে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে। পরিবারের সঙ্গে তার যে স্বাভাবিক আন্তরিকতা ছিল, তা নষ্ট করে ফেলতে পারে। অতিরিক্ত বিরক্তি, জেদ বা রাগ দেখা দিতে পারে তার মধ্যে। বড়দের সঙ্গে বেয়াদবিও করে ফেলতে পারে। সে বদমেজাজি হয়ে উঠতে পারে এমনকি মারমুখীও হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে যাওয়ার জন্য কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বন্ধুর কাছে যাওয়ার জন্য প্রায়ই বা রোজ ভীষণ অস্থির হয়ে পড়তে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং পোশাকের পারিপাট্য নিয়ে স্বাভাবিক সচেতনতা হারিয়ে ফেলতে পারে। পড়ালেখা এবং দৈনন্দিন কাজে অনীহা বা অমনোযোগী হয়ে পড়তে পারে। কেউ তাকে সন্দেহ করছে কি না, এ নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতাও প্রকাশ পেতে পারে তার আচরণে।
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অতিরিক্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পারে। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরতে পারে—এ ধরনের প্রশ্নে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তার ঘরে ঢুকলে রাগ হতে পারে, এমনকি ঢোকার আগে দরজায় নক করলেও।
মাদক গ্রহণের ফলে নানান ধরনের শারীরিক সমস্যা হয়। একেক মাদকের একেক ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে শরীরে। তবে অনেক ধরনের মাদকের ক্ষেত্রেই কিছু সাধারণ পরিবর্তন হতে পারে। উল্লেখযোগ্য শারীরিক সমস্যা ছাড়াও যেসব পরিবর্তন হতে পারে—
• ঘুমের স্বাভাবিকতা নষ্ট হওয়া
• অতিরিক্ত ক্লান্তি
• চোখ লালচে হয়ে যাওয়া
• ক্ষুধামান্দ্য
• ওজনের পরিবর্তন
• আর্থিক অসামঞ্জস্য: স্বাভাবিক হাতখরচের চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করতে পারে সে। বাড়তি আর্থিক চাহিদা পূরণ করা না হলে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াও দেখাতে পারে। অভিভাবকের গচ্ছিত অর্থ প্রায়ই খোয়া যেতে পারে।
• বাড়ির নানান জিনিস প্রায়ই হারিয়ে যেতে পারে।
• সন্তানের ঘরে অস্বাভাবিক ঘ্রাণ কিংবা মাদক বা মাদক গ্রহণের অনুষঙ্গ পেতে পারেন আপনি।
• সন্দেহজনক এলাকায় তার উপস্থিতি চোখে পড়তে পারে।
• মাদকাসক্ত ব্যক্তির সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেলামেশা শুরু করতে পারে সে।
সন্তান মাদক নিচ্ছে বলে সন্দেহ হলে তার প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। প্রমাণ পেলেও ধমক, অপমান কিংবা মারধর করে তাকে শোধরানোর চেষ্টা করা যাবে না। ঘরবন্দী করে ফেলা যাবে না। এই অবস্থায় কড়া শাসন করতে গেলে তার আসক্তি বাড়তে পারে কিংবা সে নিজেকে আঘাত করতে পারে, এমনকি বেছে নিতে পারে আত্মহত্যার পথও।
আন্তরিক থাকুন। তার জীবনে কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা জানতে চান। বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। সে কাদের সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব খেয়াল রাখুন। তার কাছেও জানতে চান এসব বিষয়ে। তবে জেরা করবেন না। বরং এমনভাবে প্রশ্ন করুন, যেন সে বুঝতে পারে, তার নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগের কারণেই এসব জানতে চাইছেন।
সরাসরি মাদক বিষয়ে কথা বললে সে অস্বীকার করতে পারে। তাই শারীরিক পরীক্ষার কথা বলে তাকে একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। চিকিৎসকের সঙ্গেও আগে থেকেই নিজের সন্দেহের ব্যাপারে কথা বলে রাখা ভালো, যাতে তিনিও কৌশলী আচরণ করেন। চিকিৎসক পরীক্ষা করাতে দিলে রক্তের নমুনা সংগ্রহের সময় সন্তানের সঙ্গে থাকুন। প্রস্রাবের নমুনাও সঠিকভাবে দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হোন। কারণ, মাদকাসক্ত হয়ে থাকলে নমুনায় গোলমাল করার নানান বুদ্ধি বের করতে পারে সে। আসক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। আসক্তি থেকে মুক্ত হতে মনোবিদের সহায়তাও প্রয়োজন হয়।