দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ দূর করতে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এই জেলার মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। তবে বৈরী আবহাওয়া ও ঘন কুয়াশায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়লে জরুরি রোগী পরিবহন, পণ্য আনা-নেওয়া এবং রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় বাসিন্দাদের। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর ভোলাকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনার এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ২২ আগস্ট রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানিয়েছে, উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভোলার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম বলেন, "রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে নতুন করে প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। কনসালট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। এই সড়ক নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে ভোলার যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।"

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সড়ক যোগাযোগ চালু হলে ইলিশ, তরমুজ ও ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো যাবে। এতে গ্যাসভিত্তিক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। ভোলা পৌরসভার আবহাওয়া অফিস রোড এলাকার বাসিন্দা বাদল বলেন, "দ্বীপ জেলা হওয়ায় জরুরি রোগীকে ঢাকা বা বরিশালে নিতে হলে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে এবং বৈরী আবহাওয়ায় ঝুঁকিও বাড়ে। অনেক সময় পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।" তিনি আরও বলেন, "এত দিন ভোলার মানুষ একধরনের ‘ভৌগোলিক কারাগারে’ বন্দি ছিলেন। নতুন সড়কটি হলে সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।"

ট্রাকচালক মিলন জানান, ফেরির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শীতকালে কুয়াশায় অনেক সময় দুই-তিন দিন ঘাটে আটকে থাকতে হয়, যা পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনের মতে, সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে কৃষক ও খামারিরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পাবেন।

তবে মহাসড়ক নির্মাণের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো করেছেন স্থানীয়রা। ‘আমরা ভোলাবাসী’র সদস্যসচিব মীর মোশারেফ অমি বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। সড়ক যোগাযোগের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানালেও এর সঙ্গে সেতু নির্মাণের দাবিও বাস্তবায়ন করতে হবে।" তিনি সতর্ক করে বলেন, "সড়ক নির্মাণের আড়ালে যেন ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবি চাপা না পড়ে।"

ভোলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল হক অনু বলেন, "আধুনিক যুগেও দেশের একমাত্র বিচ্ছিন্ন জেলা হিসেবে ভোলার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা দুর্ভোগে রয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগে তারা খুশি। তবে ভোলার মানুষের মূল দাবি ভোলা-বরিশাল সেতু। লাহারহাট-বরিশাল হয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হবে না।"

ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে ভোলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর ফলে শুধু ভোলা নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভোলা থেকে লাহারহাট হয়ে বরিশালের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে প্রস্তাবিত রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা মহাসড়কের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। সম্ভাব্যতা যাচাইসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। প্রায় ৩ হাজার ৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় সাতটি উপজেলা ও প্রায় ২২ লাখ মানুষের বসবাস।