গাজীপুরের কোনাবাড়ীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালিকা) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসা কিশোরীদের জীবন থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে এসব কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত। তবে এই কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, হুমকি, অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় একে কেবল কর্মকর্তা ও কিশোরীদের মধ্যকার ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা সম্ভব নয়। ছয়জন নিবাসী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে নিজেদের ও অন্যদের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির বিবরণ দিয়েছেন। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কিশোরীদের একা কক্ষে ডেকে নেওয়া, অশোভন আচরণ, হুমকি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। অভিযোগের লিখিত আবেদন দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায় হয়ে সদর দপ্তরে পৌঁছালেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হওয়ার বিষয়টি তদন্তযোগ্য।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক তত্ত্বাবধায়ককে দ্রুত বদলি এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। তদন্তে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা পরিপন্থী অসদাচরণ ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ এনে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী বিভাগীয় শুনানিতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি—এই যুক্তিতে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। শুনানিতে একজন কিশোরী একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ অস্বীকার করলেও, একটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া মানেই অন্য সব অভিযোগ মিথ্যা হয়ে যাওয়া নয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণের পদ্ধতি, তাদের ওপর কোনো চাপ বা ভয়ভীতি ছিল কি না এবং তদন্ত কতটা স্বাধীন ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের নতুন পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) অধিকতর তদন্তের কথা জানিয়েছেন। এই তদন্ত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। প্রয়োজনে আগের তদন্তের নথি, অভিযোগকারী কিশোরীদের বক্তব্য, কর্মীদের সাক্ষ্য এবং বিভাগীয় শুনানির প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ওই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া উচিত হবে না।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কোনো সাধারণ সরকারি কার্যালয় নয়; এখানে রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সরাসরি দায়িত্ব। নিরাপদ আশ্রয়েই যদি যৌন হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তবে দায় নির্ধারণ ও শাস্তি—উভয়টিই হতে হবে দৃশ্যমান ও কঠোর।