২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক দাস-বাণিজ্য বিলোপ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে ঔপনিবেশিক আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন পাভেল পার্থ
.হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের আহমেদাবাদ ইউনিয়নের ত্রিপুরা সীমান্ত লাগোয়া ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন আমু চা-বাগান। প্রাচীন শালবন, কৃষিজমি, মণিপুরি-ত্রিপুরা-সাঁওতাল-মুন্ডা বসতি উধাও করে ১৮৭০ সালে বাগানটি গড়ে তোলা হয়। ব্রিটিশ শাসকেরা ময়ূরভঞ্জ থেকে নীলগিরি, রাঁচি থেকে বিহার–জোরজুলুম করে আদিবাসীদের বাগানে ধরে আনে। গিরমিট বা আজীবন দাসত্ব চুক্তির ছলে পরিবারের একজনকে বাগানে কাজ দেয়।
আমু চা-বাগানের মাটান বুঢ়হা তাঁদের একজন। ৬০ বছরে অবসরে গেলে মাটানের কাজটি পান বড় ছেলে লড়গো খাড়িয়া। লড়গো থেকে কাজটি পান তাঁর ছেলে বনদুলের স্ত্রী বুধনী খাড়িয়া। বুধনীর কাজটি পান তাঁর ছেলে মনবধুয়া। মনবধুয়ার ছেলে স্বপন বাবার কাজটি নিয়ে এখন আমু বাগানের একজন স্থায়ী শ্রমিক। এভাবেই বংশ থেকে বংশে পরিবার-পরিজনের একজনের কাছে চা-বাগানের স্থায়ী শ্রমিকের কাজ স্থানান্তরিত হয়। স্বপন ও রূপা খাড়িয়ার দুই সন্তান তন্ময় ও অঙ্কিত স্কুলে পড়ে। সন্তানেরা চা-শ্রমিক হোক, এটা তারা চায় না। স্বপনের বাবার দৈনিক মজুরি ছিল আট আনা। আর স্বপনের বর্তমান মজুরি ১৮৭ টাকা। দুর্মূল্যের বাজারে এই টাকায় কীভাবে সংসার চলে, তা এক জাতীয় জিজ্ঞাসা।
.শুরু থেকেই চা-বাগান ছিল দাসত্বের এক বন্দী কারাগার। তামার তৈরি ‘টি-টোকেন’ মুদ্রা দিয়ে শ্রমিক কেনাবেচা হতো তখন। পয়সায় বাগানের নাম থাকত। এক বাগানের পয়সা আরেক বাগানে চলত না। বাগানের ম্যানেজার বাবুদের জুতা পরিয়ে দিতে হতো। কাজের সময় পানি খেতে শ্রমিকদের কোনো গ্লাস দেওয়া হতো না। কর্মকর্তাদের বাংলোয় ঢুকতে হতো পেছনের দরজা দিয়ে। দিনে ২৪ কেজি চা-পাতা তোলার মাপটি হলো ‘নিরিখ’। এক নিরিখ পূর্ণ না হলে পুরো মজুরি মিলত না। মালিকেরা নিরিখ ফাঁকি দিতেন। মজুরি বকেয়া রাখতেন। শ্রমিকের সন্তানদের পড়তে দেওয়া হতো না, তারা যাতে উচ্চশিক্ষা না পায়, কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে তৎপর থাকত। বাগান প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পর আমুতে ১৮৮৮ সালে তৈরি হয় ঘনশ্যামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। বছর বছর অনাহার আর অসুখে মারা যেত মানুষ।
চা-বাগানের এই নির্দয় দুঃশাসনের বহু বদল ঘটেছে। কিন্তু চা-শ্রমিকদের এখনো ‘দাস’ হিসেবেই দেখা হয়। একটুকরো বসতভিটা ও চাষের জন্য ‘ক্ষেতল্যান্ড’ জমি দেওয়া হলেও এসবের স্থায়ী বন্দোবস্ত নেই। প্রায় ২০০ বছর ধরে রক্ত-লিকারে দেশকে চাঙা রাখলেও চা-বাগানের শ্রমিকেরা কার্যত ভূমিহীন।
.‘মুল্লুকে চলো’, হাতবন্ধ থেকে মজুরি—লাগাতার আন্দোলন হয়েছে চা-বাগানে, কিন্তু মুক্তি মেলেনি। ১৭৯১ সালে সংগঠিত আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ট্রান্স-আটলান্টিক দাস-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন সেন্ট-ডোমিঙ্গে (বর্তমান হাইতি) গড়ে ওঠা বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে হাইতি স্বাধীন হয়। ঐতিহাসিক হাইতি দাস বিদ্রোহের স্মরণে ২৩ আগস্টকে ইউনেসকো ‘আন্তর্জাতিক দাস-বাণিজ্য বিলোপ দিবস’ ঘোষণা করে। ১৯৯৮ সালের ২৯ জুলাই ইউনেসকোর ২৯তম সাধারণ সভায় দিবসটির সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৮ সালে হাইতিতে এবং ১৯৯৯ সালে সেনেগালে দিবসটি প্রথম পালিত হয়।
রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের মাধ্যমে ‘দাস-বাণিজ্য বিলোপ’ বা ‘চা-শ্রমিক গণহত্যা’ দিবস—কোনোটিই পালিত হয় না চা-বাগানে। জুলুম ও জবরদস্তি আড়াল করার যে কলোনিয়াল লিগ্যাসি টেনে চলেছে চা-বাগান, তার আমূল সংস্কার দরকার। দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড প্রণীত ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বি-৭৭) নির্বাচন এবং চা-বাগানিদের ভূমির বন্দোবস্ত—এই চার দফা দাবিতে আবারও সোচ্চার চা-বাগান।
.২০১১ সালে সেনেগাল গিয়েছিলাম, বিশ্ব সামাজিক ফোরামে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিন এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সামাজিক লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে অন্য রকম পৃথিবীও সম্ভব। রাজধানী ডাকার থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে গিয়েছিলাম আফ্রিকা উপকূলের সর্ববৃহৎ দাস-বাণিজ্য কেন্দ্র ‘গোরে দ্বীপে’। পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসিরা এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। খোপের মতো গরাদ-ঘর কিংবা দাস-নিলামের নির্দয় মঞ্চ দেখে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়েছিল।
ফেরার সময় আটলান্টিকের ঢেউয়ে দূরে সরতে থাকা গোরেকে আর অচেনা মনে হয় না। এটা তো বাংলাদেশের চা-বাগানের ‘লেবার লাইন’ বা শ্রমিক বস্তি! ইউনেসকো গোরেকে হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। ঔপনিবেশিক দাসত্বের বহমান স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চা-বাগানগুলো কি কখনো হেরিটেজ ঘোষিত হবে?
একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চলছে, আরেক দিকে চা-বাগানের দাসত্ব ও নিপীড়নকে চুরমার করে শ্রমিকেরা ‘মুল্লুকে চলো আন্দোলন’ করছে। চা-বাগানের বহু প্রবীণজনের সঙ্গে আলাপে জানতে পারি, ইংরেজ ম্যানেজারবাবুরা খুব অত্যাচার করত। ১৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করাত। শরীর আর মানাতে না পেরে মালগাড়িতে কেউবা হেঁটেই রওনা দিয়েছিল। ১৯২১ সালের ২০ মে গুলি করে হত্যা করা হয় শ্রমিকদের। রাষ্ট্র ও রেজিম চা-শ্রমিক গণহত্যার ইতিহাস গোপন করে রেখেছে। কেবল চা-বাগান নয়; অন্যায় দাসপ্রথা আর শ্রমশোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত নিম্নবর্গের সব আখ্যানই ইতিহাসের প্রবল কাঠামোতে অনুপস্থিত।
.দাস-বাণিজ্যের নিষ্ঠুরতা আলেক্স হ্যালির রুটস উপন্যাসের কুন্টাকিন্টের স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়ে হাজির হয় কখনো। গাম্বিয়ার মানডিনকা আদিবাসী গ্রাম থেকে জাল দিয়ে ধরে এনে যাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল। হেরিয়ট বিচের স্টোরের আঙ্কল টম’স কেবিন (১৮৫২), উইলিয়াম ওয়েলস ব্রাউনের ক্লোটেল (১৮৫৩), হারম্যান মেরভিলের বেনিটো সেরেনো (১৮৫৫), টনি মরিসনের বেলাভেড (১৯৮৭), আন্দ্রেয়া লেভির দ্য লং সং (২০১০) কিংবা ইয়া জিয়াসির ‘হোমগোয়িং (২০১৬)’ আখ্যানগুলোও দাস-বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক জুলুম, দাসপ্রথা ও দাস বিদ্রোহের স্মৃতিকে সামনে আনে।
দাস-বাণিজ্য ও দাসত্বের রূপ, রূপান্তর কিংবা সীমানা ভূগোল, সময় ও ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে বদলায়। চা-বাগানের বাইরেও বাংলাদেশে মানুষ বেচাকেনার বেশ কিছু প্রাচীন নথির সন্ধান পাওয়া যায়। এমন কিছু দলিল আছে সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মহাফেজখানায়। ১৮০১, ১৮০৬, ১৮০৭ সালের দাস-বিক্রির সেসব দলিলে দেখা গেছে, গনাই ভান্ডারি বিক্রি হন ২৫ টাকায়, শেখ বিআনিয়া ১০ রুপিতে এবং নব দাসী ও তাঁর মেয়ে অমরা দাসী বিক্রি হয়েছিলেন একসঙ্গে।
.একটা সময় জমিমালিক ও প্রভাবশালী পরিবারগুলো গরিব ও ঋণগ্রস্ত মানুষকে শ্রমের বিনিময়ে নির্দয়ভাবে নিজেদের দাস বানাত। গৃহশ্রম ও কৃষি উৎপাদন ঘিরেই গড়ে তোলা হয় দাসত্বের বন্দিজীবন। মহামারি, দুর্যোগ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, ঋণ ও সামাজিক প্রান্তিকতার বিপদকে ব্যবহার করে অধিপতি সমাজ দাসপ্রথাকে অন্যায়ভাবে জারি রাখে। সুলতানি আমলে বাংলার সুলতানরা দাস আমদানি করতেন, বিশেষত আফ্রিকার ‘হাবশি’ দাসদের কথা জানা যায়। বাংলার দাসপ্রথাকে বৈশ্বিক দাস-বাণিজ্যের ময়দানে যুক্ত করে ইউরোপীয় উপনিবেশ।
গবেষক রিলা মুখার্জী (২০০৯) দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের উপকূলকে সপ্তদশ শতকের এক গুরুত্বপূর্ণ ‘দাস-সংগ্রহ’ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেন। মোগলদের সঙ্গে পর্তুগিজ-আরাকানিজ দস্যুদের সংঘাতের একটা কারণ ছিল দাস-বাণিজ্য রোধ। অমল কুমার চট্টোপাধ্যায়ের (১৯৭৭) ‘স্লেভারি ইন দ্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি আন্ডার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রুল ১৭৭২-১৮৪৩’ উপনিবেশ আমলে বাংলার দাসপ্রথার এক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যায়তনিক দলিল। ১৮৪৩ সালের ‘ইন্ডিয়ান স্লেভারি অ্যাক্টের’ মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক দাস-বাণিজ্যকে বাতিল করা হলেও সামাজিকভাবে দাসপ্রথার নানারূপ টিকে থাকে বৈষম্যমূলক শাসন এবং ক্ষমতার কর্তৃত্বে।
.চা-বাগানের দাস-বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক বাহাদুরি ও চা-শ্রমিকদের সংগ্রাম নিয়ে জনপরিসরে আলাপচারিতা কম। অধিপতি ব্যবস্থা চাবাগানকে ‘নিসর্গ প্রকৃতির’ এক স্টেরিওটাইপ নান্দনিকতা হিসেবে উপস্থাপন করে। রিজিয়া রহমানের সূর্য সবুজ রক্ত (১৯৮১), সমরেশ মজুমদারের বুকের ঘরে বন্দি আগুন (২০১৯), বদরুন নাহারের মুল্লুক যাত্রা (২০২৪) কিংবা বাংলা ভাষায় লেখা না হলেও মুলকরাজ আনন্দের টু লিভস অ্যান্ড আ বাড (১৯৩৭) এসব সাহিত্যকর্ম চা-বাগানে জারি থাকা বন্দিত্ব, বলপ্রয়োগ ও বেদনার অভিজ্ঞতা পাঠ করতে চেয়েছে। চা-বাগানের কারাম, সহরাই, বাহা, ফাগুয়া, দণ্ড পরবে এখনো দাসত্ব ও জুলুমের স্মৃতি নিয়ে বহু গান ও বয়ানের পরিবেশনা টিকে আছে। এগুলো কেবল কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দলিল নয়; বরং ঔপনিবেশিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায্যতার খতিয়ান। রাষ্ট্রীয়ভাবে চা-বাগানের এসব জন-খতিয়ান সংরক্ষণ করা জরুরি।
.হার্বিসসাইডকে বাগানের মানুষ বলে ‘দাওয়াইমারা’ বিষ। নিরাপত্তা প্রস্তুতি ছাড়াই স্প্রে করতে হয় বাগানে। এ কারণে বহু মানুষ তাঁদের অঙ্গ হারিয়েছেন কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ও অসুস্থ অনেকে। বারবার বাগান বন্ধ করে দেওয়ার কারণে মৌলভীবাজারের এক চা-বাগানের অনেক শ্রমিক অনাহার ও অসুস্থতায় ভুগেছেন।
২০০ বছর ধরে সবাইকে কাজ দিতে পারেনি চা-বাগান। এক লাখের বেশি স্থায়ী ও প্রায় ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিকের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৫ লাখ মানুষ। বৈশাখ থেকে আশ্বিন ছয় মাস বাগানে কিছু দিনমজুরির কাজ পাওয়া যায়। কার্তিক থেকে চৈত্র খুব অভাব থাকে। বাগানের বাইরে গ্রামেও তখন কাজের অভাব। বাগানের বাইরের মানুষেরা চা-বাগানের মানুষদের সামাজিকভাবে ‘অস্পৃশ্য’ ও প্রান্তিক করে রাখে। পুরোনো ব্যবহৃত কাপড় গায়ে দিয়েই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পাড়ি দিয়েছেন চা-বাগানের শ্রমিকেরা।
মৌলভীবাজার বড়লেখার এক চা-বাগানের তরুণ স্থায়ী শ্রমিক শিবনাথ মুন্ডা। মা মোহিনী মুন্ডা মারা যাওয়ার পর আর্থিক সংকটের সাফাই দিয়ে বাগান কর্তৃপক্ষ মায়ের কাজটি আর দেয়নি। অভাব আর বাগানের বর্ণবাদী পরিবেশে নবম শ্রেণির পর আর পড়তে পারেনি শিবনাথ। শিবনাথকে প্রশ্ন করেছিলাম, তোমার সন্তানদের কি বাগানে কাজ করাবে? এক জোয়ারভাঙা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাগানের যে অবস্থা, বাগানে কাজ করাব না।’
ঔপনিবেশিকতার নিদারুণ দাগের ভেতরই চা-বাগানের ছেলেমেয়েরা আজ লেখাপড়া ও বাগানের বাইরে নানা কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে। আমু বাগানের দুল্লি মুন্ডা (৭৭) জানান, লাকড়ি বেচিয়া ছেলে পড়াইছি, ছেলে এখন ১৩ হাজার কামাই করে। কিন্তু আমরা এখনো বাসি ভাত খাই (আলে নাআও বাসি মান্ডি জজমালে)।
.দাস-বাণিজ্য আর ঔপনিবেশিক জুলুমের কারণে অভিবাসিত ও নিপীড়িত মানুষেরা আজ বিশ্বময় জাগরণের নয়া আওয়াজ তুলছেন। আফ্রিকার দাস ও ইউরোপীয় অভিবাসীদের বংশধর এবং স্থানীয় ক্রিল্লোসদের ভেতর ‘ট্যাংগো’ নামের এক নয়া সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে আর্জেন্টিনার নগর দরিদ্র অঞ্চলে। হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া বা বেলিজের ‘গারিফুনা’ ভাষা ও সংস্কৃতি কিংবা পর্তুগিজ ও আফ্রিকার সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা ব্রাজিলের ‘সাম্বা ডি রোডা’ গান ও কবিতায় দাস-বাণিজ্য এবং উপনিবেশের নির্মম স্মৃতি ও প্রতিবাদ দেখা যায়। কলম্বিয়ার মারিম্বা গান, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের কোকোলো নাট্যগীতি, কলম্বিয়ার কুইবদোর সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসি উৎসব, কিউবার টুম্বা ড্রাম এবং মালাগাছি দাসদের মালোয়া গানে দাসজীবনের দাহ ও দ্রোহের বিবরণ আজও বহমান।
বাংলাদেশের চা-বাগানে ৮৫ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। যদিও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের’ তফসিলভুক্ত মাত্র ১৮ জাতিসত্তা। প্রতিটি জাতির নিজস্ব ভাষা, খাদ্যরীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও একই নির্দিষ্ট বলয়ে বহু জাতির সংমিশ্রণে চা-বাগানেও গড়ে উঠেছে যোগাযোগের এক নতুন ভাষা। কিছু পরব, নৃত্যশৈলী এবং গান সমন্বিতভাবে ‘চা-বাগানের’ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরছে। কাঠামোগত অনাহারকে প্রশ্ন করে বাগানিয়া মানুষেরাই কচি চা-পাতা দিয়ে উদ্ভাবন করেছেন ‘পাত্তিচখা/পাত্তিডলার’ মতো খাবার। চা-বাগানের বন্দী ক্ষতে জাগরণের মুক্তি-মাদল বাজছে। কোম্পানি, মালিক ও রাষ্ট্র কি তা শুনতে পায়?
পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব