আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে পেট্রোলিয়াম জিওফিজিক্সে পিএইচডি করেছেন। বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকটের কারণ, সংকট থেকে উত্তরণের উপায়, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনোজ দে
.গ্যাস না থাকায় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। গোটা অর্থনীতি ও জনজীবনে জ্বালানিসংকটের ধাক্কা এসে লেগেছে। এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: বর্তমান জ্বালানিসংকটের প্রধান কারণ হলো, আমাদের গ্যাসের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানির ক্ষেত্রেও কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ২টি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি সমস্যা দেখা গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা, সেই অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের গ্যাসের উৎপাদন কেন কমে গেল? এখানে একটা বিষয় বলা প্রয়োজন যে, সীমিত সম্পদ ও সীমিত জনবল সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, ২০০০ সাল থেকে গ্যাস উৎপাদনের যে ধারাবাহিকতা ছিল, সেটি ধরে রাখা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও আগেই ভয়াবহ হতে পারত। তবে আমরা ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজ করতে পারিনি; অর্থাৎ দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, সে ক্ষেত্রে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
.গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের টেকসই সমাধান আছে.একটা সময় শোনা যেত, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। কেউ কেউ পাইপলাইনে করে গ্যাস রপ্তানির কথাও বলেছিলেন। অথচ বর্তমান যে জ্বালানিসংকট, তার মূলে রয়েছে গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা। এই আমদানিনির্ভরতার বিকল্প কী ছিল না?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: বিকল্প অবশ্যই ছিল। সবচেয়ে বড় বিকল্প ছিল দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান আরও বাড়ানো এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
তবে ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’—এ ধরনের মন্তব্যকে আমি বাস্তবসম্মত মনে করি না। কোনো ভূতত্ত্ববিদ তথ্য-উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বাস্তবভিত্তিক মডেলিং ছাড়া এমন মন্তব্য করবেন বলে আমার মনে হয় না। কেননা, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি অসংখ্য অনিশ্চয়তায় ভরা। এটা মোকাবিলা করেই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
বাংলাদেশে যেসব গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ফল। আমাদের দেশ আয়তনে খুব বড় নয়। তবে কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেক কাজ হয়েছে, তবে আরও অনেক কিছু করার সুযোগও আছে। এখানে চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও রয়েছে।
.আমরা দেখছি, ২০১৬-১৭ সাল থেকেই গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে। আমাদের গ্যাসের মজুত কি ফুরিয়ে আসছে?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: গ্যাসের মজুত অসীম নয় এবং এটি নবায়নযোগ্যও নয়। ফলে একসময় এটি ফুরিয়ে যাবে—এটাই চিরন্তন সত্য।
আমরা এখন পর্যন্ত যতটুকু গ্যাস আবিষ্কার করেছি, সব মিলিয়ে তা প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি এবং আরও বিভিন্ন খাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে গ্যাসের চাহিদাও ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। এ কারণেই একটা নির্দিষ্ট সময় পর গ্যাসের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
তবে আমাদের আরও বেশি গ্যাস অনুসন্ধান করা দরকার ছিল। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান দেখলে, এখন প্রতি ৮ থেকে ১০টি কূপ খনন করে একটি কূপে সফলতা পাওয়ার হারকে মোটামুটি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। বাংলাদেশে এই সফলতার হার প্রায় ৩:১। তাই ব্যর্থতার আশঙ্কায় গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
আমাদের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র ও এর আশপাশের এলাকা এবং সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোতে যত সিসমিক ডেটা, অন্যান্য ভূ-ভৌত তথ্য-উপাত্ত এবং আগে খনন করা কূপগুলোর তথ্য রয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করা হয়েছে। এই কাজের সঙ্গে বাপেক্স, পেট্রোবাংলার আওতাধীন প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে কয়েক ধাপে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও এসে এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে। এর ভিত্তিতে নানা সময়ে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর র্যাঙ্কিং তৈরি করা হয়েছে।
.এ সব সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত থাকতে পারে এবং তা দিয়ে বাংলাদেশ কতদিন চলতে পারবে?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: আমি বাপেক্স, পেট্রোবাংলা ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁদের সহযোগিতায় একটি হিসাব করে দেখিয়েছিলাম, যেসব এলাকায় ইতিমধ্যে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, সেসব গ্যাসক্ষেত্রের আশপাশের সম্ভাবনাময় জায়গায় প্রায় ১৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ধরুন, প্রথম পাঁচ থেকে সাত বছরে আমরা ৩০টি কূপ খনন করলাম। সেখান থেকে যদি অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সফল হয়, তাহলে প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। এরপর আরও ৩০টি কূপ যদি পরবর্তী পাঁচ বছরে খনন করা যায়, তাহলে সেখান থেকেও প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ প্রথম পর্যায়ে ৫ টিসিএফ এবং পরবর্তী পর্যায়ে আরও ৫ টিসিএফ—মোট ১০ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে, বর্তমানে আমাদের হাতে থাকা প্রায় ৮ টিসিএফের সঙ্গে মিলিয়ে প্রায় ১৮ টিসিএফ গ্যাসের মজুত দাঁড়াতে পারে। আমরা যদি বছরে গড়ে ১ টিসিএফ গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারি এবং বাকি ঘাটতি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করি, তাহলে এই মজুত দিয়ে ২০৪৩ সাল পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।
এখন ৩০টি কূপ খনন করে কমপক্ষে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলেও, তার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ৩০টি কূপ খননে মোট খরচ হবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সেটি ১০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে। অর্থাৎ, একদিকে বিনিয়োগ ১০ হাজার কোটি টাকা, অন্যদিকে সম্ভাব্য গ্যাসের মূল্য প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা।
এটা কখনোই স্মার্ট ব্যবস্থাপনা হতে পারে না যে দেশের সব গ্যাস আমরা ব্যবহার করব, এক কণা গ্যাসও আমদানি করব না। আবার দেশের গ্যাস মাটির নিচে রেখে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে থাকব—এটাও কোনো স্মার্ট ব্যবস্থাপনা নয়। আমাদের এমনভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে দেশীয় গ্যাসের মজুত দীর্ঘ সময় ধরে নিশ্চিত থাকে। কারণ, আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বা বার্গেনিং পয়েন্ট সেখানেই। শূন্য হাতে কারও সঙ্গে দর-কষাকষি করা যায় না। দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা গ্যাসের মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য তৈরি করেই জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আমাদের গ্যাসের মজুত দিয়ে যদি ২০৪৩ সাল পর্যন্ত চলতে পারি তাহলে এর মধ্যে অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির উৎসও আরও বিকশিত হবে। সারা বিশ্বেই হাইড্রোকার্বনের মজুত ধীরে ধীরে কমছে। তাই সবাই বিকল্প জ্বালানি নিয়ে কাজ করছে। হাইড্রোজেন এনার্জি, গ্রিন এনার্জি, ব্লু এনার্জি—এসব নিয়েও গবেষণা ও উন্নয়ন চলছে।
.বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট থেকে বের হওয়ার পথ কী.এই মুহূর্তে জ্বালানির যে সংকট, তাতে খুব তাড়াতাড়ি কোনো সমাধান কি সম্ভব?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: আমি বলব, প্রথমেই বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। দেশে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আছে। এর মধ্যে যদি ২০টিকে কার্যকর ধরি, তাহলে এসব গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যেই আরও কিছু সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই একটি গ্যাসক্ষেত্রের সব গ্যাস একটি বা কয়েকটি কূপ খনন করে উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। ফলে যে অংশ থেকে আমরা গ্যাস উত্তোলন করেছি, তার বাইরেও কিছু অংশ থেকে যেতে পারে, যেখানকার গ্যাস এখনো উত্তোলন করা হয়নি। এগুলোকে বলা হয় আনড্রেইন্ড কম্পার্টমেন্ট।
বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর তথ্য-উপাত্ত পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ (রিপ্রসেসিং), পুনর্ব্যাখ্যা (রি–ইন্টারপ্রিটেশন) ও পুনর্মূল্যায়নের (রি–ইভাল্যুশন) মাধ্যমে এসব আনড্রেইন্ড কম্পার্টমেন্ট শনাক্ত করা সম্ভব। এরপর সেখানে দ্রুত নতুন কূপ খনন করা যেতে পারে। একই গ্যাসক্ষেত্রের অন্য একটি অংশে আমরা যেহেতু গ্যাস পেয়েছি, তাই এসব জায়গাতেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর আরেকটি বড় সুবিধা হলো, নতুন করে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে না। বিদ্যমান অবকাঠামোই ব্যবহার করা যাবে। সেখান থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। এটি হতে পারে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর একটি দ্রুত ও কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশে ১৯৫৫ সাল থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হয়। ১৯৬১ সালে আবিষ্কারের মাধ্যমে তা বাস্তব রূপ পায়। ফলে আমাদের অনেক কূপ বেশ পুরোনো। এসব কূপের অনেকগুলো এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে মেরামত করে আবার উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে একটা বিষয় সবার মনে রাখা দরকার যে, অনুসন্ধানের কাজে বাপেক্স হোক আর বিদেশি কোম্পানি, সবাইকেই অসংখ্য অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ এবং আমাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলোও তুলনামূলক ছোট। তাই এখানে অনুসন্ধানের ব্যর্থতাকে খুব বড় করে দেখা উচিত নয়। বরং কোনো কূপে গ্যাস না পাওয়ার অর্থ হলো, আমরা নতুন কিছু তথ্য পেলাম। এই তথ্য অত্যন্ত মূল্যবান। এসব তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতের অনুসন্ধান আরও নির্ভুল করা যায় এবং অনিশ্চয়তা কমানো যায়।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, যেসব গ্যাসক্ষেত্র বর্তমানে উৎপাদনে আছে, সেগুলোর গভীর অংশে ড্রিলিং করা। আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এত দিন আমরা নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্তই ড্রিলিং করেছি ও ওপরের কয়েকটি স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলন করছি। কিন্তু এর আরও গভীরে যে স্তরগুলো রয়েছে, সেখানে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রে ডিপ ড্রিলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে বড় ধরনের আশার খবর আসতে পারে বলে আমি মনে করি।
মোদ্দাকথা, আনড্রেইন্ড কম্পার্টমেন্ট শনাক্ত করে নতুন কূপ খনন; বিদ্যমান কূপগুলো ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে মেরামত করে উৎপাদন বাড়ানো ও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের গভীর স্তরে ড্রিলিং করা—এই তিন কাজের মাধ্যমে আমরা বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই উৎপাদন বাড়াতে পারি।
.আমাদের নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যবর্তী আন্ডার-এক্সপ্লোরড বা আন-এক্সপ্লোরড এলাকাগুলোতে গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তিতাস, বাখরাবাদ বা বিবিয়ানার মতো কাঠামোর আশপাশে বিভিন্ন দিকে গ্যাসক্ষেত্র থাকায় মাঝের এলাকাগুলোতেও সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় এলাকা হলো হিঞ্জ জোন। কলকাতা-পাবনা-ময়মনসিংহ হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত এই ট্রানজিশনাল জোনে অনুসন্ধান তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। সম্প্রতি জামালপুরে গ্যাস পাওয়ার ঘটনাটি এ অঞ্চলের সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে। জামালপুরের গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না, তা আরও অনুসন্ধানের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এরপর রয়েছে সিলেট ট্রাফ বা সুরমা বেসিনের বিস্তৃত এলাকা এবং হাতিয়া ট্রাফ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেট দেশের প্রধান হাইড্রোকার্বন হাব। অন্যদিকে শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ, সুন্দরপুর, ফেনী এবং সাগরে সাঙ্গু ও কুতুবদিয়ায় গ্যাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে হাতিয়া ট্রাফ অঞ্চলেও হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এসব এলাকায় পর্যাপ্ত তথ্য ও গবেষণা হয়নি। বিস্তারিত স্টাডি ও অনুসন্ধান হলে এটি দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বন হাব হয়ে উঠতে পারে।
তবে সম্ভাবনাময় এসব এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান ও কূপ খনন করতে হবে। এর মধ্যে অনেক কূপ ড্রাই হোল হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই এটিকে লোকসান হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অনুসন্ধান চালাতে হবে।
.ভুতুড়ে বিল, লোডশেডিং, সিস্টেমে চুরি ও ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত.ভারতের ত্রিপুরাতে গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? এখানে অনুসন্ধানের চ্যালেঞ্জটা কেমন?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো অত্যন্ত জটিল। সে কারণে এই অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল। কাছাকাছি একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। ত্রিপুরার আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার, আর আমাদের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। ত্রিপুরায় প্রায় ১৪টি কাঠামো রয়েছে, আর আমাদের রয়েছে ২৮টি।
ত্রিপুরায় প্রায় ১৫০টির বেশি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ৭ টিসিএফ প্রমাণিত গ্যাস রয়েছে এবং তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ১৪ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যর্থতার পরও তারা অনুসন্ধান বন্ধ করেনি।
ত্রিপুরার সঙ্গে আমাদের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অনেক মিল রয়েছে। তারা যদি পরে অনুসন্ধান শুরু করে সফল হতে পারে, তাহলে আমাদের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলেও সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
.ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে এক যুগ আগে। আমাদের বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমায় কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে কেন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: এই চ্যালেঞ্জ আমি একটু নির্মম বাস্তবতার জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করব। ব্রাজিল, অ্যাঙ্গোলা, মেক্সিকো কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি অনুসন্ধান করে। এসব জায়গায় একটি গ্যাসক্ষেত্রেই অনেক বড় মজুত পাওয়া যায়।
যারা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রাপ্তির আশা করবে। এখন তাদের আকৃষ্ট করবেন কীভাবে? অবশ্যই সাফল্য দেখিয়ে। এখানেই একটা ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। আমরা কি আগে অনুসন্ধান করে সাফল্য দেখাব, তারপর বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করব? নাকি তারা আগে আসবে, তারপর আমরা অনুসন্ধান করব?
আমরা সাফল্য দেখাতে পারলে তারা আসবে। আবার তারা না এলে বড় পরিসরে অনুসন্ধান চালিয়ে সাফল্য দেখানোর সক্ষমতাও এই মুহূর্তে আমাদের নেই।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এখনো বড় সাফল্য না এলেও আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে গ্যাস আবিষ্কার এবং বাংলাদেশের অফশোরের সঙ্গে সেখানকার কিছু ভূতাত্ত্বিক সামঞ্জস্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। আমাদের সমুদ্রাঞ্চলের কোথাও কোথাও পাললিক শিলার গভীরতা ১৭ থেকে ১৯ কিলোমিটার পর্যন্ত। এসব গভীর স্তরে তেল-গ্যাস উৎপন্ন, সঞ্চিত ও আটকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া আরও গভীর সামুদ্রিক অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ডিপ-সি ফ্যান—বেঙ্গল ফ্যান।
তবে সাফল্য না আসা পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ থাকবেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে তুলতে এবং বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে আমাদের নিজেদের জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে হবে—বিশেষ করে বিদ্যমান সিসমিক ডেটা ভালোভাবে বিশ্লেষণ, সম্ভাবনাগুলো শনাক্তকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা।
.গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিন। সীমিত সম্পদ দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের সাফল্য বেশি। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় কী?
.আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: বাপেক্সের সক্ষমতা বিশ্বমানের না হওয়ার পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাপেক্সে যোগ দেওয়া মেধাবী প্রকৌশলী ও ভূতত্ত্ববিদেরা অভিজ্ঞতা অর্জন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেন। তবে তাঁরা যখন দেখেন যে একই দক্ষতার একজন বন্ধু বিদেশি কোম্পানিতে অনেক বেশি বেতন–ভাতায় কাজ করছেন, তখন তারা হতাশ হন। ফলে বেশি সুযোগ-সুবিধার আশায় অনেকেই বিদেশে চলে যান। এটি একধরনের ‘ব্রেন ড্রেন’। তাই জাতীয় পর্যায়ে বাপেক্সের দক্ষ জনবল ধরে রাখতে তাঁদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক সফটওয়্যার, রিগ ও ড্রিলিং প্রযুক্তি এবং দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সিসমিক ডেটা সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে; অর্থাৎ দক্ষ জনবল, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার—সবকিছু মিলিয়েই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা তো এসব করছি বা করার চেষ্টা করছি। তাহলে যথেষ্ট হচ্ছে না কেন? আসলে বিনিয়োগটা অপ্রতুল। জ্বালানি আমদানিতে আমাদের হাজার হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। করোনা মহামারির সময় স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার কারণে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়েছে, তার এক-দশমাংশও হয়তো গত ১০ বছরে গ্যাস অনুসন্ধান ও সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে বিনিয়োগ করা হয়নি। এত কম বিনিয়োগ দিয়ে বড় ধরনের সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব নয়।
তাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করতে হলে শুধু এই মুহূর্তে কত টাকা বিনিয়োগ করছি, সেটি বিবেচনা করলে হবে না। বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে কী হবে এবং সফল হলে কী ফল পাওয়া যেতে পারে—দুটিই বিবেচনা করতে হবে।
আর আমাদের সেই মানসিকতা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে যে একটি কূপে ড্রাই হোল হওয়া বা একটি জায়গায় অনুসন্ধান ব্যর্থ হওয়া মানেই সব শেষ। অনুসন্ধান কার্যক্রমে ব্যর্থতা থাকবেই। সেই ব্যর্থতা থেকে পাওয়া তথ্যও পরবর্তী অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। তাই একটি কূপে গ্যাস না পাওয়াকে শুধু ক্ষতি হিসেবে না দেখে, ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের জন্য নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ হিসেবেও দেখতে হবে।