নরসুন্দরের দোকানে চুল কাটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে ভালো লাগত না। সেই বিরক্তি থেকেই একদিন কাঁচি ও চিরুনি হাতে তুলে নেন। প্রথমবার ছোট ভাইয়ের চুল কাটতে গিয়ে অবশ্য তাকে কাঁদিয়ে ছাড়েন। সেই ব্যর্থতা থেকেই চুল কাটার কৌশল শেখার শুরু। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৭ বছর। এখন আয়নার সামনে, কখনো বা আয়নার দিকে না তাকিয়েই নিজের চুল নিজেই কাটেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার মুজাহিদুল ইসলাম। সম্প্রতি নিজের চুল কাটার একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মুজাহিদুলের নিজের চুল কাটার গল্পের শুরু ২০০৬ সালের দিকে। তখন তিনি হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। সাপ্তাহিক ছুটি ছিল শুধু শুক্রবার। সপ্তাহজুড়ে মাদ্রাসার নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকার পর ওই এক দিনের ছুটিতে নানা পরিকল্পনা থাকত। কিন্তু চুল কাটাতে গিয়ে ছুটির বড় একটি সময় নরসুন্দরের দোকানে অপেক্ষা করেই কেটে যেত। এক শুক্রবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চুল কাটার সুযোগ পাননি মুজাহিদুল। পরের সপ্তাহে আবার একই দোকানে যান। সেদিনও তার আগে আরও তিনজন অপেক্ষায় ছিলেন।
মুজাহিদুল বলেন, ‘ক্ষুধা লাগায় ভাবলাম, বাড়ি থেকে খেয়ে আসি। কিন্তু বাড়ি থেকে ফিরে দেখি, আমার সিরিয়াল চলে গেছে। অনেক অনুরোধ করেও সেদিন নাপিতকে রাজি করাতে পারিনি। তখন আমার ভেতরে জেদ চেপে বসে। ভাবলাম, অন্যের কাছে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে নিজেই যদি শিখে ফেলি!’ এরপর থেকেই নরসুন্দরের চুল কাটার কৌশল খেয়াল করতে শুরু করেন তিনি। কীভাবে কাঁচি ধরেন, কীভাবে চিরুনি ব্যবহার করেন—সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। পরে বাজার থেকে কাঁচি ও চিরুনি কিনে বাড়িতে আয়নার সামনে শুরু করেন অনুশীলন।
তবে নিজের চুলে অনুশীলন করে খুব একটা সুবিধা হচ্ছিল না। প্রয়োজন হলো একজন ‘মডেল’। মাদ্রাসার এক ছোট ভাইকে বুঝিয়ে নিজের হাতে তার চুল কাটার উদ্যোগ নেন মুজাহিদুল। কিন্তু প্রথম চেষ্টার ফল ভালো হয়নি। হাসতে হাসতে সেই দিনের কথা স্মরণ করে মুজাহিদুল বলেন, ‘চুল কাটার পর ছেলেটির অবস্থা এমন হয়েছিল যে আয়নায় নিজেকে দেখে কান্না শুরু করে। তাকে সান্ত্বনা দিতে শেষ পর্যন্ত দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে দিই। এরপর একটি ব্লেড কিনে মাথা ন্যাড়া করে দিতে হয়।’
প্রথমবার ব্যর্থ হলেও থেমে যাননি মুজাহিদুল। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মাদ্রাসার সহপাঠী ও ছোটদের চুল কাটতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে কাঁচি ও চিরুনির ব্যবহার আয়ত্তে আসে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসাটি বড় ছিল। শুক্রবার অনেক ছাত্রের চুল কেটে দিতাম। এভাবে বারবার করতে করতেই চুল কাটার কৌশলটা শিখে ফেলি।’
একদিন তার চুল কাটার কাজ দেখে এক শিক্ষক প্রশংসা করেন। শিক্ষক পরামর্শ দেন, ভালোভাবে চুল কাটতে পারলে এর বিনিময়ে কিছু টাকা নেওয়া যেতে পারে। শুরু হয় নতুন অধ্যায়। প্রথমে তিন টাকা করে চুল কাটতেন মুজাহিদুল। সপ্তাহ শেষে সেই টাকা জমিয়ে বন্ধুদের নিয়ে নাশতা করতেন। পরে চাহিদা বাড়লে তিন টাকা থেকে পাঁচ, এরপর সাত টাকা করে নিতেন। একসময় তার মনে হয়, অন্যের চুল কাটতে পারলে নিজের চুলের জন্যই বা অন্যের কাছে যেতে হবে কেন? এরপর নিজের চুল নিজে কাটার অনুশীলনে আরও মনোযোগী হন তিনি। শুরুতে সব সময় ফল ভালো হতো না। তবে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি হয়। কোন অংশে কতটা চুল কাটতে হবে, কোথায় কাঁচি চালাতে হবে—এসব তিনি অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্তে আনেন।
মুজাহিদুল বলেন, ‘প্রথম দিকে আয়নার সামনে অনেক চেষ্টা করেছি। পরে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন খুব দ্রুত নিজের চুল কাটতে পারি। অনেক সময় আয়নায় খুব বেশি না দেখেও প্রায় নিখুঁতভাবে চুল কেটে ফেলতে পারি।’
গত ১৭ বছর ধরে এই অভ্যাস ধরে রেখেছেন তিনি। চুল বড় হলেই আয়না, কাঁচি ও চিরুনি নিয়ে বসে পড়েন। এতে সিরিয়ালে দাঁড়ানো, অপেক্ষা করা কিংবা সময় নষ্ট করার প্রয়োজন হয় না। মুজাহিদুলের ভাষ্য, ‘এতে সময় বাঁচে। নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না। নিজের কাজ নিজেই করি।’
তার প্রতিবেশী মানিক, রেজা, রাতুল, ফরহাদ, সোহাগ ও জয় জানান, ছুটিতে বাড়িতে এলে মুজাহিদুল তাদের সেলুনের মতো চেয়ারে বসিয়ে চুল কেটে দেন। তাদের দাবি, তিনি নরসুন্দরের মতোই সুন্দর করে চুল কাটতে পারেন।
মুজাহিদুল ইসলামের ছোট ভাই ও গণমাধ্যমকর্মী মোকাররম হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ভাই মেধাবী এবং নানা ধরনের প্রতিভার অধিকারী। ভাই যখন মাদ্রাসা থেকে ছুটিতে বাড়িতে আসতেন, তখন আমাদের চুল কেটে দিতেন। পরে একসময় দেখি, তিনি নিজের চুলও নিজেই কাটছেন। প্রথম দিকে বিষয়টি আমাদের কাছে বেশ আশ্চর্যের ছিল। এখন মনে হয়, মানুষ ইচ্ছা ও অভ্যাসের মাধ্যমে অনেক কিছুই শিখে নিতে পারে।’
মুজাহিদুল ইসলাম ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ বাসুদেবপুর (পুরাতন বন্দর) গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে পার্বতীপুর উপজেলার ভবানীপুর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায় প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এক সন্তানের জনক।