নোটিশ ছাড়া রাতের বেলা শরীয়তপুর প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি ইস্রাফিল বেপারী। বিক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও জেলা প্রশাসকের গাড়ি আটকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করেন শরীয়তপুর প্রেস ক্লাবের সদস্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা।
সীমানাপ্রাচীর ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার রাতে প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ফেসবুকে প্রতিবাদ জানান সময় টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার ও প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ইস্রাফিল বেপারী। রোববার সকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন প্রেস ক্লাবের জায়গা পরিদর্শনে গেলে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
হামলাকারীরা ইট ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আহত হন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল ২৪-এর সাংবাদিক নুরুল আমিন রবিন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি শরিফুল আলম ইমন ও সদস্য ইসহাক মাদবর। পরে আহত ইস্রাফিল ও তার সহকর্মীদের শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকরা জানান, ইস্রাফিলের ডান হাতের কব্জির কাছে ভেঙে গেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। অন্য তিন সাংবাদিক প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
ইস্রাফিল বেপারী বলেন, আমি প্রেস ক্লাবের জমি রক্ষায় সেখানে গিয়েছিলাম। পরিকল্পিতভাবে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি ইট দিয়ে আমাকে আঘাত করেছে। এতে আমার এক হাত ভেঙে গেছে। আমি হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি শরিফুল আলম ইমন বলেন, আমরা প্রেস ক্লাবের জায়গা পরিদর্শনে গেলে আট থেকে ১০ জন লোক হঠাৎ সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক ইস্রাফিল ভাইয়ের ওপর হামলা চালায়। আমরা তাকে বাঁচাতে গেলে আমরাও আহত হই। আমার হাতের একটি আঙুল ভেঙে গেছে। এ ঘটনার বিচার চাই।
১৯৯৮ সালে শরীয়তপুর পৌরসভার আমিনবাগ এলাকার তুলাসার মৌজায় প্রেস ক্লাবের জন্য ১৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুভাষ চন্দ্র রায়। জমিটি ডোবা থাকায় তৎকালীন সাংবাদিকরা নিজস্ব অর্থায়নে মাটি ভরাট করে সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেন। ২০২৩ সালে ওই জায়গায় একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে কোনো ধরনের লিখিত নোটিশ ছাড়া ক্লাবের নির্ধারিত জায়গার তিনটি সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই জায়গায় শিশু পার্ক থাকায় ক্লাবকে অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য নতুন জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। শিশুদের চলাচলের সুবিধার্থে ক্লাবের সভাপতির মৌখিক অনুমতি নিয়ে সীমানাপ্রাচীরটি অপসারণ করা হয়েছে বলে দাবি জেলা প্রশাসনের।
এ বিষয়ে প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার বলেন, আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে সমালোচনা করায় আমার ছেলে পলাশ ও তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। সাংবাদিক ইস্রাফিলের ওপর হামলা হবে, তা আমি জানতাম না। ঘটনায় আমি নিজেও বিব্রত। আমি উদ্যোগ নিয়ে এ ঘটনার জন্য আমার সন্তানকে বিচারের মুখোমুখি করব।
সীমানাপ্রাচীর ভাঙা ও সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদে রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন সাংবাদিকরা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে প্রেস ক্লাবের জমির সীমানা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার দ্রুত সমাধান এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধন শেষে সাংবাদিকরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের গাড়ির সামনে অবস্থান নেন। এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে জেলা প্রশাসকের পদত্যাগের দাবি জানান তারা।
একপর্যায়ে গাড়ি থেকে নেমে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম। তিনি বলেন, ভিপি সম্পত্তিতে স্থাপনা তৈরি করা যায় না। প্রেস ক্লাবের জায়গার বিষয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কাজের অর্ধেক শেষ হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অকৃষি জমি আমরা বন্দোবস্ত দিচ্ছি।
জেলা প্রশাসক বলেন, এটি ভুল বোঝাবুঝি। নির্বাচিত সভাপতির মৌখিক কথার ভিত্তিতে প্রাচীরটি অপসারণ করা হয়েছে। তবে ভবন অপসারণ করা হয়নি। শুধু পার্কের শিশুরা যাতে উন্মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে, সে জন্য পেছনের দেয়াল ভাঙা হয়েছে।
লিখিত নোটিশ ছাড়া এভাবে প্রাচীর ভাঙা যায় কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, মৌখিকভাবে আমি এটা করতে পারি না। আপনারা যদি সেখানে স্থাপনা তৈরি করে থাকেন, তাহলে কাগজপত্র নিয়ে আসেন। আমি দেখে প্রয়োজনে সেই স্থাপনা পুনরায় তৈরি করে দেব।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল ২৪-এর স্টাফ রিপোর্টার নুরুল আমিন রবিন বলেন, জেলা প্রশাসক আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে ফেলা দেয়াল পুনরায় ঠিক করে দেবেন। তিনি যদি তা না করেন, তাহলে প্রেসক্লাবের কার্যকরী পরিষদ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি আরও বলেন, প্রেস ক্লাবকে অবগত না করে সভাপতি কীভাবে মৌখিকভাবে সীমানাপ্রাচীর অপসারণের অনুমতি দিলেন, সে বিষয়ে তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হবে। তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে কার্যকরী পরিষদ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি সাংবাদিক ইস্রাফিল বেপারীর ওপর হামলার ঘটনায় তার পরিবার থানায় অভিযোগ করবে। আমরা এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) তানভীর হোসেন বলেন, প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভাঙার বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। তবে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়টি আমি জানি না। এ বিষয়ে এখনও কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ আইনি সহায়তা চাইলে পুলিশ পাশে থাকবে।