ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বে জাহালাতের আলোচনা অপরিহার্য। কারণ, জ্ঞান কেবল আলোর উপস্থিতি নয়; জাহালাত সেই অন্ধকার, যার মধ্যে আলো তার অর্থ খুঁজে পায়। যে দর্শন কেবল সত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, কিন্তু অসত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে না, তার জ্ঞানতত্ত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—মানুষ কেন ভুল জানে? কেন সত্য উপস্থিত থাকার পরও তা অস্বীকার করে? একই কায়েনাত, একই ফিতরাত এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও মানুষ কেন পরস্পরবিরোধী বাস্তবতা তৈরি করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে জাহালাতের দর্শনকে বুঝতে হবে।

অজ্ঞতা মানেই তথ্যের অভাব নয়। অনেক সময় মানুষ জানে না, কারণ জানার সুযোগ পায়নি; এটি জ্ঞানগত অপূর্ণতা। কিন্তু আরও গভীর একধরনের জাহালাত রয়েছে, যেখানে মানুষ জানার পরও সত্যকে বিকৃত করে। প্রথমটি সীমাবদ্ধতা; দ্বিতীয়টি বিকৃতি। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার আলোচনার মূল বিষয় হলো এই দ্বিতীয় ক্ষেত্র। কারণ, মানবসভ্যতার বড় সংকটগুলো সাধারণত জ্ঞানের বিকৃতি থেকে উদ্ভূত হয়।

ইতিহাসে বহু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অর্থনৈতিক স্বার্থে গোপন করা হয়েছে, বহু ধর্মীয় ব্যাখ্যা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য পরিবর্তিত হয়েছে, বহু ঐতিহাসিক বয়ান বিজয়ীদের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্লিখিত হয়েছে।

জাহালাতকে অস্তিত্বগত ভারসাম্যচ্যুতি হিসেবে দেখা হয়। মানুষ কেবল চিন্তার সত্তা নয়; তার সত্তায় নফস, আকল, ক্বালব, ফিতরাত এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার মিশ্রণ রয়েছে। যখন কোনো একটি স্তর অন্য স্তরকে গ্রাস করতে চায়, তখন জ্ঞানের মিজিন বিপন্ন হয়।

এ কারণে আল কোরআনের ভাষায়, জাহালাত অনেক সময় আখলাকি বিচ্যুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, সত্য জানার ক্ষমতা হারানোর আগে কিছু মানুষ সত্যকে কবুলের ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলে।

নফসের ভূমিকা মৌলিক। নফস মানুষের প্রয়োজন, প্রত্যাশা ও আত্মরক্ষার কেন্দ্র। কিন্তু যখন সে নিজের সীমা অতিক্রম করে, তখন সে হাকিকতকে নিজের ইচ্ছামতো দেখতে শুরু করে। তখন মানুষ সত্যকে অনুসরণ করে না; বরং এমন সত্য নির্বাচন করে, যা তার নফসানিয়াতকে জায়েজ করে।

জাহালাতের আরেকটি উৎস ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা। ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক নয়; জ্ঞানগত ক্ষমতাও মানুষের মধ্যে আধিপত্যের প্রবণতা তৈরি করে। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করে যে বাস্তবতার বৈধ ব্যাখ্যা একমাত্র তার হাতেই ন্যস্ত, তখন জ্ঞান ধীরে ধীরে মতাদর্শে রূপান্তরিত হয়।

মতাদর্শের প্রধান খাসলত হলো, সে প্রথমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, পরে দলিল তালাশ করে। অথচ ইলমের স্বভাব এর বিপরীত; সে প্রথমে হাকিকতকে জানে, তারপর ফয়সালায় পৌঁছায়। অতএব, জ্ঞানবিকৃতির একটি বড় কারণ হলো জ্ঞানকে ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত করা।

লোভও জাহালাতের একটি সূক্ষ্ম উৎস। সম্পদের পাশাপাশি মর্যাদা, খ্যাতি, প্রভাব ও নিরাপত্তার জন্য মানুষ বাস্তবতাকে বিকৃত করে।

ফলে জাহালাত অনেক সময় মিথ্যার উৎপাদন নয়; সত্যের নিজস্ব নির্বাচন। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা আদর্শিক পক্ষপাতকেও জ্ঞানবিকৃতির একটি শক্তিশালী কারণ হিসেবে দেখে। প্রত্যেক মানুষ একটি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও চিন্তার পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠে।

কিন্তু সেই কাঠামো যখন নিজেকে চূড়ান্ত বাস্তবতা বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন মানুষ এমন সব তথ্যও ইনকার করে, যা তার পূর্বধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জ্ঞানগত তাকাব্বুরি জাহালাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপগুলোর একটি। মানুষ যখন মনে করে যে তার হাসিল জ্ঞানই বাস্তবতার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা, তখন তার শেখার ক্ষমতা ক্ষীণ হতে থাকে।

অথচ প্রকৃত ইলমের বৈশিষ্ট্য হলো, সে নিজের অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে সচেতন থাকে। জাহালাতের খাসলত হলো, সে নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করে। প্রযুক্তি জাহালাতের একটি নতুন রূপ পয়দা করেছে। তথ্যের প্রাচুর্যকে অনেকেই জ্ঞানের সমার্থক বলে ধরে নিচ্ছে।

ফলে মানুষ ক্রমশ এমন এক জগতে বসবাস করতে থাকে, যেখানে সে কেবল নিজের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। এই প্রযুক্তিগত গুমরাহি মানুষের সামনে বাস্তবতার নির্বাচিত খণ্ডাংশ হাজির করে।

ফলে জাহালাতের প্রতিষেধক শুধু আরও বেশি তথ্য নয়; তথ্য অজ্ঞতার একটি অংশ দূর করতে পারে; কিন্তু জ্ঞানবিকৃতি দূর করার জন্য প্রয়োজন তাজকিয়াহ, নৈতিক শুদ্ধি, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, সমালোচনামূলক আত্মসমীক্ষা এবং সত্যের প্রতি আন্তরিক আনুগত্য।