ইসলামি জীবনদর্শনে পরিবার হলো পরম প্রশান্তির ঠিকানা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা দাম্পত্যের এই মূল সুর তুলে ধরে বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)

রাসুল (সা.) ছিলেন একাধারে সফল রাষ্ট্রনায়ক ও অনুপম পরিবারের অভিভাবক। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে আন্তরিক, প্রেমময় ও হাসিখুশি সময় কাটাতেন। তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনন্য উপমা।

খাদিজা (রা.): আজীবন কৃতজ্ঞতা

খাদিজা (রা.)-এর জীবদ্দশায় নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। তাঁদের ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবন ছিল মানসিক নির্ভরতার প্রতীক। প্রথম ওহির প্রচণ্ড ভীতি ও আশঙ্কার মুহূর্তে খাদিজাই নবীজিকে পরম নির্ভরতায় অভয় দিয়েছিলেন।

খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পরও রাসুল (সা.) গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করতেন। ঘরে কোনো পশু জবাই হলে তিনি খুঁজে খুঁজে খাদিজার বান্ধবীদের বাড়িতে গোশত পাঠিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮১৮)

.দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মহানবী (সা.) এর স্ত্রী.

সাফিয়া (রা.): কোমলতা ও সম্মান প্রদর্শন

এক হজের সফরে সাফিয়ার উট অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি কেঁদে ফেলেন। নবীজি (সা.) নিজ হাতে তাঁর চোখের পানি মুছে দেন এবং সান্ত্বনা দেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩৩৭)

সাফিয়া (রা.) কিছুটা খাটো হওয়ায় উটে চড়তে কষ্ট হতো। নবীজি তখন হাঁটু পেতে দিতেন, যেন তিনি তাঁর হাঁটুতে পা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে উটের পিঠে উঠতে পারেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২১১)

আয়েশা (রা.): মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া

আয়েশার সঙ্গে নবীজির সম্পর্ক ছিল নির্মল আনন্দ ও গভীর অনুভূতির। মসজিদে ইতিকাফে থাকা অবস্থায় তিনি আয়েশার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন এবং আয়েশা (রা.) তাঁর চুল আঁচড়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৮)

এমনকি আয়েশার কোলে মাথা রেখে তিনি কোরআন তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৭)

.সুখী দাম্পত্য জীবন গড়তে মহানবী (সা.)–এর শেখানো ৪ কৌশল.

ডানাওয়ালা ঘোড়ার পুতুল: তাবুক বা খায়বার যুদ্ধ থেকে ফিরে আয়েশার খেলনা পুতুলের মধ্যে ডানাওয়ালা একটি ঘোড়া দেখে নবীজি কৌতুক করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘোড়ার আবার ডানা থাকে নাকি?’ আয়েশা (রা.) চটপটে জবাবে বললেন, ‘নবী সোলাইমানের তো ডানাঅলা ঘোড়া ছিল!’ উত্তর শুনে নবীজি এমনভাবে হেসে উঠলেন যে তাঁর সামনের দাঁত দৃশ্যমান হয়েছিল। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৩২)

দৌড় প্রতিযোগিতা: এক সফরে নবীজি সঙ্গীদের এগিয়ে দিয়ে আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেন। প্রথমবার তরুণী আয়েশা (রা.) জিতে যান। কয়েক বছর পর শরীর কিছুটা ভারী হলে আরেক প্রতিযোগিতায় নবীজি জয়ী হয়ে হেসে বললেন, ‘এটি আগের দৌড়ের সমতা!’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৫৭৪৫)

অভিমান বোঝার ক্ষমতা: নবীজি বলতেন, ‘আয়েশা, তুমি কখন খুশি আর কখন অভিমান করে আছ, তা আমি বুঝতে পারি। সন্তুষ্ট থাকলে বলো, মুহাম্মদের রবের শপথ; আর অসন্তুষ্ট থাকলে বলো, ইব্রাহিমের রবের শপথ।’

আয়েশা (রা.) হেসে জবাব দিলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমি কেবল মুখে আপনার নাম উচ্চারণ থেকে বিরত থাকি, অন্তরে তো আপনার ভালোবাসাই থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৮)

দাম্পত্য কেবল দায়িত্বের শৃঙ্খল নয়, বরং তা মায়া, আন্তরিক বন্ধুত্ব ও আনন্দের মেলবন্ধন। নবীজির পারিবারিক জীবনচর্চা আধুনিক সমাজের প্রতিটি দম্পতির জন্য এক শাশ্বত ও অনুকরণীয় আদর্শ।

ইলিয়াস মশহুদ: লেখক ও

.দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হলে নবীজি (সা.) কী করতেন