অনেকে বছরের পর বছর ধরে কোরআন পড়ে যাচ্ছেন, অথচ অজান্তেই এমন কিছু উচ্চারণের ভুল করছেন, যা অর্থ বিকৃত করে দিচ্ছে। নিয়ম না জেনে বা শুদ্ধ করার সুযোগ না পেয়ে ভুল উচ্চারণে পড়া একটি বহুল পরিচিত সমস্যা।

কোরআন পাঠ মহান আল্লাহর সরাসরি বাণীর সঙ্গে বান্দার আত্মিক কথোপকথন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, “এবং কোরআন  পড়ো ধীরস্থিরভাবে ও স্পষ্ট উচ্চারণে।” (সুরা মুজ্জম্মিল, আয়াত: ৪)

প্রচলিত ৩টি ভুল ও তা সংশোধনের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. কাছাকাছি উচ্চারণের বর্ণে বিভ্রান্তি

আরবি ভাষায় বর্ণ উচ্চারণের নির্দিষ্ট উচ্চারণস্থল রয়েছে, যাকে মাখরাজ বলে। ব্যঞ্জনবর্ণের সামান্য পরিবর্তনের কারণে শব্দের অর্থ পুরো উল্টে যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, গলার গভীর থেকে ভারীভাবে উচ্চারিত ‘ক্বাফ’ (ق) দিয়ে গঠিত ‘ক্বলব’ (قلب) শব্দের অর্থ হলো ‘হৃদয়’; কিন্তু সেটিকে হালকা ‘কাফ’ (ك) দিয়ে উচ্চারণ করলে হয়ে যায় ‘কালব’ (كلب)—যার অর্থ ‘কুকুর’।

আবার গলার মধ্যভাগ চেপে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত ‘আইন’ (ع) দিয়ে গঠিত ‘আলিম’ (عَلِيم) শব্দের অর্থ হলো ‘সর্বজ্ঞানী’; কিন্তু সেটিকে কণ্ঠনালীর শুরু থেকে সাধারণ ‘হামযাহ’ (أ) দিয়ে উচ্চারণ করলে হয়ে যায় ‘আলিম’ (أَلِيم)—যার অর্থ ‘যন্ত্রণাদায়ক বা বেদনাদায়ক’।

সংশোধনের উপায়: প্রতিটি বর্ণ উচ্চারণের উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করে জোড়ায় জোড়ায় অনুশীলন করা এবং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিহ্বা ও ঠোঁটের অবস্থান খেয়াল রাখা।

.
যে ব্যক্তি দক্ষতার সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে, সে সম্মানিত ও অনুগত ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৩৭
.শিশুর কোরআন শিক্ষা শুরু করার উপযুক্ত বয়স কোনটি.

২. টানের অসমতা ও ভুল দীর্ঘায়ন

স্বরবর্ণ দীর্ঘ করার (মাদ্দ) ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাত্রা বজায় রাখা কোরআন পাঠের অন্যতম মূলনীতি। যেখানে চার মাত্রা টানার কথা, সেখানে দুই মাত্রা টানা কিংবা যেখানে কোনো টান নেই সেখানে অনাবশ্যক সুর দিতে গিয়ে টেনে পড়া একটি বড় ভুল।

অহেতুক টান যুক্ত করলে আরবি শব্দের মূল অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ,  না-বোধক দীর্ঘ টানে উচ্চারিত ‘লা- আ‘বুদু’ (لَا أَعْبُدُ) বাক্যের অর্থ হলো ‘আমি ইবাদত করি না’; কিন্তু দীর্ঘ টান ছেড়ে দিয়ে সেটিকে সংক্ষেপে ‘লা’আ‘বুদু’ (لَأَعْبُدُ) পড়লে অর্থ হয়ে যায় ‘আমি অবশ্যই ইবাদত করি’—যার ফলে মূল অর্থ সম্পূর্ণ উল্টে যায়।

আবার কোনো টান ছাড়া একবচনে সম্বোধন করা ‘আন্‌‘আম্‌তা’ (أَنْعَمْتَ) শব্দের অর্থ হলো ‘আপনি (আল্লাহ) অনুগ্রহ করেছেন’; কিন্তু শেষ অক্ষরে অনাবশ্যক টান দিয়ে ‘আন্‌‘আম্‌তা-’ (أَنْعَمْتَا) উচ্চারণ করলে তা দ্বিবচন রূপ নিয়ে হয়ে যায় ‘তোমরা দুইজন অনুগ্রহ করেছ’—যার ফলে একক আল্লাহর সম্বোধন নষ্ট হয়ে যায়।

সংশোধনের উপায়: মাদ্দের মূল প্রকারভেদ ও মাত্রাগুলো চিনে নেওয়া এবং পড়ার সময় আঙুলের গণনার মাধ্যমে পরিমাপ নিখুঁত করার অনুশীলন করা।

.কীভাবে কোরআন পড়লে জীবন বদলে যাবে.
পবিত্র কোরআন শুদ্ধভাবে পড়া শুধু একটি শিল্প নয়, এটি পরম প্রতিপালকের প্রতি বান্দার শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ।
.

৩. ভুল জায়গায় থামা ও পড়া শুরু করা

একটি দীর্ঘ আয়াতের মাঝখানে শ্বাস শেষ হয়ে গেলে ভুল স্থানে থামা কিংবা অর্থ সম্পূর্ণ না করে সেখান থেকে পুনরায় পড়া শুরু করার বিপরীত।

ভুল স্থানে থামার কারণে আয়াতের ভাবার্থ বিকৃত হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, মাদকগ্রহণ নিষেধের আয়াত হলো ‘লা তাক্বরাবুস সালা-তা ওয়া আনতুম সুকা-রা-’; যার অর্থ হলো ‘তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না’; কিন্তু মাঝপথে ভুল জায়গায় ‘লা তাক্বরাবুস সালা-ত’ বলে থেমে গেলে অর্থ দাঁড়ায় ‘তোমরা নামাজের কাছেই যেও না (নামাজ পড়ো না)’—যা সম্পূর্ণ বিপরীত ও ভ্রান্ত নির্দেশ তৈরি করে।

আবার পুনরুত্থান বিষয়ক আয়াত ‘ইন্নামা- ইয়াস্তাজীবুল্লাযী ইয়াসমা‘ঊন, ওয়াল মাওতা- ইয়াব‘আছুহুমুল্লা-হ’; যার অর্থ হলো ‘শুধু তারাই সাড়া দেয় যারা শোনে; আর মৃতদের আল্লাহ পুনরুত্থিত করবেন’। কিন্তু ভুলবশত ‘ইয়াসমা‘ঊন’-এ না থেমে ‘ওয়াল মাওতা’ শব্দকে আগের সাথে মিলিয়ে পড়লে অর্থ দাঁড়ায় ‘যারা শোনে এবং মৃতরা—উভয়েই সাড়া দেয়’—যা বাস্তব অর্থকে বিকৃত করে দেয়

সংশোধনের উপায়: কোরআন মাজিদে মুদ্রিত ওয়াকফের চিহ্নসমূহ (যেমন: মিম, তোয়া, জিম, লা ইত্যাদি) জেনে নেওয়া এবং নির্দেশিত স্থানেই বিরতি দেওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, পবিত্র কোরআন শুদ্ধভাবে পড়া শুধু একটি শিল্প নয়, এটি পরম প্রতিপালকের প্রতি বান্দার শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ। মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি দক্ষতার সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে, সে সম্মানিত ও অনুগত ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৩৭)

আসুন, অবহেলা কাটিয়ে উঠে নিয়ম মেনে শুদ্ধ উচ্চারণে কোরআন শেখার উদ্যোগ নিই, যাতে আমাদের প্রতিটি অক্ষর পাঠ আল্লাহর কাছে কবুল হয়।

.অনলাইনে শিশুর নিরাপদ কোরআন শিক্ষা: অভিভাবকের ৫ করণীয়