বাংলাদেশের অর্থবছর বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই, শেষ হয় পরের বছরের ৩০ জুন। সরকার এটি বদলে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
তবে নতুন ব্যবস্থা এখনই কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসের একটি অন্তর্বর্তী অর্থবছর থাকবে। এরপর ২০২৮ সালের ১ এপ্রিল শুরু হবে নতুন ব্যবস্থার প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর।
পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর ফলে জুলাই-আগস্ট মাসে অর্থাৎ বর্ষাকালে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকে। ফলে বর্ষার কারণে একদিকে কাজ দীর্ঘায়িত হয়, কাজের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ব্যাপক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। এপ্রিল–মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করা হলে বর্ষার আগেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, লেজিসলেটিভ বিভাগ, অর্থ বিভাগসহ উপযুক্ত অংশীজন সমন্বয়ে একটি কমিটি পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। এ ছাড়া অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বিভিন্ন সিস্টেমে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রশ্ন হলো, অর্থবছর বদলালে বাংলাদেশের কী লাভ হবে? বর্ষার মধ্যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও তাড়াহুড়া করে উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করার প্রবণতা কি কমবে? অন্যদের অভিজ্ঞতা কী বলে?
অর্থবছর আসলে কী : অর্থবছর হলো সরকারের আয়–ব্যয় হিসাবের নির্ধারিত ১২ মাস। এই সময় ধরে সরকার বাজেট তৈরি করে, কর ও অন্যান্য রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে অর্থ বরাদ্দ দেয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব করে।.
১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ভারতের শাসনভার সরাসরি নেয় ব্রিটিশ সরকার। এর আগের বছরের বিদ্রোহ দমন এবং নতুন প্রশাসন পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। ফলে সরকারের আয়–ব্যয় একটি নিয়মিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
ব্রিটিশ ভারতের প্রথম আনুষ্ঠানিক বাজেট দেন গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের অর্থ সদস্য জেমস উইলসন। তিনি ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল বাজেট উপস্থাপন করেন। তখন অর্থবছর ছিল মে থেকে পরের বছরের এপ্রিল পর্যন্ত। রাজস্বঘাটতি সামাল দিতে সেই বাজেটেই ব্রিটিশ ভারতে প্রথম আয়কর চালু করা হয়। সাত বছর পর ব্রিটিশ সরকার অর্থবছর এক মাস এগিয়ে আনে। ১৮৬৭ সাল থেকে মে–এপ্রিলের বদলে এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর চালু হয়। ভারতীয় কৃষি, ফসল বা বর্ষাকালের সুবিধা বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের সরকারি আয়–ব্যয়ের হিসাবকে ব্রিটেনের অর্থবছরের সঙ্গে মেলানো।
এ পরিবর্তনের জন্য মাঝখানে একটি ছোট অর্থবছর রাখা হয়েছিল। ১৮৬৬–৬৭ অর্থবছরটি ১২ মাসের বদলে ১১ মাসে শেষ করা হয়। সেটি চলে ১৮৬৬ সালের মে থেকে ১৮৬৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। এরপর শুরু হয় পূর্ণ এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থাই বহাল ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। দেশটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট দেন প্রথম অর্থমন্ত্রী মালিক গোলাম মোহাম্মদ। ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ১৯৪৮–৪৯ অর্থবছরের বাজেট গণপরিষদে উপস্থাপন করেন। তখনো ব্রিটিশ আমলের এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করা হচ্ছিল।
.আইয়ুব খানের সামরিক সরকার ১৯৫৯ সালে অর্থবছর আবার বদলায়। এপ্রিল–মার্চের পরিবর্তে জুলাই–জুন অর্থবছর চালু করা হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, এপ্রিল থেকে বাজেট কার্যকর হলে প্রকল্প গ্রহণ, অর্থ ছাড় ও দরপত্র শেষ করতে করতে বর্ষা চলে আসে। এতে নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়। জুলাই–জুন অর্থবছর কৃষি, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সরকারি হিসাবের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে মনে করা হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থায় যেতে ১৯৫৮–৫৯ অর্থবছরকে তিন মাস বাড়ানো হয়। ফলে সেটি ১২ মাসের বদলে ১৫ মাসের হয়—১৯৫৮ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৫৯ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত নতুন অর্থবছর চালু হয়।
১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ পাকিস্তান আমলের জুলাই–জুন অর্থবছরই বহাল রাখে। ১৯৭২ সালের সংবিধানেও এ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে অর্থবছর বলতে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বছরকে বোঝানো হয়েছে।
.অর্থবছর কখন থেকে কখন হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির সদস্যদেশগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশই জানুয়ারি–ডিসেম্বরকে অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ করে। অন্য অধিকাংশ দেশ মার্চ, জুন বা সেপ্টেম্বরে অর্থবছর শেষ করে। অল্প কয়েকটি দেশ ধর্মীয় বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে। যেমন–
লাতিন আমেরিকার সব দেশ, ফরাসিভাষী আফ্রিকার দেশগুলো, ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছর গণনা করে।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এমন অনেক দেশ ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর অনুসরণ করে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রুনেই, কানাডা, ভারত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্য।
অস্ট্রেলিয়া, মিসর, কেনিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, তানজানিয়া ও দক্ষিণ গোলার্ধের অনেক দেশের অর্থবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, লাওসসহ কিছু দেশের অর্থবছর ১ অক্টোবর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর।
ইরান ও আফগানিস্তানের মতো দেশ ২১ মার্চ থেকে পরের বছরের ২০ মার্চ পর্যন্ত ধর্মীয় নববর্ষভিত্তিক অর্থবছর অনুসরণ করে।
বাংলাদেশের অর্থবছর বদলানোর পক্ষে সরকারের প্রধান যুক্তি হলো, উন্নয়নকাজের সময়ের সঙ্গে অর্থবছরের সামঞ্জস্য আনা। বাংলাদেশে অর্থবছরের শেষ তিন মাস হলো এপ্রিল, মে ও জুন। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বড় অংশের অর্থও এ সময় ব্যয় হয়। জুনে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে কাজ শেষ করা এবং বিল পরিশোধের তাড়ায় মে–জুনে রাস্তা, সেতু, বাঁধ ও বিভিন্ন অবকাঠামোর নির্মাণ ও মেরামত বেড়ে যায়। কিন্তু এ সময়ই দেশে বর্ষা শুরু হয়। বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা খোঁড়া, মাটি ভরাট কিংবা নির্মাণকাজ করলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অপচয় ও অপব্যবহার হয়। জনদুর্ভোগও বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ খরচ করাই যেন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
.অর্থবছর মার্চে শেষ হলে শেষ মুহূর্তের ব্যয়ের চাপ পড়বে জানুয়ারি থেকে মার্চের শুষ্ক মৌসুমে। সরকারের আশা, এতে বর্ষার আগেই নির্মাণকাজ শেষ করা যাবে, কাজের মান বাড়বে এবং বর্ষার মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি কমবে। তবে এ সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। নতুন অর্থবছর শুরু হবে এপ্রিলে, অর্থাৎ বর্ষার ঠিক আগে। ফলে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের নকশা, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ ও ঠিকাদার নিয়োগ শেষ করে অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে মাঠপর্যায়ের কাজ করার পরিকল্পনা নিতে হবে।
.এখন সাধারণত জুনে জাতীয় বাজেট পাস করা হয় এবং ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর হয়। নতুন ব্যবস্থায় ১ এপ্রিল থেকে বাজেট কার্যকর করতে হলে মার্চের মধ্যেই সংসদে বাজেট পাস করতে হবে। এর ফলে বাজেট তৈরির কাজ সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে শুরু করতে হবে। অর্থবছর বদল তাই কেবল হিসাবের খাতায় তিন মাস এগিয়ে যাওয়া নয়। সরকারের পুরো বাজেটচক্র নতুন করে সাজাতে হবে।
.সরকারি অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সংবিধান, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিধি সংশোধন করতে হবে। আইবাস++, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, ট্রেজারি হিসাব, কর ও ভ্যাটের অনলাইন ব্যবস্থা, বেতন–পেনশন, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্পের তথ্যভান্ডারেও পরিবর্তন লাগবে।
.সরকারি অর্থবছরের সঙ্গে করবর্ষও বদলানো হবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকারি অর্থবছর, করবর্ষ ও কোম্পানির হিসাববর্ষ একই বিষয় নয়। অনেক দেশে তিনটি আলাদা সময় অনুসরণ করা হয়। করবর্ষ সরকারের আয়–ব্যয়ের চক্রের অংশ। এটি একটি কোম্পানির ব্যবসায়িক চক্রের সঙ্গেও যুক্ত।
সুতরাং বাংলাদেশে করবর্ষও বদলানো হলে কোম্পানিগুলোকে হিসাব, নিরীক্ষা, কর রিটার্ন ও সফটওয়্যারের সময়সূচি বদলাতে হবে। আইএমএফ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থবছর নির্ধারণ ও পরিবর্তন নিয়ে তৈরি এক রিপোর্টে বলছে, সরকার করবর্ষ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে কোম্পানিগুলোর কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি হয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে করবর্ষ পরিবর্তনের বদলে শুধু সরকারি অর্থবছর পরিবর্তন করা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশের কর কর্তৃপক্ষ কোম্পানিগুলোকে নিজেদের মতো করে করবর্ষ নির্ধারণের সুযোগ দেয়।
.অর্থবছরের শেষে তাড়াহুড়া করে টাকা খরচ করা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ক্রয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদ জেফ্রি লাইবম্যান ও নিল মাহোনি একই প্রবণতা পেয়েছেন। তাঁদের গবেষণার নাম ‘ডু এক্সপায়ারিং বাজেটস লিড টু ওয়েস্টফুল ইয়ার-এন্ড স্পেন্ডিং?’ সহজ বাংলায় এর অর্থ—মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বাজেট কি অর্থবছরের শেষে অপচয়মূলক ব্যয় বাড়ায়?
গবেষকেরা ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সরকারি ক্রয় ও চুক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দেখেন, মোট চুক্তিভিত্তিক ক্রয়ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে অর্থবছরের শেষ মাসে। শুধু শেষ সপ্তাহেই হয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বছরের অন্য সময়ের সাপ্তাহিক গড়ের তুলনায় শেষ সপ্তাহের ব্যয় ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৯ গুণ।
এর পেছনে রয়েছে ‘ইউজ ইট অর লুজ ইট’ বা ‘খরচ করো, নইলে হারাও’ ব্যবস্থা। একটি সরকারি দপ্তর বছরের শুরুতে জানে না, সামনে কোনো জরুরি ব্যয় আসবে কি না। তাই কিছু টাকা হাতে রাখে। বছরের শেষে সেই টাকা প্রয়োজন না হলে তা পরের বছরে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। আবার টাকা ফেরত দিলে পরের বছরের বরাদ্দ কমতে পারে, এমন আশঙ্কাও থাকে। ফলে দপ্তরগুলো শেষ মুহূর্তে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেও টাকা খরচ করতে আগ্রহী হয়।
গবেষকদের মতে, অব্যবহৃত বরাদ্দের কিছু অংশ পরের বছরে নেওয়ার সুযোগ দিলে শেষ মুহূর্তের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমতে পারে। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘বাজেট রোলওভার’ বা বরাদ্দ পরের বছরে নিয়ে যাওয়া। তবে কত টাকা নেওয়া যাবে, কত দিনের মধ্যে খরচ করতে হবে এবং কোথায় ব্যয় করা যাবে, তার সুস্পষ্ট নিয়ম ও নিরীক্ষা থাকতে হবে।
এ গবেষণার মূল শিক্ষা হলো, অর্থবছর কোন মাসে শেষ হচ্ছে, সেটি প্রধান বিষয় নয়। অব্যবহৃত টাকা হারানোর ভয় এবং পুরো টাকা খরচ না করলে ভবিষ্যৎ বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কাই শেষ মুহূর্তের ব্যয় বাড়ায়। এ নিয়ম ও প্রণোদনা না বদলালে জুনের তাড়াহুড়া মার্চে চলে যাবে; সমস্যাটি থেকে যাবে।
.বাংলাদেশের জন্য ভারতের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। সে শিক্ষা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা কমিটি করেনি। বরং সিদ্ধান্ত নেবে কি না, এটা বুঝতেই স্বাধীন কমিটি গঠন করেছিল। আর বাংলাদেশ করেছে উল্টো। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এখন কাজটি কীভাবে হবে, তা ঠিক করতে আমলাদের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।.
বাংলাদেশ যে ব্যবস্থায় যাচ্ছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে সেই এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে। তবে ভারতও একসময় অর্থবছর বদলে জানুয়ারি–ডিসেম্বর করার কথা বিবেচনা করেছিল। ২০১৬ সালে দেশটির সরকার সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা শঙ্কর আচার্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল। কমিটিকে কৃষি ও বর্ষার সঙ্গে অর্থবছরের মিল, কর আদায়, কেন্দ্র ও রাজ্যের বাজেট, ব্যবসার খরচ এবং প্রয়োজনীয় আইন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যাচাই করতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থা চালুর সময় ও অন্তর্বর্তী অর্থবছর কেমন হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্বও দেওয়া হয়।
জানুয়ারি–ডিসেম্বর ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি ছিল, বছরের মাঝামাঝি বর্ষা কেমন হলো, তা দেখার পর পরবর্তী বছরের বাজেট করা যাবে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বড় ধরনের আপত্তি তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, এটি শুধু হিসাবের তারিখ বদল নয়; কর, কোম্পানির হিসাব, নিরীক্ষা, সফটওয়্যার, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের বাজেট—সবকিছু বদলাতে হবে। এতে সরকার ও বেসরকারি খাতের বড় ব্যয় হবে। ভারত শেষ পর্যন্ত অর্থবছর বদলায়নি। এপ্রিল–মার্চই বহাল রেখেছে।
বাংলাদেশের জন্য ভারতের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। সে শিক্ষা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা কমিটি করেনি। বরং সিদ্ধান্ত নেবে কি না, এটা বুঝতেই স্বাধীন কমিটি গঠন করেছিল। আর বাংলাদেশ করেছে উল্টো। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এখন কাজটি কীভাবে হবে, তা ঠিক করতে আমলাদের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।
.যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা হলো, শুধু অর্থবছরের সময় বদলানো যথেষ্ট নয়। সময়মতো সিদ্ধান্ত, সংসদীয় সমন্বয় ও রাজনৈতিক সমঝোতা না থাকলে বাড়তি তিন মাসেও বাজেটের প্রক্রিয়া শেষ করা যায় না।.
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থবছর আগে ছিল ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। ১৯৭৪ সালের কংগ্রেশনাল বাজেট অ্যান্ড ইমপাউন্ডমেন্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট অনুযায়ী, ১৯৭৭ অর্থবছর থেকে এটি ১ অক্টোবর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়। পরিবর্তনের জন্য ১৯৭৬ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বরকে তিন মাসের ‘ট্রানজিশন কোয়ার্টার’ বা অন্তর্বর্তী হিসাবকাল ধরা হয়েছিল। আইনটির মাধ্যমে কংগ্রেসের বাজেট কমিটি ও কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস—সিবিও গঠনসহ একটি সমন্বিত বাজেটের প্রক্রিয়া চালু হয়।
অর্থবছর তিন মাস পিছিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব পরীক্ষা, সামগ্রিক বাজেট কাঠামো নির্ধারণ এবং বরাদ্দ আইন পাসের জন্য কংগ্রেসকে বাড়তি সময় দেওয়া। তবে সময় বাড়িয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি। জিএওর হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত আগের ৪০ বছরের মধ্যে মাত্র ৪ বছর অস্থায়ী বরাদ্দের প্রয়োজন হয়নি। নিয়মিত বরাদ্দ আইন সময়মতো পাস না হলে সরকার ‘কন্টিনিউয়িং রেজোল্যুশন’ বা অস্থায়ী বরাদ্দে চলে। সেটিও পাস না হলে দেখা দেয় ‘গভর্নমেন্ট শাটডাউন’ বা সরকারি অচলাবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা হলো, শুধু অর্থবছরের সময় বদলানো যথেষ্ট নয়। সময়মতো সিদ্ধান্ত, সংসদীয় সমন্বয় ও রাজনৈতিক সমঝোতা না থাকলে বাড়তি তিন মাসেও বাজেটের প্রক্রিয়া শেষ করা যায় না।
.নিউজিল্যান্ড ১৯৮৯ সালে তার অর্থবছর এপ্রিল–মার্চ থেকে বদলে জুলাই–জুন করে। এটি ছিল দেশটির বৃহত্তর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের একটি অংশ। পরিবর্তনের একটি প্রধান কারণ ছিল, অর্থনৈতিক তথ্যের প্রাপ্যতা। অর্থবছরের শেষে সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টসের প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সময়ের সঙ্গে নতুন অর্থবছরের সামঞ্জস্য ছিল। প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়াও জুলাই–জুন অনুসরণ করে। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও পরিসংখ্যানগত তুলনা সহজ করার বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল।
তবে নিউজিল্যান্ড শুধু অর্থবছরের সময় বদলায়নি। একই সময়ে দেশটি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় সংস্কার আনে। এখানেই নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থবছর পরিবর্তনকে তারা আলাদা কোনো সমাধান হিসেবে দেখেনি; বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
.মিয়ানমারে দীর্ঘদিন অর্থবছর ছিল ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ। অং সান সু চির সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১৭ সালে এটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর দেশটির পার্লামেন্ট এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। উদ্দেশ্য ছিল বাজেট ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং মূলধন ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সুবিধা তৈরি করা। নতুন নিয়ম কার্যকর হয় ২০১৮–১৯ অর্থবছর থেকে।
মাঝখানে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসকে অন্তর্বর্তী বাজেটকাল রাখা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল আবার পুরোনো এপ্রিল–মার্চ ব্যবস্থায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এ পরিবর্তন কার্যকর হয় ২০২২ সালের ১ এপ্রিল থেকে। এ জন্য ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত আবার ছয় মাসের একটি অন্তর্বর্তী বা ‘মিনি বাজেট’ করা হয়।
অল্প সময়ের মধ্যে দুইবার অর্থবছর বদলানোয় মিয়ানমারের এক বছরের আয়–ব্যয়, ঘাটতি ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অন্য বছরের হিসাব তুলনা করা কঠিন হয়েছে। সরকারি দপ্তর, কর বিভাগ ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হিসাবের সময় নতুন করে ঠিক করতে হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের পর তথ্যপ্রকাশও কমেছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিবেদন এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেটের বিস্তারিত সময়মতো প্রকাশ করা হয়নি। এতে সরকারের আর্থিক হিসাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা কমেছে।
.আইএমএফের এক বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশগুলোয় নতুন অর্থবছরে রূপান্তর সাধারণভাবে মসৃণ ছিল। তবে পরিবর্তনের জন্য কিছু খরচ করতে হয়েছে। বাজেট প্রক্রিয়া ও সরকারি হিসাবব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচি সম্পর্কে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে। সরকারি ক্রয়ের পরিকল্পনা, দরপত্র ও চুক্তির সময়সূচিও পরিবর্তন করতে হয়েছে।
আইএমএফের মতে, অর্থবছর পরিবর্তনের কারণে কোনো দেশের সরকারের কার্যক্রম ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা খরচ ও বিঘ্ন তৈরি হবে, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। এ খরচ ও বিঘ্ন কখনো কখনো উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
.বাংলাদেশের আবহাওয়া ও উন্নয়ন প্রকল্পের ধরন বিবেচনা করলে মার্চে অর্থবছর শেষ করার যৌক্তিকতা আছে। সম্ভাব্য সুবিধাগুলো হলো—
অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক শুষ্ক মৌসুমে পড়বে;
বর্ষার আগে রাস্তা, সেতু, বাঁধ ও অন্যান্য নির্মাণকাজ শেষ করা সহজ হতে পারে;
মে–জুনের খোঁড়াখুঁড়ি ও জনদুর্ভোগ কমতে পারে;
উন্নয়ন ব্যয়ের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে সামঞ্জস্য বাড়তে পারে;
ভারত, জাপানসহ কয়েকটি বড় উন্নয়ন সহযোগীর অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় কিছুটা সহজ হতে পারে;
বাজেট প্রস্তুতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন মৌসুমভিত্তিক সময়সূচি তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য সুবিধা। বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে পরিবর্তনটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তার ওপর।
.বাংলাদেশের অর্থবছর বদলের পেছনে বাস্তব যুক্তি আছে। কিন্তু অর্থবছর বদল কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। রাস্তা নির্মাণে দেরি কেন হয়, প্রকল্প অনুমোদনে কত সময় লাগে, দরপত্র আটকে থাকে কেন, জমি অধিগ্রহণ কেন শেষ হয় না, বছরের শুরুতে অর্থছাড় হয় না কেন—এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থবছরের ক্যালেন্ডারে নেই।.
জুনের তাড়াহুড়া মার্চে চলে যেতে পারে। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র ও অর্থ ছাড়ে দেরি হলে মার্চের আগে আবার দ্রুত টাকা খরচের চাপ তৈরি হবে।
নতুন অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের উল্লেখযোগ্য অংশই বর্ষাকালে পড়বে। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের প্রস্তুতি শেষ না হলে শুষ্ক মৌসুমে কাজ করার পুরো সুযোগ পাওয়া যাবে না।
নয় মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছরে আয়, ব্যয়, ঘাটতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব আগের ও পরের বছরের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন হতে পারে।
সরকারি অর্থবছর, করবর্ষ ও কোম্পানির হিসাববর্ষের সম্পর্ক স্পষ্ট না হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও করদাতার খরচ বাড়তে পারে।
অর্থবছর বদলের সুফল পেতে সরকারকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের নকশা, অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ ও দরপত্র শেষ করে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত মূল নির্মাণকাজ করতে হবে। বছরের শুরু থেকেই নিয়মিত অর্থ ছাড়তে হবে, যাতে শেষ সময়ে তাড়াহুড়া না হয়। অব্যবহৃত অর্থ শর্তসাপেক্ষে পরের বছরে নেওয়ার সুযোগ দিলে শুধু বরাদ্দ শেষ করার জন্য নিম্নমানের কাজের চাপ কমতে পারে।
৯ মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছরের হিসাব কীভাবে ১২ মাসের সঙ্গে তুলনা করা হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি করবর্ষ ও কোম্পানির হিসাববর্ষ বদলাবে কি না, তা জানাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন ব্যবস্থার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
.বাংলাদেশের অর্থবছর বদলের পেছনে বাস্তব যুক্তি আছে। কিন্তু অর্থবছর বদল কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। রাস্তা নির্মাণে দেরি কেন হয়, প্রকল্প অনুমোদনে কত সময় লাগে, দরপত্র আটকে থাকে কেন, জমি অধিগ্রহণ কেন শেষ হয় না, বছরের শুরুতে অর্থছাড় হয় না কেন—এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থবছরের ক্যালেন্ডারে নেই।
এগুলো প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্নটি অর্থবছর মার্চে শেষ হবে কি না, শুধু সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, নতুন সময়সূচিকে কাজে লাগিয়ে বাজেট ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার সংস্কার করা যাবে কি না। তা করা গেলে অর্থবছর বদল বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ব্যয়ের মান এবং আর্থিক জবাবদিহিতে একটি অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারে। তা না হলে জুনের তাড়াহুড়া শুধু মার্চেই সরে যাবে, অন্য কিছু নয়।