অর্ধযুগের ক্যারিয়ারে প্রায় আড়াই শ নাটক নির্মাণ করেছেন মহিন খান। এর মধ্যে ৯০টিরই ভিউ কোটির ওপরে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সর্বাধিক দেখা শীর্ষ ১০ নাটকের ৫টিরই নির্মাতা তিনি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল আলম।
.যে নাটক পরিচালনা করেন সেটাই হিট, রহস্য কী?
.মহিন খান : আমি বলব, এটা দর্শকদের ভালোবাসা। তারা পছন্দ করে বলেই ভিউ হয়। এটা আমাকে বুঝতে সহায়তা করে দর্শক কোন গল্প দেখতে চায়। এভাবেই যেন নাটক বানিয়ে যেতে পারি। সবকিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া।
.কীসের ওপর ভিত্তি করে গল্প নির্বাচন করেন?
মহিন খান : এ জন্য বড় একটা সময় আমাকে ভাবতে হয়। আলাদা করে এতে সময় দিই। কারণ, দিন শেষে ভালো গল্পই প্রাণ। আপনি যতই তারকা নেন আর উপস্থাপনা কৌশল পরিবর্তন করেন, লাভ নাই। গল্প ভালো হলেই দর্শক দেখবে। এ জন্য সবার আগে ভাবতে হয়, কোন গল্পগুলো দর্শক সহজেই কানেক্ট করতে পারছে, সেই ধারাটা বেছে নেওয়া। এ জন্য আমার দেখা চারপাশের গল্প ও চরিত্র থেকে সহায়তা নিই। যেগুলো নিয়ে দর্শক ভাবছে, কথা বলছে, আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোই আমাকে গল্পের উপকরণ বাছাই করতে সহায়তা করে।
নিজের কাজগুলো দেখে কী মনে হয়?
মহিন খান : আমার কাজগুলো দেখে আমার নিজেরই ভালো লাগে। যে কারণে আমি লেখার সময় নিজেই ভাবি, দর্শকের জায়গায় থাকলে এই প্রেক্ষাপট সংলাপ দেখে কী অনুভূতি হতো, আমি দেখতাম কি না। নিজে কনভিন্স হলেই সেটা নিয়ে নাটক বানাই।
চিত্রনাট্য লেখার সময় ইউটিউব ভিউয়ের কথা মাথায় থাকে?
.মহিন খান : ভিউ মাথায় রাখার চেষ্টা করি না। আমি বুঝেই গেছি, গল্প–চরিত্র ঠিক হলে ভিউ হবেই। যে কারণে আমাকে আপডেট থাকতে হয়। নানা ঘটনা জানতে হয়। আসল জায়গায় আমাকে সময় দিতে হয়। তবে এখন কিন্তু দর্শক ইউটিউবে নাটক দেখেন। সে কারণে ইউটিউব ভিউয়ের কথা মাথায় না রাখাটাও বোকামি। এটা গল্প ভাবনার মধ্য দিয়েই সহজাত প্রক্রিয়ায় চলে আসে।
.আপনার নির্মিত সর্বাধিক নাটকের জুটি নিলয় আলমগীর ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি কেন?
মহিন খান : আমার ২৫০টি নাটকের ৫০টির অভিনয়শিল্পী নিলয় আর হিমি। কাজের জায়গায় তাঁদের সঙ্গে আমার অ্যাডজাস্টমেন্ট ভালো। কোনো একটি দৃশ্য বা কোনো একটি গল্পের কোন দিক ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন, তাঁদের কোন বিষয়গুলো দর্শকেরা পর্দায় পছন্দ করবেন, সেটা দীর্ঘদিনের একটি অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি। যে কারণে গল্প ভাবনার শুরুতেই তাঁদের কথা মাথায় থাকে।
নিয়মিত ভিউ বা দর্শক ধরে রাখাটা চ্যালেঞ্জিং মনে হয় না?
মহিন খান : এটা অনেক চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া। কারণ, আমরা তো জানি না কোন নাটক কত দর্শক দেখবেন। আবার কোনো নাটক দেখা গেল আগের চেয়ে কম দর্শক দেখলেন। তখন এক রকম প্রতিক্রিয়া পাই। এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন। আবার অনেক সময় দেশের অনেক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেও ভিউতে হেরফের হয়। এটা আমাকে সব সময় ভাবায় না। যে কারণে ঠিকঠাক গল্প বলায় মনোযোগ দিই।
পরিচালনায় কীভাবে আসা?
.মহিন খান : আমার ইচ্ছা ছিল অভিনেতা হওয়ার। যে কারণে আমার মঞ্চে অভিনয় শুরু। মঞ্চে অভিনয়ের সময়েই অভিনেতা ও পরিচালক শামীম জামানের সঙ্গে পরিচয় হয়। ঘটনাক্রমে তাঁর কাছে সব শেয়ার করি। মূলত অভিনয় করার কথাই বলি। সব শুনে তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পরামর্শ দেন। সেটা ২০১৫ সালের কথা। এই শুরু। একসময় সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়েই নির্মাণকাজটির প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়। নিজের ভাবনা দর্শকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করছি, দর্শক কীভাবে নিচ্ছেন সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। অভিনয়শিল্পী হিসেবেও প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পেশা হিসেবে পরিচালনাটাই আমাকে বেশি টানতে থাকে। এখন পরিচালনাই আমার পেশা ও নেশা।
.নাট্যাঙ্গনে ১১ বছরের পথচলায় কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?
মহিন খান : এখন আগের চেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে। টেকনিক্যাল দিকে অনেক এগিয়ে গেছে। নাটকের বাজেট আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। শুটিং লোকেশনের পরিসর অনেক বেড়েছে। দেশের নানা প্রান্তে কাজ হচ্ছে। অর্থনৈতিক জায়গায়তেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় আমরা সহকারী পরিচালক হিসেবে কোনো টাকাই পাইনি। এখন আমার সহকারী পরিচালকেরা অগ্রিম টাকা নিয়ে যায়।
প্রায়ই শোনা যায় সহকারী পরিচালকেরা নানাভাবে বঞ্চিত হন, এটা নিয়ে আপনার কোনো কষ্ট আছে?
.মহিন খান : সহকারী পরিচালক হিসেবে আমার অনেক কষ্টের জায়গা আছে। বেশির ভাগ সহকারী পরিচালকদের আগে ঠিকমতো টাকা দেওয়া হতো না, আমি টাকা পাইতাম না। সেই দিনগুলোতে অনেক কষ্টে ছোট একটা জায়গায় থাকতাম। সামান্য কিছু টাকা হলেই কিন্তু সেই সময়টা অন্য রকম হতে পারত। যাই হোক, তারপরেও নিজের কাজটা ঠিকমতো করে গিয়েছি। এগুলোকে স্ট্রাগল বলব না, আমি এখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আরও অনেক বিরূপ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
.বিরূপ অভিজ্ঞতা বলতে...
মহিন খান : সহকারী পরিচালক হিসেবে একসময় চিল্লাচিল্লি শুনতে হয়েছে। অনেকে আর্টিস্টের রাগারাগি সহ্য করতে হয়েছে। সেই সময় অনেকে তারকাই ইচ্ছা করে গালি শুনিয়েছে। যেমন একবার একজন অভিনয়শিল্পীকে বললাম, ‘ভাই এখন আপনার দৃশ্য ধারণ হবে। ক্যামেরা রেডি আছে আসেন।’ তিনি বললেন, ‘পরে আসতেছি যাও।’ আমি সেভাবেই পরিচালককে গিয়ে বললাম, ‘ভাই একটু পরে আসবে।’ তখনই পরিচালক সেই অভিনয়শিল্পীর কাছে এসে বললেন, ‘এখন সিন করতে হবে। দেরি করা যাবে না।’ হঠাৎ সেই অভিনয়শিল্পী আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দিলেন। তিনি আমার সামনেই বললেন, আমি নাকি তাঁকে ডাকিনি। আমার ওপর আরও রাগারাগি হলো। সেই দিন ভীষণ অপমানিত বোধ করেছিলাম। এগুলোই হয়তো আমাকে আরও কাজে মনোযোগী হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
অনেক সময় তো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও পান।
.মহিন খান : সবাই আমার কাজ পছন্দ করবেন, সেটা প্রত্যাশা করি না। একজন সবাইকে খুশি করতে পারে না। যত ভালো কাজই হোক, কিছু মানুষ নেতিবাচক কথা বলবেন, এটাই স্বাভাবিক। এই নিয়ে কারও সঙ্গে তর্ক করি না। কারণ, পক্ষ–বিপক্ষে কথা হবেই। সমালোচনাকারীরাও যেন আমার নাটক দেখে পছন্দ করেন, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।