ফ্রিজে খাবার রাখার পর দেখলেন, আগের মতো ঠান্ডা হচ্ছে না। পানি ঠান্ডা হতে সময় লাগছে, সবজি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে কিংবা ফ্রিজারের বরফও ঠিকমতো জমছে না। এমন হলে অনেকেই ভাবেন, হয়তো গ্যাস কমে গেছে বা ফ্রিজে বড় কোনো যান্ত্রিক সমস্যা হয়েছে।
কিন্তু সবসময় এমনটা নাও হতে পারে। ফ্রিজের পেছনে বা নিচের দিকে থাকা কনডেনসার কয়েলে দীর্ঘদিন ধরে ধুলো, ময়লা ও আবর্জনা জমে গেলেও ফ্রিজের ঠান্ডা করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে রান্নাঘরের ধোঁয়া ও তেল, ধুলাবালু এবং পোষা প্রাণীর লোমের কারণে এই অংশ দ্রুত নোংরা হতে পারে।
তাই ফ্রিজ ঠিকমতো ঠান্ডা না হলে মিস্ত্রি ডাকার আগে কয়েকটি সহজ বিষয় পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
কনডেনসার কয়েল কী?
ফ্রিজের ভেতর ঠান্ডা তৈরি হওয়ার পর সেই তাপ বাইরে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কনডেনসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফ্রিজের মডেল অনুযায়ী এই কয়েল নিচের দিকে, পেছনে বা অন্য কোনো অংশে থাকতে পারে।
সময়ের সঙ্গে এই কয়েলের ওপর ধুলো ও ময়লা জমলে বাতাস চলাচলে বাধা তৈরি হতে পারে। ফলে ফ্রিজকে একই তাপমাত্রা ধরে রাখতে বেশি পরিশ্রম করতে হতে পারে এবং ঠান্ডা করার কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
তবে সব ফ্রিজের কনডেনসার একই জায়গায় থাকে না। কিছু মডেলে এটি এমনভাবে বসানো থাকে যে ব্যবহারকারী নিজে পরিষ্কার করতে পারেন না। তাই নিজের ফ্রিজের নির্দেশিকা দেখে নেওয়া জরুরি।
মাত্র কয়েক মিনিটেই পরিষ্কার করা সম্ভব
কনডেনসার পরিষ্কার করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ফ্রিজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। নিরাপত্তার জন্য কাজটি করার আগে প্লাগ খুলে রাখা উচিত।
এরপর ফ্রিজের নিচে বা পেছনে কনডেনসার কয়েল কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করুন। কোনো কোনো মডেলে নিচের গ্রিল খুলতে হতে পারে।
কয়েল বা তার আশপাশে জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার করার জন্য নরম ব্রাশযুক্ত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতিগুলোর একটি। খুব জোরে ঘষে কয়েলের পাতলা অংশ বাঁকিয়ে ফেলা উচিত নয়।
পরিষ্কার করার সহজ ধাপ
ফ্রিজের প্লাগ খুলুন: পরিষ্কার করার আগে অবশ্যই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করুন।
ফ্রিজটি দেয়াল থেকে একটু সরান: পেছনের অংশে কনডেনসার থাকলে সেখানে সহজে পৌঁছানোর জন্য ফ্রিজটি সামান্য সামনে টেনে আনুন। তবে গ্যাসের পাইপ, পানির লাইন বা অন্য কোনো সংযোগে টান দেবেন না।
কনডেনসার কয়েল খুঁজে বের করুন: আপনার ফ্রিজের ব্যবহার নির্দেশিকায় দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন কয়েল কোথায় রয়েছে।
ধুলো পরিষ্কার করুন: নরম ব্রাশযুক্ত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কয়েল এবং আশপাশের ধুলো পরিষ্কার করুন। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত কয়েল ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ্রিল বা প্যানেল আগের জায়গায় লাগিয়ে দিন: পরিষ্কার করার পর কোনো অংশ খুলে থাকলে সেটি ঠিকভাবে লাগিয়ে দিন।
আবার বিদ্যুৎ সংযোগ দিন: সবকিছু ঠিক আছে নিশ্চিত হওয়ার পর ফ্রিজ চালু করুন।
কত দিন পর পর পরিষ্কার করবেন?
এখানে সবার জন্য একই নিয়ম নেই।
স্বাভাবিক ঘরোয়া পরিবেশে অনেক ফ্রিজের কনডেনসার নিয়মিত পরিষ্কার করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে রান্নাঘর যদি খুব ধুলোময় বা তেলতেলে হয়, বাড়িতে পোষা প্রাণী থাকে কিংবা নির্মাণকাজের কারণে বাতাসে বেশি ধুলো থাকে, তাহলে তুলনামূলক ঘন ঘন পরীক্ষা ও পরিষ্কার করার প্রয়োজন হতে পারে।
পরিবেশভেদে প্রায় দুই থেকে ছয় মাস পরপর কনডেনসার পরীক্ষা বা পরিষ্কারের কথা বলা হয়েছে। তবে আপনার ফ্রিজের নিজস্ব ব্যবহার নির্দেশিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিছু মডেলে কনডেনসার নিজে পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই, আবার কিছু মডেলে এটি কেবল প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়ে পরিষ্কার করানোর নির্দেশ থাকে।
শুধু কয়েল পরিষ্কার করলেই কি ফ্রিজ ঠান্ডা হবে?
সব সময় নয়।
ফ্রিজ ঠান্ডা না হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন তাপমাত্রার সেটিং ঠিক না থাকা, ভেতরের বাতাস চলাচলের জায়গা বন্ধ হয়ে যাওয়া, একসঙ্গে অনেক খাবার ঢুকিয়ে দেওয়া, বারবার দরজা খোলা কিংবা ফ্রিজকে অতিরিক্ত গরম জায়গায় রাখা।
তাই কয়েল পরিষ্কার করার পরও সমস্যা থাকলে অন্য বিষয়গুলোও পরীক্ষা করতে হবে।
ফ্রিজের ভেতরে অতিরিক্ত খাবার রাখছেন কি না দেখুন
ফ্রিজ ভর্তি করে রাখলে ঠান্ডা বাতাস চলাচলের জায়গা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ভেন্ট বা বাতাস চলাচলের মুখ খাবার দিয়ে ঢেকে ফেললে ঠান্ডা বাতাস ঠিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে না।
তাই খাবার রাখার সময় বাতাস চলাচলের জায়গাগুলো খোলা রাখুন।
গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে না রেখে কিছুটা ঠান্ডা করে তারপর রাখাও ভালো। এতে ফ্রিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়া কমতে পারে।
দরজা বারবার খুললেও সমস্যা হতে পারে
ফ্রিজের দরজা যতবার খোলা হয়, ততবার বাইরের তুলনামূলক উষ্ণ বাতাস ভেতরে ঢোকে। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এর প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে।
তাই কী খাবেন বা কী বের করবেন তা আগে ঠিক করে দ্রুত দরজা বন্ধ করার অভ্যাস করুন।
দরজার রাবার বা গ্যাসকেট ঠিকমতো লাগছে কি না সেটিও দেখে নিতে পারেন। দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলে ঠান্ডা বেরিয়ে যেতে পারে এবং ফ্রিজকে বেশি সময় কাজ করতে হতে পারে।
ফ্রিজের তাপমাত্রা সেটিং পরীক্ষা করুন
কখনো কখনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সমস্যা নয়, তাপমাত্রার সেটিং পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার কারণেও ফ্রিজ ঠিকমতো ঠান্ডা নাও হতে পারে।
তাই কন্ট্রোল সেটিং পরীক্ষা করুন। প্রয়োজন হলে সামান্য পরিবর্তন করে ফল দেখতে পারেন। তাপমাত্রা পরিবর্তনের পর সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল পাওয়ার আশা না করে কিছু সময় অপেক্ষা করা উচিত। সেটিং পরিবর্তনের পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তাপমাত্রা আবার পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেয়ালের সঙ্গে একেবারে লাগিয়ে রাখবেন না
ফ্রিজের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকা দরকার। দেয়াল বা অন্য কোনো জিনিসের সঙ্গে একেবারে ঠেসে রাখলে তাপ বের হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ফ্রিজের মডেল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা আলাদা হতে পারে। তাই প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। কিছু ফ্রিজের নির্দেশিকায় পেছনে অন্তত ১ ইঞ্চি বা প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার জায়গা রাখার কথা বলা হয়েছে।
কখন নিজে পরিষ্কার না করে মিস্ত্রি ডাকবেন?
ফ্রিজ পরিষ্কার করার পরও যদি ঠান্ডা না হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু ধুলোর কারণে নাও হতে পারে।
যেমন কম্প্রেসর, ফ্যান, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রেফ্রিজারেন্ট বা অন্য কোনো যান্ত্রিক অংশে সমস্যা থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নিজে ফ্রিজ খুলে মেরামত করার চেষ্টা না করাই ভালো।
বিশেষ করে ফ্রিজে অস্বাভাবিক শব্দ, পোড়া গন্ধ, অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, বিদ্যুতের সমস্যা বা রেফ্রিজারেন্ট লাইনের কোনো ক্ষতি দেখা গেলে প্রশিক্ষিত কারিগরের সাহায্য নেওয়া উচিত।
একটি বিষয় মনে রাখবেন
কনডেনসার পরিষ্কার করা ফ্রিজের কার্যক্ষমতা ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ফ্রিজের ক্ষেত্রে এটি একইভাবে প্রযোজ্য নয়। কোনো কোনো মডেলে কনডেনসার এমনভাবে তৈরি করা হয় যে ব্যবহারকারীর নিয়মিত পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। আবার কিছু মডেলে এটি পরিষ্কার করতে অনুমোদিত কারিগরের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই শুধু ইন্টারনেটের কোনো কৌশল দেখে ফ্রিজের পেছনের অংশ খুলে ফেলা উচিত নয়।
সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো, আগে ফ্রিজের মডেল অনুযায়ী ব্যবহার নির্দেশিকা দেখা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং প্রস্তুতকারক যে অংশ পরিষ্কার করার অনুমতি দিয়েছে শুধু সেটিই পরিষ্কার করা।
ফ্রিজ ঠান্ডা না হলে তাই প্রথমেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই। কনডেনসার কয়েলে ধুলো জমেছে কি না, বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ কি না, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হচ্ছে কি না এবং তাপমাত্রার সেটিং ঠিক আছে কি না, এসব সহজ বিষয় আগে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আর এগুলো ঠিক থাকার পরও সমস্যা থাকলে দক্ষ কারিগরের সাহায্য নেওয়াই ভালো।
তথ্যসূত্র: নিউজ ১৮ বাংলা