মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত কিছুটা স্তিমিত হলেও এখন অর্থনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে নেমেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কূটনৈতিক টেবিলে নতি স্বীকার করাতে কঠোর ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ গ্রহণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো কোনো জাতীয় পরিকাঠামো ধ্বংস না করে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে কোণঠাসা করা।
এই কৌশলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে নৌ-অবরোধ। মার্কিন নৌবাহিনী কেবল হরমুজ প্রণালিতেই নয়, ভারত মহাসাগরে অবস্থান নিয়ে ইরানের জ্বালানি তেল চোরাচালানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন জাহাজের বহর জব্দ করছে। চীন ও ভারতে সস্তায় তেল পাঠানো ঠেকানোর পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাঁচামাল আমদানিও বন্ধ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর ফলে ইরানের তেলখনি ও খারগ দ্বীপের ট্যাংকারগুলো ধারণক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে যাওয়ায় অপরিশোধিত তেল উত্তোলন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ধসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
নৌ-অবরোধের পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতিতেও আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সম্প্রতি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ব্যবহৃত লাখ লাখ ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। এছাড়া ইরানের কাছ থেকে গোপনে তেল কেনা ছোট ছোট চীনা শোধনাগারগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ধারণা, অবকাঠামোতে হামলা চালালে সাধারণ ইরানিরা জাতীয়তাবাদী শক্তিতে বর্তমান সরকারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে তেহরানের আয়াতুল্লাহ সরকার বা আইআরজিসির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, ইরান সময়ের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালিতে সংকট বজায় রেখে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে তারা সুবিধা পেতে চায়। তেহরানের বাজি হলো, বিশ্বজুড়ে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়লে ওয়াশিংটনই নতি স্বীকার করবে।
তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে তেহরানের কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থাকে কাবু করা কঠিন। তাদের ধারণা, মূল অবকাঠামোতে কঠোর সামরিক আঘাত ছাড়া ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে পুরোপুরি সরিয়ে আনা সম্ভব না-ও হতে পারে।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারে ইনি মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধে জিততে ব্যর্থ হয়েছেন, তা শেষ করতেই ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ ব্যবহার করছেন।
দারে ইনি আল–জাজিরাকে বলেন, “সামরিক হামলা চালানোর আগে শত্রুকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দমবন্ধ করে দেওয়াই এই কৌশলের লক্ষ্য। অ্যানাকোন্ডা যেভাবে শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে তার শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও এই কৌশল অনুসরণ করছে। কারণ, গত পাঁচ মাসে তারা যা করেছে, তা ব্যর্থ হয়েছে।”
তবে ইরান অতীতেও নিষেধাজ্ঞা সহ্য করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে বলে যুক্তি দেন দারে ইনি। তিনি বলেন, “ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে গেছেন, যেখানে তিনি জিততেও পারছেন না, আবার বেরিয়ে আসতেও পারছেন না।”