একসময় ডিজনি চ্যানেলের মিষ্টিমুখের কিশোরী তারকা। তারপর গানের জগতে তুমুল জনপ্রিয় পপ তারকা। ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’, ‘হার্ট অ্যাটাক’, ‘কুল ফর দ্য সামার’ কিংবা ‘সরি নট সরি’—একটির পর একটি হিট গান তাঁকে নিয়ে গেছে বিশ্বখ্যাতির শিখরে। কিন্তু মঞ্চের ঝলমলে আলোর আড়ালে ডেমি লোভাটোর জীবন ছিল ভীষণ অন্ধকারে ঘেরা। কৈশোরে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা, আত্মক্ষতের প্রবণতা, মাদকাসক্তি, বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প।
আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় আসে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। মাদক সেবনের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ডেমি। পরে জানান, সেই রাতে শুধু অতিরিক্ত মাদক সেবনই হয়নি, তিনি যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয়েছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তাঁর জীবন বেঁচে ফেরাকে অনেকেই অলৌকিক বলেছিলেন।
আজ ২০ আগস্ট ডেমি লোভাটোর জন্মদিন। ১৯৯২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কিতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী এখন ৩৪ বছরে পা দিয়েছেন।
ডিজনি থেকে বিশ্বতারকা
ডেমির বিনোদনজগতে প্রবেশ খুব ছোট বয়সে। শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘বার্নি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’–এ অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে তাঁর যাত্রা শুরু। পরে ডিজনি চ্যানেলের ‘অ্যাজ দ্য বেল রিংস’–এ কাজ করেন। তবে ২০০৮ সালের ‘ক্যাম্প রক’ তাঁকে রাতারাতি কিশোরদের প্রিয় তারকা বানিয়ে দেয়। মিচি টরেস চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি জো জোনাসের সঙ্গে তাঁর গাওয়া ‘দিস ইজ মি’ গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।
এরপর ‘সনি উইথ আ চান্স’ সিরিজে অভিনয় করে ডিজনি তারকা হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন ডেমি। কিন্তু অভিনয়ের পাশাপাশি তখন তাঁর মাথায় অন্য স্বপ্ন—গান।
২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় ডেমির প্রথম অ্যালবাম ‘ডোন্ট ফরগেট’। বিলবোর্ড ২০০–তে অ্যালবামটির অভিষেক হয় দ্বিতীয় স্থানে। পরের বছর ‘হিয়ার উই গো এগেইন’ দিয়ে প্রথমবার অ্যালবাম চার্টের শীর্ষে ওঠেন তিনি।
সেই সময়ের ডেমি ছিলেন কিশোর–কিশোরীদের কাছে আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। কিন্তু একই সময়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনে চলছিল অন্য রকম যুদ্ধ।
১৫ বছর বয়সে যে আঘাত
ডেমি ২০২১ সালের তথ্যচিত্র ‘ডেমি লোভাটো: ড্যান্সিং উইথ দ্য ডেভিল’–এ জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান, ১৫ বছর বয়সে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ওই ব্যক্তিকে জানিয়েছিলেন যে তিনি যৌন সম্পর্কে যেতে প্রস্তুত নন। পরে ঘটনাটি ঘটে। আরও বেদনাদায়ক বিষয়, ডেমির দাবি ছিল, ঘটনার কথা জানানোর পরও অভিযুক্ত ব্যক্তি শাস্তি পাননি এবং একই বিনোদনজগতের পরিসরে কাজ করতে থাকেন।
এই অভিজ্ঞতা ডেমির মানসিক অবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে নিজের শরীর, খাবার ও আত্মপরিচয় নিয়ে তাঁর নানা সংকটের কথাও সামনে আসে। কৈশোরেই তিনি আত্মক্ষতের অভ্যাস ও খাদ্যাভ্যাসের সমস্যার সঙ্গে লড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
একজন কিশোরী যখন তারকাখ্যাতির চাপে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছেন, তখন ব্যক্তিগত এই আঘাতগুলো তাঁকে আরও ভেতরে ঠেলে দেয়।
‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ থেকে নিজের গল্প বলা
২০১১ সালের ‘আনব্রোকেন’ অ্যালবামের ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ গানটি ডেমির ক্যারিয়ারে বিশেষ মোড় এনে দেয়। গানটি শুধু জনপ্রিয় হয়নি; বরং তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের সঙ্গে মিশে শ্রোতাদের কাছে একধরনের প্রতিরোধের গান হয়ে ওঠে। গানটি তাঁর প্রথম টপ–১০ হিট।
এরপর ‘ডেমি’, ‘কনফিডেন্ট’ ও ‘টেল মি ইউ লাভ মি’—প্রতিটি অ্যালবাম লোভাটোরকে আরও বড় তারকা করে তোলে। ‘হার্ট অ্যাটাক’, ‘কুল ফর দ্য সামার’, ‘কনফিডেন্ট’ ও ‘সরি নট সরি’র মতো গান তাঁকে ডিজনি তারকা পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায়।
২০১২ ও ২০১৩ সালে ‘দ্য এক্স ফ্যাক্টর’–এর বিচারক হিসেবেও দেখা যায় লোভাটোরকে। সংগীতের পাশাপাশি টেলিভিশন ও অভিনয়ে নিজের জায়গা ধরে রাখেন তিনি।
মাদকের সঙ্গে লড়াই
খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে ডেমির জীবনে আসে আসক্তির ভয়াবহতা। ২০১০ সালে সফরের সময় এক নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর তিনি চিকিৎসা নেন। পরে প্রকাশ্যে আসে, তিনি খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা, আত্মক্ষত, মাদকাসক্তিসহ নানা সমস্যার সঙ্গে লড়ছিলেন।
২০১৮ সালের জুনে ‘সোবার’ গান প্রকাশ করে ছয় বছর মাদকমুক্ত থাকার পর আবার ফিরে যাওয়ার কথা জানান ডেমি। মাত্র এক মাস পর, ২৪ জুলাই অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেই রাতটি বদলে দেয় ডেমির জীবন।
ডেমির নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি হেরোইন ও ফেন্টানিল মেশানো মাদক নিয়েছিলেন। পরে হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারেন, তাঁর শরীর ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর তাঁর তিনবার স্ট্রোক ও একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যারও মুখোমুখি হন তিনি।
ওভারডোজের রাতেই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
২০১৮ সালের ওই রাত নিয়ে ২০২১ সালে ‘ড্যান্সিং উইথ দ্য ডেভিল’ তথ্যচিত্রে আরও বিস্ফোরক তথ্য দেন ডেমি।
ডেমির দাবি, মাদক সরবরাহকারী ব্যক্তি তাঁকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরও ঘটনার পুরোটা তিনি বুঝতে পারেননি বলে জানান।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ডেমি শুধু নিজের জীবনের একটি অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ করেননি; একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, আসক্তি, যৌন সহিংসতা ও মানসিক আঘাত কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে।
প্রেম এসেছে, ভেঙেছেও
ডেমির প্রেমজীবনও কম আলোচিত নয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে জো জোনাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। পরে অভিনেতা উইলমার ভালদেররামার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। ২০১০–এর দশকের মাঝামাঝি থেকে কয়েক বছর তাঁরা সম্পর্কে ছিলেন।
২০২০ সালে অভিনেতা ম্যাক্স এহরিখের সঙ্গে ডেমির সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়। একই বছর তাঁদের বাগ্দানও হয়। কিন্তু সেই সম্পর্ক টেকেনি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বাগ্দান ভেঙে যায়।
এরপর ডেমির জীবনে আসেন কানাডীয় সংগীতশিল্পী জর্ডান ‘জুটস’ লুটস। ২০২২ সালে ‘হলি এফভিকে’ অ্যালবামের কাজ করতে গিয়ে তাঁদের পরিচয়। সংগীতের সহযোগিতা ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁদের বাগ্দান হয়।
২০২৫ সালের ২৫ মে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিয়ে করেন ডেমি ও জুটস। বিয়ের অনুষ্ঠানে ডেমি পরেছিলেন ভিভিয়েন ওয়েস্টউডের পোশাক, আর জুটসের পরনে ছিল সেন্ট লরেন্টের স্যুট।
এই সম্পর্কের একটি বিশেষ দিক হলো, দুজনেরই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা আছে। জুটস পরে জানিয়েছেন, ডেমির সমর্থন তাঁর নিজের মাদকমুক্ত থাকার পথেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
.গানের মধ্যেই আত্মজীবনী
ডেমির জীবনের ঘটনাগুলো তাঁর গানের মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে। ‘সোবার’ যেন ছিল নিজের কাছে স্বীকারোক্তি। ‘অ্যানিওয়ান’ হয়ে উঠেছিল সাহায্যের আকুতির মতো। আর ২০২১ সালের ‘ড্যান্সিং উইথ দ্য ডেভিল...দ্য আর্ট অব স্টার্টিং ওভার’ অ্যালবামটি তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত কাজগুলোর একটি।
তথ্যচিত্রটির সঙ্গে একই সময়ে প্রকাশিত ওই অ্যালবামে ডেমি আসক্তি, যৌন নির্যাতন, সম্পর্ক, পুনরুদ্ধার ও নিজের পরিচয় নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন।
পরবর্তী সময়ে ডেমি আবার নিজের সংগীতের ধরন বদলেছেন। ‘হলি এফভিকে’–তে ফিরে গেছেন রক ও পপ–পাঙ্কের শিকড়ে। ২০২৩ সালে প্রকাশ করেন ‘রিভ্যাম্পড’, যেখানে পুরোনো জনপ্রিয় গানগুলোকে নতুন রকধর্মী বিন্যাসে উপস্থাপন করেন। ২০২৫ সালে আসে ‘ইটস নট দ্যাট ডিপ’ অ্যালবাম।
ক্যারিয়ারের সাফল্য কতটা
ডেমি শুধু জনপ্রিয় গায়িকা নন, তিনি একজন গ্র্যামি মনোনীত শিল্পীও। এখন পর্যন্ত গ্র্যামিতে তাঁর দুটি মনোনয়ন রয়েছে—‘কনফিডেন্ট’ অ্যালবাম ও ক্রিস্টিনা আগুইলেরার সঙ্গে ‘ফল ইন লাইন’ গানের জন্য।
পুরস্কারের পাশাপাশি ডেমির গান বিশ্বজুড়ে বিপুল শ্রোতা পেয়েছে। ইউনিভার্সাল মিউজিক পাবলিশিং গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ডেমির গান বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ বিলিয়ন স্ট্রিম অর্জন করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ২১ কোটির বেশি। তাঁর সাতটি স্টুডিও অ্যালবামই বিলবোর্ড ২০০–এর শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর অ্যালবামের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
গ্র্যামি মনোনয়ন, বিশ্বজুড়ে কনসার্ট, অ্যালবাম, অভিনয়, টেলিভিশন, তথ্যচিত্র ও ব্র্যান্ড সহযোগিতা—সব মিলিয়ে ডেমির ক্যারিয়ার এখন কয়েক দশকের বিনোদন সাম্রাজ্য।
কত সম্পদের মালিক ডেমি
‘সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থ’–এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডেমির আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ চার কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা। এই সম্পদের পেছনে শুধু গান নয়, অভিনয়, টেলিভিশন, কনসার্ট, তথ্যচিত্র, ব্র্যান্ড অংশীদারত্বসহ নানা উৎস রয়েছে।
আবার ‘ক্যাম্প রক’
ডেমির গল্প যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে। যে ‘ক্যাম্প রক’ তাঁকে কিশোর তারকা হিসেবে পরিচিত করেছিল, ১৮ বছর পর সেই ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই ফিরেছেন তিনি। ২০২৬ সালের ‘ক্যাম্প রক ৩’–এ আবার মিচি টরেস চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে। ছবিটি ১৩ আগস্ট ডিজনি চ্যানেলে প্রিমিয়ার হয়েছে এবং পরদিন ডিজনি প্লাসে এসেছে।
একসময় যে কিশোরী ডিজনির পর্দায় গান গেয়ে স্বপ্ন দেখাতেন, সেই মানুষটি এখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোকে নিজের শিল্পের অংশ বানিয়েছেন।
ভ্যারাইটি, বিলবোর্ড ও আইএমডিবি অবলম্বনে