# ইয়ান জালিয়াতি, ঘুষসহ ৮টি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন
# এভারগ্র্যান্ডকে ১৩০ কোটি ডলার জরিমানা, ইয়ানের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ
# এভারগ্র্যান্ডের অপরাধের ফলে চীনে চরম অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে
# ইয়ান একসময় এশিয়ার শীর্ষ ধনী ছিলেন, এভারগ্র্যান্ড ছিল চীনের শীর্ষ আবাসন প্রতিষ্ঠান
.বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত আবাসন প্রতিষ্ঠান চায়না এভারগ্র্যান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার চীনের একটি আদালত এ রায় দেন। প্রতিষ্ঠানটির পতনের ফলে চীনের অর্থনীতি ও আর্থিক বাজার কেঁপে ওঠার পাঁচ বছর পর এ রায় এল।
হুই কা ইয়ান একসময় এশিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ছিলেন। এপ্রিলে তহবিলের অপব্যবহার, অর্থ সংগ্রহের নামে প্রতারণা, বেআইনিভাবে জনগণের আমানত গ্রহণ, বেআইনিভাবে ঋণদান, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সিকিউরিটিজ ইস্যু করা, ঘুষ প্রদানসহ আটটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন তিনি।
চীনের একসময়কার প্রধান আবাসন প্রতিষ্ঠান এভারগ্র্যান্ড ৩০ হাজার কোটি ডলারের দায়–দেনার অধিকাংশ পরিশোধে ব্যর্থ (ডিফল্ট) হয়েছে। তাদের এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে নিচের দিকে টেনে রাখা আবাসন খাতের সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.চীনের দক্ষিণের শহর শেনঝেনের আদালতে দেওয়া এই রায়ে হুই কা ইয়ানের সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁর শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানোর গল্পের সমাপ্তি ঘটল। তবে এতে এভারগ্র্যান্ডের দেশি-বিদেশি পাওনাদারদের আশ্বস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এভারগ্র্যান্ডের অবসায়নকারীরা (লিকুইডেটর) এই রায়ের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। রয়টার্স ইয়ানের আইনি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। ২০২৩ সালে এভারগ্র্যান্ডের খেলাপি হওয়ার পর চীনা কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করেছিল। এরপর তাঁকে আর থেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
আদালত থেকে প্রকাশিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, দীর্ঘ হাতাযুক্ত নেভি ব্লু কলার শার্ট পরা ৬৭ বছর বয়সী পাকা চুলের ইয়ান দুই কর্মকর্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এবং আদালত রায় পড়ে শোনাচ্ছেন।
.আদালত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এভারগ্র্যান্ড গ্রুপ, হেংদা রিয়েল এস্টেট এবং হুই কা ইয়ানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিপুল অঙ্কের অর্থ ও চরম গুরুতর অনিয়ম জড়িত ছিল। এর ফলে গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে এভারগ্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি ক্রেতারা নানা মন্তব্য করেছেন। একজন মন্তব্য করেছেন, ‘সব সাধারণ নাগরিককেই মাশুল দিতে হয়েছে।’ আরেকজনের মন্তব্য,‘কারাদণ্ড মূলত তাঁকে রক্ষা করার জন্য। তিনি বাইরে এলে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।’ আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘আমাদের অর্থের কী হবে?’
ইয়ানের শাস্তির পাশাপাশি আদালত জানিয়েছেন, তাঁরা এভারগ্র্যান্ডকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান(১৩১ কোটি ডলার) এবং এর প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেংদাকে ৭০০ কোটি ইউয়ান জরিমানা করেছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির আরও পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তাকে জরিমানা এবং ৬ থেকে ১৮ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, ইয়ান ছাড়া এভারগ্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মোট ৫৬ ব্যক্তিকে আজ বৃহস্পতিবার কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ওয়েলথ-ম্যানেজমেন্ট প্রোডাক্টের শত শত কোটি ডলার ফেরত দিতে কোম্পানির ব্যর্থতার কারণে বিক্ষোভ শুরু হয়। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছিল। কারণ, অনেক কম আয়ের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাঁদের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন।
.মধ্য হেনান প্রদেশের এক গ্রামে দাদির কাছে বেড়ে ওঠা সাবেক ইস্পাত টেকনিশিয়ান ইয়ান ১৯৯৬ সালে এভারগ্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। আগ্রাসীভাবে ঋণ নিয়ে বিক্রির দিক থেকে এটিকে চীনের সর্ববৃহৎ আবাসন উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।
ফোর্বসের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে ইয়ানের নিট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪৫৩ কোটি ডলার, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।
হংকংয়ের এক আদালত ২০২৪ সালে এভারগ্র্যান্ডকে অবসায়নের (লিকুইডেশন) নির্দেশ দেন এবং হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ গত বছর এটিকে তালিকাচ্যুত করে। এর মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের পতন ত্বরান্বিত হয়।
অবসায়নকারীদের মতে, অবসায়নপ্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত পাওনাদারদের ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের দাবির বিপরীতে মাত্র ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার মূল্যের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে।
.চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে অবসায়নকারীরা ইয়ান ও তাঁর সাবেক স্ত্রীর অফশোর সম্পদ জব্দ করার জন্য আদালতে লড়াই করছেন, যাতে প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যান্য সাবেক কর্মকর্তার পরিশোধ করা ৬০০ কোটি ডলারের লভ্যাংশ ও বেতন উদ্ধার করা যায়।
২০২৪ সালে চীনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইয়ানকে ৬৬ লাখ ডলার জরিমানা করেছিল। সিকিউরিটিজ মার্কেট থেকে তাঁকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ, তদন্ত করে দেখা গিয়েছিল, এভারগ্র্যান্ডের মূল শাখা আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছিল এবং সিকিউরিটিজ জালিয়াতি করেছিল।