মাঝে মাঝে একটি বলের সঙ্গে জড়িয়ে যায় গল্প, আর সেই গল্পের একটা অংশ হয়ে ওঠে স্মৃতিও।

হেডিংলিতে গ্রীষ্মের বিকেলে পাকিস্তানের ইনিংস শেষে হাততালির মধ্যে মাঠ ছাড়েন ইংল্যান্ডের দুই পেসার ওলি রবিনসন ও জশ টাং। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সময় নিয়ম মেনে দুজনের হাতের মাঝখানে থাকে একটাই বল—একসঙ্গে উঁচিয়ে ধরা হয় সেটি। এক বল, অথচ দুই মালিক।

ক্রিকেটে বোলারদের এক হাত বল উঁচিয়ে অভিবাদন জানানোর দৃশ্য চেনা। ৫ উইকেট পাওয়ার পরম তৃপ্তির প্রকাশও সাধারণত দেখা যায় একই ধরনের ভঙ্গিতে। কিন্তু যে বলের অংশীদার দুজন, সেখানে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে বলটা উঁচিয়ে ধরবেন কে?

হেডিংলি টেস্টের প্রথম দিনে পাকিস্তান অলআউট হয় ১৭১ রানে। ইংল্যান্ডের হয়ে ১০টি উইকেটই নেন দুই পেসার ওলি রবিনসন ও জশ টাং—৫টি করে। ক্রিকেটে এমন সমতা বিরল; ঠিক তেমনই বিরল এই মুহূর্তকে স্মৃতি হিসেবে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্তটাও।

মাঠ ছাড়ার সময় দুই পেসারের মাথায় আসে একটি খেয়াল। বলটা কেটে দুই ভাগ করা হবে—এ ব্যাপারে দুজনই রাজি হন। টিম ম্যানেজমেন্ট বলটি পাঠিয়ে দেয় হেডিংলির গ্রাউন্ড স্টাফদের কাছে। করাতের ধারালো পোঁচে লাল চামড়ার বলটি বিভক্ত হয় দুই খণ্ডে—অর্ধেকের মালিক রবিনসন, অর্ধেকের মালিক টাং। ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে এ ধরনের স্মারক খুব কম তৈরি হয়েছে। হয়তো—কখনওই হয়নি।

দিন শেষে রবিনসনের কণ্ঠে এ নিয়ে দেখা যায় একধরনের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, ‘মাঠ থেকে বের হওয়ার সময় টাংকে বললাম, বলটা কেটে দুভাগ করি। ও-ও রাজি। ভাবলাম, দারুণ হবে। ক্রিকেটে তো অর্ধেক বল খুব একটা দেখা যায় না! একই ইনিংসে দুই বোলারের ৫ উইকেটও রোজ ঘটে না। মনে রাখার মতো একটা ব্যাপার হয়ে রইল।’

বিবিসি টেস্ট ম্যাচ স্পেশালে কৃতিত্ব দিতে ভোলেননি টাংও। তিনি বলেন, ‘রবিনসনই প্রথম বলেছিল। গ্রাউন্ড স্টাফরা খুব সুন্দর করে কাজটা করেছে। জীবনে প্রথম এমন কিছু দেখলাম। এটা নিশ্চয়ই বিশেষ জায়গায় তুলে রাখব।’

টেস্টে একই ইনিংসে ইংল্যান্ডের দুই বোলারের পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা এটি ১৬তম। শেষবার হয়েছিল ২০০৬ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে—সাইমন হার্মিসন ও মন্টি পানেসার, পাকিস্তানের বিপক্ষেই। ১৮ বছর পর ইতিহাস ফিরে এল, তবে এবার স্পিন নয়—পেসের ভাষায়।

পাকিস্তানের টপ অর্ডারের চার ব্যাটসম্যানকে ড্রেসিংরুমের পথ দেখান রবিনসন। এরপর দৃশ্যপটে আসেন ‘দ্য মপ’ নামে পরিচিত জশ টাং। নিজের পরিচয়ের সার্থকতা প্রমাণ করতে ঝাড়ু দেওয়ার মতো করে পাকিস্তানের টেল-এন্ডারদের সাফসুতরো করে দেন একাই। এরপর ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ড দিন শেষ করেছে ২ উইকেটে ১১২ রান নিয়ে। জো রুটের দ্বিতীয় দফার অধিনায়কত্বের সূচনাটা শুরু হয় দারুণভাবেই।

এই দিনের ভেতরে আরও একটি গল্প ছিল—ব্যক্তিগত, একটু অন্য রকম। গেল সপ্তাহেই রবিনসনের ঘর আলো করে এসেছে তাঁর দ্বিতীয় কন্যা, ইভা। তাঁর জন্য তাই দিনটার মানে আরও গভীর। তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার রাত দুইটায় ইভার জন্ম হলো। লিডসে হোটেলে আসার পর থেকে তো ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার লড়াই করছি! নতুন এক শিশুর মুখ দেখার পর সপ্তাহটা এমনিতেই জীবনের সবচেয়ে বিশেষ হয়ে ওঠে। এত ছোট একটা বাচ্চাকে ঘরে রেখে এসে যখন মাঠে এমন কিছু করা যায়, অনুভূতিটা অন্য রকম মিষ্টি হয়। ওরা মাঠে ছিল না, বাড়িতে ছিল। কিন্তু পুরোটা সময় আমার মন পড়েছিল ওই এক জায়গায়।’

রবিনসন-টাংয়ের পেসে বিধ্বস্ত পাকিস্তান