সংযুক্ত আরব আমিরাত গতকাল বুধবার ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। দেশটি দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ডে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পেছনে ইরানি বাহিনীর ভূমিকা রয়েছে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরান বলছে, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সাজানো নাটক’ (ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন)।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেন ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবেশী দেশটির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট আল-জাজিরাকে বলেন, ‘নানা দিক থেকে বিচার করলে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চেয়ে আমিরাতের এই নিষেধাজ্ঞা অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।’ এ সময় তিনি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নিষেধাজ্ঞা ও ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির (এমওইউ) মেয়াদ সোমবার শেষ হয়ে যায়। এরপরই নতুন করে উত্তেজনা ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসা, বাণিজ্যিক আদান-প্রদান ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ থাকবে।’ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার মতো চলমান উত্তেজনার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এর আগে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। তাদের দাবী, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইরান থেকে ছোড়া হয়েছিল। একটি আমিরাতের পানিসীমায় এবং অপরটি সীমানার বাইরে গিয়ে পড়েছে—এমন তথ্য দেওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই বিবৃতি দেয়।
পরে আরেকটি বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের রুটকে লক্ষ্য করে’ ছোড়া হয়েছিল। একই সঙ্গে তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তা বা এই অঞ্চলে নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলার’ প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে এটি মূলত একটি ‘সাজানো নাটক’ (ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন)।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই ঘটনার পর যুদ্ধের সূত্রপাত বলে ধরা হয়। যুদ্ধের প্রথম ছয় সপ্তাহে ইরান পাল্টা জবাব দেয়। তারা প্রতিবেশী কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা, জ্বালানিসহ অন্যান্য অবকাঠামোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতেই তারা সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে।
সব মিলিয়ে আমিরাতে ৫৩০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২৬টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। ইরানের দাবি, তারা মূলত আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়েছে। বিপরীতে আমিরাত বলছে, বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা থাড ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। এসব ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরা পড়েও বেসামরিক জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসন চালানোর পরদিন অর্থাৎ ১ মার্চ দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে হামলা হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম গভীর সমুদ্রবন্দর। এরপর ২ মার্চ ড্রোন হামলায় দক্ষিণ-পশ্চিম আবুধাবির মুসাফাহ জ্বালানি টার্মিনালে আগুন ধরে যায়। আকাশে একটি ড্রোন ধ্বংস হওয়ার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আমিরাতের পূর্ব উপকূলের ফুজাইরাহ তেল টার্মিনালেও আগুন লাগে। তবে এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
কর্মকর্তারা জানান, ১৭ মার্চ ইরানি ড্রোন হামলায় ফুজাইরাহ বন্দরের রপ্তানি টার্মিনালে আগুন লাগে। এর ফলে সেখানে তেল বোঝাই করার কাজ আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে আরেকটি হামলায় শাহ গ্যাসক্ষেত্রের কার্যক্রমও স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।
ফুজাইরাহ বন্দরটি হরমুজ প্রণালির ঠিক বাইরে অবস্থিত। সাধারণত এই বন্দর দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোম্পানির প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি মারবান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হয়।
আমিরাতে হামলার আরেকটি বড় লক্ষ্যবস্তু ছিল বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত ১৮ মে একটি ড্রোন হামলার পর এর কাছাকাছি জায়গায় আগুন লাগে।
সব মিলিয়ে আমিরাতে ইরানি হামলায় ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন সামরিক বাহিনীর সদস্য, একজন বেসামরিক ঠিকাদার ও ১২ জন সাধারণ নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া এসব হামলায় আহত হয়েছেন ২৪৬ জন।
মে মাসের পর আমিরাতে এটাই প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা। কয়েক দিন আগেই আবুধাবি অভিযোগ করেছিল, হরমুজ প্রণালিতে তাদের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (অ্যাডনক) দুটি জাহাজে তেহরান হামলা চালিয়েছে। তবে অ্যাডনকের জাহাজে হামলার ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান।
ওবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির (ওইসি) বাণিজ্যের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আমিরাত ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৬২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ইরানে আমিরাতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮০ কোটি ডলার। বিপরীতে তারা ইরান থেকে প্রায় ৪৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে।
ওই বছর আমিরাত থেকে ২৮১ কোটি ডলারের টেলিফোন আমদানি করেছিল ইরান। এ ছাড়া তারা কম্পিউটার, তামাক ও বাদাম আমদানি করে। অন্যদিকে ওই বছর আমিরাতে বাদাম, ফল, মসলা, চিংড়ি-কাঁকড়া জাতীয় প্রাণী ও নির্মাণকাজের পাথর রপ্তানি করেছিল ইরান।
২০২৪ সালের মে মাসে আবুধাবিতে দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক কমিটির প্রথম শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা (লজিস্টিকস), কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পর্যটন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছিল।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বাইরেও আমিরাত বহুদিন ধরে ইরানের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে ইরান সুবিধা পেয়েছে।
পশ্চিমা রপ্তানিকারকেরা সরাসরি ইরানে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর দুবাইয়ের ব্যবসায়ীরা সেসব পণ্য কিনতেন। এরপর তারা বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও খাদ্যসামগ্রী ইরানে আবার রপ্তানি করতেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ইরানের। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০১২ সালে তাদের মাথাপিছু জিডিপি ৮ হাজার ডলার থাকলেও ২০২৪ সালে তা ৫ হাজার ডলারে নেমে আসে।
গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। মূলত ইরানের বন্দরগুলোয় চলমান মার্কিন নৌ অবরোধের মাধ্যমেই এই চাপ বাড়ানো হবে।
বিস্তারিত কিছু না বললেও বেসেন্ট জানান, ‘কোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার ইতিহাসে এমন কিছু আগে কখনো দেখা যায়নি’-এমন কঠোর পদক্ষেপও যুক্তরাষ্ট্র নেবে।
মার্ক কিমিট আল-জাজিরাকে বলেন, এ পর্যন্ত দেওয়া যেকোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চেয়ে আমিরাতের এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
কিমিট উল্লেখ করেন, চীন ও তুরস্ককে পেছনে ফেলে দুবাই নীরবে তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ইরানের বার্ষিক আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে দুবাই থেকে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর মার্চ মাসের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্থগিত করে আমিরাত। এরপর গত জুনের শেষের দিকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের মাধ্যমে তারা আবারও বাণিজ্য শুরু করে।
জেবেল আলী বন্দর দুবাইয়ের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দরটি ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজকে (কার্গো) সেবা দিয়ে থাকে। দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালিত এই বন্দরে চারটি বিশাল কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। এখানে বিশ্বের বড় বড় জাহাজ নোঙর করতে পারে। বন্দরটি শুধু বিশ্ব বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রই নয়, দুবাই ও এর আশপাশের আমিরাতগুলোর জন্য ‘প্রাণভোমরা’বা লাইফলাইনও। কারণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে এই বন্দর।
দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতের মাধ্যমে ইরানের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও জেবেল আলী বন্দর ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে যুদ্ধের শুরুতেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয় বন্দরটি। সমঝোতা স্মারক বলবৎ থাকার পরও গত জুলাই মাসে ইরানে আবার হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই এই বন্দরে এক বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
কিমিট বলেন, ‘দুবাই ও ইরানের মধ্যকার আর্থিক ও পণ্য-উভয় বাণিজ্যের গুরুত্বকে আসলে কোনোভাবেই বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, দুবাই বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় জাহাজে পরিবাহিত পণ্যের চেয়েও এই নির্ভরতার বিষয়টি অনেক গভীরে বিস্তৃত। কিমিটের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে গোপনে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য দীর্ঘকাল ধরে দুবাইকে ব্যবহার করে আসছে ইরান। নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তেহরানের বহু বছর ধরে নির্ভরশীল সেই পথটিই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
কিমিট আরও বলেন, আমিরাতের এই পদক্ষেপ এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে তেহরান এটিকে কার্যত ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে ধরে নিতে পারে। তিনি এই ঘটনাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের ওপর দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে তুলনা করেন।