বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের প্রকোপ। সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যাটি দেখা দেয়। প্রজননক্ষম বয়সে ওজন বৃদ্ধি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, পারিবারিক ইতিহাস, অধিক বয়সে গর্ভধারণ, পিএমওএস এবং বিভিন্ন হরমোনজনিত জটিলতা এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের পর এই ডায়াবেটিস কমে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, সন্তান ধারণের পর নারীর শরীরে কিছু হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যার বেশিরভাগই প্লাসেন্টা বা ফুল থেকে তৈরি হয়। এগুলো মায়ের শরীরে ইনসুলিন রেজিসট্যান্স বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। গর্ভাবস্থার তৃতীয় ট্রাইমস্টারে অর্থাৎ ২৪ সপ্তাহের পর ইনসুলিনের কার্যকারিতা প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ হ্রাস পায়। এই সময়ে মায়ের অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কাঙ্ক্ষিত সীমার বাইরে চলে যায়, যাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়।

এই অবস্থার সঠিক চিকিৎসা না করালে মা ও সন্তান উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি হয়। মায়ের ক্ষেত্রে প্রি–একলাম্পশিয়া, একলাম্পশিয়া, গর্ভে পানির পরিমাণের তারতম্য, কিটোঅ্যাসিডোসিস এবং ডায়াবেটিসজনিত অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, মায়ের রক্ত থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে শিশু অতিরিক্ত ওজন বা ম্যাক্রোসোমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া গর্ভে শিশুর আকস্মিক মৃত্যু, অকাল প্রসব, প্রসবকালীন জটিলতা এবং জন্মের পরপরই হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা সাধারণের চেয়ে ভিন্ন হয়। খাওয়ার আগে ৫ দশমিক ৩ মিলিমোলের কম এবং প্রতি বেলা খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে ৬ দশমিক ৭ মিলিমোলের কম রাখতে পারলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সঠিক পুষ্টি পরিকল্পনা, নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটাচলার মাধ্যমে শর্করা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যায়।

মায়ের ওজন অনুযায়ী ক্যালরির চাহিদা নির্ধারিত হয়। যেমন—স্বাভাবিক ওজনের একজন মায়ের প্রথম ট্রাইমস্টারে দৈনিক ৩০ কিলোক্যালরি বা কেজি এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমস্টারে ৩৫ কিলোক্যালরি বা কেজি ক্যালরি গ্রহণ করা উচিত। এর ৩৩-৪০ শতাংশ জটিল ও লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স শর্করা, ২০ শতাংশ প্রোটিন এবং ৪০ শতাংশের কম ফ্যাট থেকে আসতে হবে। পাশাপাশি দৈনিক ২৫ থেকে ৫০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে।

গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন জানান, জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি এক সপ্তাহের মধ্যে গ্লুকোজ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসে, তবে ইনসুলিন শুরু করতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইনসুলিন প্লাসেন্টা অতিক্রম করে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে না এবং এটিই একমাত্র পরীক্ষিত নিরাপদ চিকিৎসা।