বিশ্বের অন্যতম বড় মানবাকৃতি রোবট নির্মাতা ইউনিট্রি রোবোটিকস আজ বুধবার সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরু করেছে। লেনদেন শুরুর মুহূর্তেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।

বহুল প্রত্যাশিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে শেয়ার ১ হাজার ১০০ ইউয়ানে লেনদেন শুরু হয় (১২০.৬০ পাউন্ড বা ১৬৩.১২ ডলার)। এরপর কিছুটা কমে শেয়ারটির দাম প্রায় ৯০০ ইউয়ানে নেমে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রোবটশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় এই তালিকাভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। স্টার মার্কেটকে অনেক সময় চীনের ‘ন্যাসডাক’ বলেও উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যখন রোবট ও রোবট পরিচালনাকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেলের বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখনই শেয়ারবাজারে ইউনিট্রির অভিষেক ঘটে। যদিও এটি চীনের মানবাকৃতি রোবট নির্মাণকারী কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রথম তালিকাভুক্তি নয়, মূল ভূখণ্ড চীনে এ ধরনের কোম্পানির এটাই প্রথম তালিকাভুক্তি।

শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে ঘরে স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার—বিভিন্ন ধরনের রোবট ইতিমধ্যেই ব্যবহার হচ্ছে। এখন মানুষের মতো দেখতে ও দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম রোবট তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। টেসলা, বিওয়াইডি ও অ্যামাজনের মতো বড় কোম্পানিও এ ধরনের রোবট তৈরি করছে; এসব রোবট মানুষের মতো অনেক কাজ করতে পারে।

ইন্ডাস্ট্রির পর্যবেক্ষণ বলছে, সায়েন্স ফিকশন ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে দেখা রোবটের ধারণা বাস্তবে রূপ পাচ্ছে। এআইয়ের যুগে এই ধারণা ভিত্তিহীন নয় বলেও অনেকে মনে করছেন।

শেয়ারবাজারে ইউনিট্রির অভিষেককে ঘিরে এ শিল্পের দ্রুত বিকাশের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেই সঙ্গে রোবটশিল্পে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার ক্ষেত্রেও তালিকাভুক্তিটি বড় নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান রোবোস্ট্র্যাটেজির জ্যাক পিয়ারসনের মতে, ইউনিট্রির তালিকাভুক্তি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মানবাকৃতি রোবট নির্মাণকারী কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি অন্যদের জন্য মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে। পিয়ারসন আরও বলেন, ইউনিট্রির সাফল্যের মধ্য দিয়ে চীনের রোবটশিল্প ‘পরিবর্তনের পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে তৈরি রোবট আমদানিতে বিধিনিষেধ কঠোর করছে।

ইউনিট্রির আইপিওর প্রায় তিন বছর আগে অপেক্ষাকৃত ছোট চীনা কোম্পানি ইউবিটেক রোবোটিকস হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এ বছরের জুলাইয়ে ইউবিটেক বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। কোম্পানিটি এমন কিছু রোবট উন্মোচন করে, চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষায়, সেগুলো ‘অত্যন্ত বাস্তবসম্মত’। এসব রোবট মানুষের সঙ্গে আবেগপ্রবণ সহায়তা ও দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

ইউবিটেক ও ইউনিট্রির পথ ধরে লেজু রোবোটিকস, এজিবটসহ আরও কয়েকটি রোবট নির্মাণকারী কোম্পানি আগামী কয়েক মাসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। তবে শিল্পটি নিয়ে সামগ্রিক আশাবাদের পাশাপাশি কারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে রোবটের চাহিদা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।

হ্যারল্ড সো বলেন, ঘরের কাজে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়—এমন পর্যায়ে যেতে রোবটের এখনো কয়েক বছর সময় লাগবে। এর জন্য ব্যাটারির স্থায়িত্ব বাড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও নির্ভরযোগ্যতার মতো বিষয়ের সমাধান করতে হবে। হ্যারল্ডের মতে, শুরুতে কারখানা ও হাসপাতালের মতো জায়গায় রোবটের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি হবে।

রোবট ও এআই এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ক্ষেত্র। দুই দেশই এ শিল্পকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গত জুলাই মাসে জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন উৎপাদন খাত সুরক্ষার স্বার্থে চীনে নির্মিত নতুন মানবাকৃতি ও চার পায়ের রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বেইজিং এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। চীনের অভিযোগ, ওয়াশিংটন বাণিজ্যিক বিষয়কে ‘রাজনৈতিকীকরণ’ করছে। এআই মডেল, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ অন্যান্য চীনা প্রযুক্তিতেও যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের ক্রিস্টিন ওয়ানের মতে, রোবটশিল্পে চীনের আধিপত্যের কারণে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। সেটা হলো, চীনা কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এর অর্থ হলো, ওয়াশিংটন যতই চেষ্টা করুক না কেন, চীনকে এগিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সহজ হবে না। ওয়ান আরও বলেন, চীনা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে অনেক দেশের উৎপাদনব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি আছে। ফলে তারাও হয়তো সহজে চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইবে না।

এ পর্যন্ত কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা কিংবা ভোক্তা বাজারে পশ্চিমাদের তৈরি রোবট চীনা রোবটের মতো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রোবট কোম্পানি বোস্টন ডায়নামিকস জানিয়েছে, দুই বছরের মধ্যে গাড়ি কোম্পানি হুন্দাইয়ের কারখানায় মানবাকৃতি রোবট ব্যবহার শুরু হবে। বোস্টন ডায়নামিকসের সিংহভাগ মালিকানা দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাইয়ের হাতে। অ্যামাজন ও টেসলার মতো আরও কয়েকটি মার্কিন কোম্পানিও মানবাকৃতি রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছে।

এ বছরের শুরুতে ইলন মাস্কের টেসলা জানায়, ক্যালিফোর্নিয়ায় মডেল এস ও মডেল এক্স গাড়ি তৈরির কারখানায় অপ্টিমাস নামের মানবাকৃতি রোবট তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। অ্যামাজন ২০২৩ সালে তাদের গুদামে মানবাকৃতি রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চালিয়েছিল। কোম্পানিটি জানিয়েছে, পরবর্তী প্রজন্মের রোবটপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

রোবট–গবেষক ডেভিড সু বলেন, বিষয়টি এখন পরিষ্কার—রোবটপ্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব হারিয়েছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রোবট কোম্পানিগুলোর খবর এখন আর তেমন শোনা যায় না। খবরের শিরোনামে এখন চীনের রোবট কোম্পানিগুলোরই আধিপত্য। ডেভিড সুর ভাষায়, ‘প্রযুক্তির দুনিয়ায় তারাই এখন আমেরিকার জায়গা দখল করেছে।’